প্রজন্ম ডেস্ক:
গার্মেন্টস শিল্পে অস্থিরতা শুধু বেতন বৃদ্ধির আন্দোলন নয়। এর পেছনে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক শক্তি। এ ক্ষেত্রে অনেক সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিশেষত গত কয়েক বছর ধরে আলোচিত রাজনীতির ‘গুপ্ত শক্তি’। নিজেদের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে এই শক্তি পর্দার অন্তরালে রাজনৈতিক শত্রুর সঙ্গে হাত মিলিয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ইস্যুতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রও জানাচ্ছে, সরকারের বিভিন্ন সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গুপ্তদের দখলপ্রক্রিয়া ও সংঘবদ্ধতা দিন দিন বাড়ছে। সরকারের বিশ্বস্ততার মুখোশপরা কিছু ব্যক্তি ‘গুপ্ত’ শক্তিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে বড় করছে। শিল্প সেক্টরে চলমান নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি, ভাঙচুর, আগুন ত্রাস সৃষ্টির পেছনেও ওই শক্তি খুব সূক্ষ্মভাবে ভূমিকা রাখছে।
অভিযোগ উঠেছে, ১১-দলীয় জোটের একটি অংশ, প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রের এজেন্ট, পরাজিত নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা এই ‘গুপ্ত’ ষড়যন্ত্রে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করে ব্যর্থ হিসেবে প্রমাণ করাই এই ঐক্যবদ্ধ অপশক্তির মূল লক্ষ্য। সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছেও এ সংক্রান্ত নানা তথ্য রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটেই পোশাক শিল্পে চলমান অস্থিরতা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে, এর নেপথ্যে রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহল কাজ করছে। তার মতে, পোশাক শিল্পে বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা কোনো স্বাভাবিক শ্রমিক আন্দোলন নয়। সাধারণ শ্রমিকদের ব্যবহার করে দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত রাজনৈতিক সহিংসতা, ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রবিরোধী অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, বর্তমানে গার্মেন্টস শ্রমিকদের কোনো অমীমাংসিত দাবিদাওয়া নেই। এরপরও একটি মহল পরিকল্পিতভাবে শিল্প খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। এসব বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার সঙ্গে সাধারণ শ্রমিকদের সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, শ্রমিক আন্দোলনের নাম ব্যবহার করে কিছু বহিরাগত ও অশ্রমিক ব্যক্তি হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দায়িত্বে থাকা কয়েকজন গার্মেন্টস মালিক, সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক এজেন্ডা ও ভূমিকা এসব ঘটনার পেছনে কাজ করছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি মাফিয়া ও প্রতিক্রিয়াশীল এই শক্তি দেশকে অস্থিতিশীল করতে প্রতিবেশী দেশ থেকে পরিচালিত ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এদিকে, পোশাক শিল্পের শ্রমিক আন্দোলন ও অসন্তোষ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সোচ্চার রয়েছে কার্যক্রম-নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উস্কানিমূলক পোস্ট দিয়েছেন দলটির সভাপতি শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। পোশাকশ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও আর্থিক সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের বেতনের বড় একটি অংশই বাসাভাড়া পরিশোধে ব্যয় হয়ে যায়। ফলে চাল, ডাল, তেল, নুনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার জন্য তাদের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকে না। এ কারণেই শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।’
এ ব্যাপারে গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘গুপ্ত রাজনীতির সঙ্গে যারা জড়িত তাদের অবশ্যই শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে হবে। কারণ সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য যুগে যুগে ষড়যন্ত্র হয়ে আসছে। পরাজিত শক্তিরা মাঠে নেমে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। তাদের কোনোভাবে ছাড় দেওয়া যাবে না। ছাড় দিলেই এই ষড়যন্ত্রকারীরা আরও জোরালোভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠবে। এজন্য এখনই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে বিশৃঙ্খলা দমন করতে হবে সরকারকে।’
এদিকে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘পোশাক শিল্পে চলমান আন্দোলনের পেছনে কোনো গোষ্ঠী অস্থিরতার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছেÑ এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া এর পেছনে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ আছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের দাবি উপেক্ষা করা যাবে না। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে গ্রহণযোগ্য মজুরি নির্ধারণ এবং মালিক, শ্রমিক ও সরকারের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ জরুরি। এতে বৈধ দাবি ও সহিংসতার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করা সম্ভব হবে।’
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পোশাক শিল্পে অস্থিরতার জন্য শুধু শ্রমিকদের অসন্তোষকে দায়ী করাও যথেষ্ট নয়। এর পেছনে আরও রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কারণ রয়েছে। অর্থাৎ দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত পোশাক শিল্পে চলমান অস্থিরতা এখন শুধু শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের বিষয় নয়; এর সঙ্গে রাজনৈতিক স্বার্থ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং দেশি-বিদেশি নানা পক্ষের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। ফলে শিল্পের স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও নৈরাজ্য দেখা দিলে এর প্রভাব শুধু রপ্তানি আয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে নাÑ কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হতে পারে। এ অবস্থায় সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, প্রকৃত শ্রমিক অসন্তোষ ও পরিকল্পিত নাশকতার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণ করা। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী না করে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করা জরুরি। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রেখে শ্রমিক, মালিক ও সরকারের মধ্যে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। কারণ, দেশের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে পোশাক শিল্পকে কোনোভাবেই রাজনৈতিক সংঘাতের হাতিয়ার হতে দেওয়া যায় না।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com