প্রজন্ম ডেস্ক:
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন রবিবার (১ নভেম্বর) হঠাৎ করেই সহিংস হয়ে ওঠে। রাজধানীর মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে দিনভর বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এদিন বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি প্রধান শিল্পাঞ্চলের ৫২৯টি কারখানা থেকে শ্রমিকেরা বের হয়ে গেছেন। এসব কারখানার প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দেননি। এই অস্থিরতার নেপথ্যে ‘ষড়যন্ত্র’ রয়েছে অভিযোগ করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সরকার।
এরই মধ্যে সরকার পোশাক খাতের জন্য ছয় সদস্যের নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। শ্রম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বোর্ড গঠনের পর আন্দোলনে থাকার কারণ নেই। তবে শ্রমিকদের বক্তব্য, বর্তমান মজুরিতে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো কঠিন। শ্রমিক সংগঠনের নেতারাও তাদের দাবিকে ন্যায্য বলছেন। একই সঙ্গে আন্দোলনে তৃতীয়পক্ষের অনুপ্রবেশের অভিযোগ উঠেছে।
গত কয়েক দিন পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ থাকলেও রবিবার তা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে পুলিশ সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। মিরপুরে সংঘর্ষের কারণে মেট্রোরেল চলাচলও কয়েক ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হয়।
মিরপুরে সড়ক অবরোধমিরপুরে সড়ক অবরোধ
রবিবার সকালে সাভার ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভ শুরু হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আশুলিয়ার নরসিংহপুরে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে স্লোগান দেন। পরে শারমিন গ্রুপ, হা-মীম গ্রুপ ও নিউএইজসহ আশপাশের কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। কালিয়াকৈরের সফিপুর বাজার এলাকায়ও কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা মহাসড়কে অবস্থান নেন। পরে চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় একটি পিকআপভ্যান ও একটি পোশাক কারখানার ঝুটের গুদামে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
দুপুরে সাভারের হেমায়েতপুরে একেএইচ গ্রুপের একটি কারখানায় হামলা ও ভাঙচুর করেন বিক্ষোভকারী শ্রমিকেরা। কারখানার কাচ ও ভেতরে থাকা কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুরের পর ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করেন তারা। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে স্থানীয় এক সাংবাদিকও মারধরের শিকার হন। পরে কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করে এবং পুলিশ বিক্ষোভকারীদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়।
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ভাঙচুর করেছেন। এসব ঘটনায় বহিরাগত নাকি শ্রমিকেরা জড়িত, তা তখনও শনাক্ত করা যায়নি। তবে লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানান তিনি।
‘১২ হাজার ৫০০ টাকায় কিছুই হয় না’, বলছেন শ্রমিকেরা
রাজধানীর মিরপুরে রবিবার আন্দোলনে অংশ নেওয়া পোশাকশ্রমিক আরিফুর রহমান একটি কারখানায় অপারেটর হিসেবে কাজ করেন। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, তার মূল বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ওভারটাইমসহ মাসে আয় হয় ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা।
আরিফ বলেন, ‘সব মিলিয়ে ১৭-১৮ হাজার টাকা বেতন পাই। আমি ডিউটিতে প্রবেশ করি সকাল ৮টায়। বের হই রাত ৮টায়। আমি যা পরিশ্রম করি আর যা বেতন, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য নেই। এ ছাড়া এখন দ্রব্যমূল্য, ঘর ভাড়া সব মিলিয়ে এই টাকায় কিছুই হয় না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা তো ভালো বাসায় থাকতে পারি না। যে বাসায় থাকি, সেখানেও ভাড়া বেড়ে গেছে। একজন পোশাকশ্রমিক যেভাবে পরিশ্রম করেন, তাতে ৩০ হাজার টাকা বেতন সঙ্গে ওভারটাইম হলে একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারবেন।’
পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের বিষয়ে আরিফ বলেন, ‘আমরা যখন ন্যায্য আন্দোলন করছি, পুলিশ আক্রমণ করে বসলো। পুলিশ আক্রমণ না করলে কিছুই হতো না।’
কেউ উসকানি দিচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমাকে কেউ উসকানি দেয়নি। আমি নিজের ইচ্ছাতেই এসেছি।’
সড়ক অবরোধমিরপুরে সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা
আরিফের মতো একই কথা বলেন আরেক শ্রমিক শামসুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা যে দাবি করেছি, সেটা বেশি না। ন্যায্যতার সঙ্গেই আমরা রয়েছি। কিন্তু পুলিশ আমাদের এই আন্দোলন দমাতে যেভাবে লাঠিপেটা করলো, এটার নিন্দা জানাই।’
তিনি বলেন, ‘কোনও সরকারই ভালোভাবে আমাদের বেতন বাড়ায়নি। বারবার আন্দোলন করতে হয়েছে, এরপর সরকার বেতন বাড়িয়েছে।’
মজুরি বোর্ড গঠনের পরও সংঘর্ষ কেন, এমন প্রশ্নে শামসুল বলেন, ‘আগে পুলিশ শুরু করেছে। আমরা তো শান্তই ছিলাম।’
আরিফ, শামসুলসহ রবিবার বেশ কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র পাওয়া গেছে, তাতে ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের অসামঞ্জস্য। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তৈরি পোশাক খাতের সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা।
