প্রজন্ম ডেস্ক:
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান বিএনপি নামে যে ছোট্ট চারাগাছটি রোপণ করেছিলেন— তা এখন ৪৮ বছরের বটবৃক্ষ। ফুলে-ফলে ও পত্র-পল্লবে সুশোভিত হয়ে বিরাট মহীরুহে ধারণ করেছে।
বর্তমানে এটি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল। জাতীয়তাবাদী মূল্যবোধে বিশ্বাসী হলেও এ দলটিতে সমন্বয় ঘটেছে মধ্য-বা মধ্য-ডানপন্থি মতবাদে বিশ্বাসী মানুষের। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়ায় এটি একটি গণমুখী ও উদার রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠার প্রায় পাঁচ দশকে ৬ বার রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে দলটি। এর মধ্যে দলের প্রথম প্রজন্ম জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াসহ জনগণের ভোটে রাষ্ট্র ক্ষমতায় গিয়েছে ৫ বার। আর দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্র পরিচালনায় রয়েছেন তাদেরই উত্তরসূরী তারেক রহমান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো তার নেতৃত্বে অংশগ্রহণ করে বাজিমাত করেছে বিএনপি। ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দুই শতাধিক আসনে জয়ী হয়ে ষষ্ঠবারের মতো সরকার গঠন করে জিয়ার হাতে গড়া এ দলটি। সরকারপ্রধান হন তারেক রহমান। তবে দীর্ঘ যাত্রায় দলটির চলার পথ কখনও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। কণ্টকাকীর্ণ বন্ধুর পথ অতিক্রম করেই এ পর্যন্ত এসেছে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ৪ দশক দলটির নেতৃত্ব দেন প্রয়াত খালেদা জিয়া। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দলের চেয়ারপারসন ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর ৯ জানুয়ারি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার উত্তরসূরী হিসেবে দলটির দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাসের মাথায় প্রথম নির্বাচনেই দলকে চূড়ান্ত সাফল্যের দিকে সক্ষম হন তিনি। রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকলেও দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতৃত্বের হাতে বিএনপি কেমন চলছে। এ নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ চলছে। এই সময়ে প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির সাজুয্য কতটুকু? বিশেষ করে তৃণমূলে সাংগঠনিক ভিত্তি কতটুকু মজবুত হয়েছে? প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য আন্দোলন-সংগ্রাম রাজনৈতিকভাবে কতটুকু মোকাবিলা করতে পারবে। যেকোনও ঝড় নেমে আসলে টিকে থাকতে পারবে তো? এমন অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে দলের ভেতরে- বাইরে। এসব জানতে বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা হয় । নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেছেন, অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে সোনালী সময় অতিক্রম করছে বিএনপি। সর্বাধিক আসন নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। কিন্তু তৃণমূলে দলের কার্যক্রম তেমন সুসংহত নয়। দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাঙ্গনগুলোতে নিজেদের ছাত্র সংগঠনের নড়বড়ে অবস্থান এবং সহযোগী কমিটিগুলোকে ঢেলে সাজাতে না পারাসহ নানা ক্ষেত্রে এক ধরনের শূন্যতা অনুভব করছেন তারা।
তবে দলের অপর কয়েকজন নেতার দাবি, অতীতের ধারাবাহিকতায় নতুন প্রজন্মের বিএনপিও এগিয়ে চলছে দুর্দান্ত গতিতে। তারা মনে করেন, বেগম জিয়ার জীবদ্দশায়ও দলের কঠিন মুহূর্তে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন তারেক রহমান। নির্বাসনে থেকেও তৃণমূলকে সুসংগঠিত রেখেছেন। আর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই দায়িত্বের ধারাবাহিকতার মধ্যেই দল চালাচ্ছেন। তাই দলীয় কার্যক্রম কিছুটা কম হলেও একেবারেই নিষ্ক্রিয় বলা যাবে না। বরং সামনে দল নিয়ে নতুন পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন তিনি।
তৃণমূলে সংকট বেড়েছে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির চেয়ারম্যানের এক উপদেষ্টা বলেন, যেকোনও সরকার ক্ষমতায় থাকলেই তাদের দলীয় কর্মকাণ্ড কিছুটা স্থবির হয়। বিএনপির ক্ষেত্রেও কিছুটা এমন হতে পারে। তবে এটি যখন দীর্ঘায়িত হয়, তখনই সংকট তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে দলের সহযোগী সংগঠনগুলোকে এখনও ঢেলে সাজানো যায়নি। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদের নেতৃত্বে ভিন্নমতাবলম্বীদের আধিপত্য। সেখানে ক্ষমতাসীনদের ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্র দলের অবস্থান সুসংহত না হওয়া, যুবদল-স্বেচ্ছাসেবক দলের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি সম্পন্ন না করতে পারা এবং দীর্ঘ দিন ঢাকা মহানগ উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপিকে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে চালানোর বিষয়টিকেও এক ধরনের দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় স্বনির্ভর বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, ‘‘বিএনপি একটি পুরোনো সংগঠন। সে হিসেবে দলের সর্বস্তরে নেতাকর্মী ও চেইন অব কমান্ড আছে। হয়তো সরকারে থাকায় আগের চেয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম একটু কম হতে পারে। তবে আমি মনে করি, অচিরেই তৃণমূলকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’’ এ নিয়ে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান। তার মতে, দলে বড় ধরনের সাংগঠনিক সংকট নেই।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের তৎপরতা ঠেকাবে কীভাবে?
সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতসহ ১১ দল ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে নিয়ে দুই ধরনের সংকট দেখছে বিএনপি। কারণ সম্প্রতি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিয়ে রাজপথে কর্মসূচি দিয়েছে বিরোধী দল। আগামী ৫ আগস্ট থেকে ঢাকা-চট্টগ্রামমুখী লং মার্চ শুরু হবে। পর্যায়ক্রমে বাকি বিভাগগুলোতেও একই কর্মসূচি পালন শেষে নভেম্বরে ঢাকায় মহাসমাবেশ করার কথা।
অপরদিকে আগামী ডিসেম্বরে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার দেশে আসার ঘোষণা ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের তৎপরতাকে এক ধরনের হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকবিলায় দলের নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক অবস্থান কী হবে— তা নিয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। এক্ষেত্রে সামনের সম্ভাব্য কঠিন পরিস্থিতি সম্পর্কেও তেমন প্রস্তুতি নেই বলে মনে করেন তারা। প্রশ্ন উঠেছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কি মাঠ ছেড়ে দেওয়া হবে? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করে কি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হবে? কারণ ক্ষমতায় আসার পর মাঠ পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কোনও কর্মসূচি না থাকায় এমন প্রশ্ন আরও শক্তিশালী হচ্ছে বলে মনে করেন তারা।
তবুও আশাবাদী নেতারা
তারেক রহমানে নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পরও মূল দল-সহ সহযোগী বিভিন্ন সাংগঠনিক কমিটি না থাকাসহ নানা দুর্বলতার কথা বলা হলেও, বিষয়টিকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। তারা বলেন, বিএনপির দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতা হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব নিলেও তিনি তারুণ্য থেকেই ধাপে ধাপে নেতৃত্বে এসেছেন। তিনি আসমান থেকে নাজিল হননি। তাই সাংগঠনিক কাজ কীভাবে গতিশীল করতে হবে, সেটি তার ঠিকই জানা আছে। তবে যেহেতু চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মাথায়, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন— সেক্ষেত্রে সাংগঠনিক কার্যক্রমকে হয়তো সেভাবে এখনও গোছাতে সমর্থ হননি। তবে এরইমধ্যে গত ২২ আগস্ট জাতীয় স্থায়ী কমিটির শূন্য পদগুলো পূরণ করেছেন। প্রতি শনিবার বিভিন্ন সাংগঠনিক বিভাগীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। এসব বিষয়গুলোকে ধারাবাহিক কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন তারা। তাদের মতে, অচিরেই তৃণমূলকে চাঙ্গা করতে নতুন কর্মসূচি দেবেন দলীয় হাইকমান্ড।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘‘তারেক রহমান তৃণমূল থেকে রাজনীতি করেই দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন। আমাদের বিশ্বাস, জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে তিনি দলের কার্যক্রমকে আরও বেগবান করতে সক্ষম হবেন। কারণ দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তিনি দলকে সুসংগঠিত করার চেষ্টা করছেন। তাই হতাশার কোনও কারণ নেই।’’ নিশ্চয়ই নতুন প্রজন্মের বিএনপি নিজেদের গৌরবময় ঐতিহ্য সামনে রেখে এগিয়ে যাবে বলে তার বিশ্বাস।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com