শ্রমিকদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে খাদ্যপণ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয় বেড়েছে। কয়েক বছর আগে যে বাসাভাড়া ছিল আড়াই হাজার টাকা, তা এখন সাড়ে ৭ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। ওভারটাইমসহ ১৯-২০ হাজার টাকা আয় করেও সংসারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
তৃতীয়পক্ষের অনুপ্রবেশের অভিযোগ
অন্যদিকে, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে আন্দোলনের পেছনে নিষিদ্ধ সংগঠন ও সরকারবিরোধী গোষ্ঠীর ইন্ধনের অভিযোগ করা হয়েছে। রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় চলমান পোশাকশ্রমিক আন্দোলনে মিশে নাশকতা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ১১ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও অনেকে মনে করছেন, মজুরি নিয়ে অসন্তোষের পাশাপাশি আন্দোলনে বিভিন্ন গোষ্ঠীর উসকানি রয়েছে। সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, ‘এই ক্ষোভের নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের অবহেলা। অনেক সময় মালিকপক্ষ প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা রক্ষা করে না, যার ফলে সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে চরম বিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হয়।’
তিনি বলেন, ‘আজকে যে চিত্র দেখলাম, তাতে আন্দোলনে তৃতীয়পক্ষ ফায়দা লুটতে ঢুকে গেছে। শ্রমিকদের দাবি ন্যায্য। কিন্তু আগুন, লুটপাট, ভাঙচুর এগুলো কি সমাধান? বারবার শ্রমিক আন্দোলন হলে কোনও না কোনও পক্ষ ফায়দা লুটতে চায়। এবারও অনেকে ফায়দা লুটতে ঢুকে গেছে। তবে সরকার যে মজুরি বোর্ড গঠন করলো, সেটি ইতিবাচক। আমরা ভালো ফলাফল প্রত্যাশা করছি।’
শ্রমিক নেত্রী তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘শ্রমিকরা শখ করে রাজপথে নামে না। বাজারে চাল, ডাল, তেলের যে দাম, তাতে বর্তমান মজুরি দিয়ে প্রতি মাসে ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে। বর্তমানে তাদের যে দাবি, সেটা অযৌক্তিক না। কিন্তু এই দাবি আদায়ে আমাদের শ্রমিক ভাই-বোনদের সতর্ক থাকতে হবে, কোনও পক্ষ যেন বিভ্রান্তি না ছড়াতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দীর্ঘ সময়ে ফ্যাসিবাদী শক্তির পতনের পর নতুন সরকার পেয়েছি। নতুন শ্রমনীতিও হয়েছে। এই নীতির আলোকে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি হবে, সেটাই আমরা প্রত্যাশা করি। শ্রমিকরা তো অভাবী। পেটে ক্ষুধা থাকে। এ কারণে সহজে তাদের বিভ্রান্তও করা যায়। সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। তাই কোনও ধরনের সহিংস আন্দোলনে যেন আর না যায়, কেউ উসকানি দিলেও যেন সেই উসকানিতে পা না দেয়।’
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘শ্রমিকদের দাবি ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। তবে দাবি আদায়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে হবে। মানুষের জানমালের ক্ষতি বা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়, এমন কর্মসূচি থেকে বিরত থাকতে হবে।’
যা বলছে পুলিশ ও সরকার
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আন্দোলনকারী শ্রমিকদের সঙ্গে সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনও চক্র যুক্ত হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে তার কিছু প্রমাণও আমরা পেয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা বেশ কয়েকজনকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছি। আন্দোলনকারী পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে মিশে গিয়ে নাশকতা চালানোর চেষ্টা করছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, সহিংস আন্দোলনের সঙ্গে প্রকৃত কোনও শ্রমিক বা সত্যিকারের শ্রমিক সংগঠন জড়িত নয়। তিনি বলেন, শ্রমিকেরা তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে আলোচনা করবেন। তাদের প্রতিনিধির নাম দেওয়া হয়েছে এবং মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এই বোর্ডের মাধ্যমে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ হবে।
শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী মজুরি বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট শ্রম মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গার্মেন্টস মালিকদের সব কারখানা চালু রেখে উৎপাদন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যক্রম চালাতে হবে, যাতে রফতানি সংকট তৈরি না হয়। কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত সাময়িক এবং তা দিনের মধ্যেই সমাধান হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা, জীবনমান উন্নয়ন এবং উৎপাদন ও রফতানি অব্যাহত রাখার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে পদক্ষেপ নিতে প্রধানমন্ত্রী পরামর্শ দিয়েছেন। যারা সহিংসতা, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত, তাদের কঠোরভাবে দমনের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনুরোধ করা হয়েছে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com