প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৩রা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৩শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

খালেদা জিয়ার মৃত্যু: বিএনপির নতুন রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত ও তারেক রহমানের নেতৃত্ব পরীক্ষা

editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ১, ২০২৬, ০৭:৫৪ পূর্বাহ্ণ
খালেদা জিয়ার মৃত্যু: বিএনপির নতুন রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত ও তারেক রহমানের নেতৃত্ব পরীক্ষা

Manual1 Ad Code

স্টাফ রিপোর্টার:
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন এবং তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক শূন্যস্থান তৈরি করেছে। গত ২৩ নভেম্বর রাত থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। গত মঙ্গলবার তার মৃত্যুর খবর পৌঁছার পর হাসপাতালের প্রাঙ্গণ জাতির শোকের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সমর্থক, দলীয় নেতাকর্মী এবং সাধারণ নাগরিকরা হাসপাতালের গেটের সামনে নীরবে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছে প্রার্থনা করছিলেন। বিএনপি কর্মী রিয়াদুল ইসলাম বলেন, ‘এই খবরের কারণে আমাদের ঘরে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। যেহেতু তাকে দেখার সুযোগ নেই, তাই সবাই বাইরে অপেক্ষা করছে। সবার চোখে পানি।’

বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তার জানাজায় দেশজুড়ে হাজার হাজার বিএনপি সমর্থক উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিদেশি কূটনীতিকরাও। এটি প্রমাণ করে, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক প্রভাব দেশের সীমানা পেরিয়ে বিস্তৃত ছিল।

তবে শোকের আড়ালে, খালেদা জিয়ার মৃত্যু বিএনপির জন্য একটি রাজনৈতিক সংকট ও সম্ভাব্য বিচ্ছেদের মুহূর্ত। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে দলটি প্রচারণায় নামছে বিএনপির এই নেত্রীকে ছাড়াই; যিনি বছরের পর বছর অসুস্থতা এবং রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার পরেও দলের ঐক্যের চূড়ান্ত প্রতীক ছিলেন।

Manual3 Ad Code

বিশ্লষকরা বলছেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপি সম্পূর্ণরূপে খালেদা-পরবর্তী যুগে প্রবেশ করেছে, যেখানে দলের নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব এবং জবাবদিহিতা তার পুত্র এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর কেন্দ্রীভূত হয়েছে। দলের ভিত সুসংহত করা এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ার পর পুনর্গঠিত রাজনৈতিক দৃশ্যপটে প্রতিযোগিতা করার দায়িত্ব তারেকের ওপর বর্তেছে।

খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি তারেক রহমানের পরীক্ষা
কয়েক দশক ধরে খালেদা জিয়ার প্রাসঙ্গিকতা কেবল আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রথম সারির রাজনীতিতে অনুপস্থিত থাকলেও তিনি দলের নৈতিক কেন্দ্র এবং চূড়ান্ত কর্তৃত্ব হিসেবে কাজ করেছিলেন। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে তার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।

তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন আল জাজিরা বলেন, ‘বাংলাদেশ একজন প্রকৃত অভিভাবক হারিয়েছে। খালেদা জিয়া সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রতীক ছিলেন। দল নির্বাচিত হলে বিএনপি খালেদা জিয়ার নীতি ও শাসনব্যবস্থার অগ্রাধিকারের মাধ্যমে এগিয়ে নেবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তার রাজনীতির বৈশিষ্ট্য ছিল একটি শক্তিশালী সংসদীয় গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আওয়ামী লীগের শাসনামলে খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনার অধীনে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান ও অধিকার পুনরুদ্ধার করাই বিএনপির লক্ষ্য। তারেক ইতিমধ্যেই ঐক্যবদ্ধ নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং আন্দোলনের সমন্বয় সাধনের জন্য ৩১-দফা সংস্কার এজেন্ডা প্রণয়ন করেছেন।’

তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, খালেদার অনুপস্থিতি দলের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার প্রতীকী শক্তি কমিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘খালেদার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দলকে শক্তিশালী ও সংহত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। সেই ছন্দ ভেঙে যাবে। তারেককে নিজের নেতৃত্ব প্রমাণ করতে হবে। তার নেতৃত্ব এখনও পরীক্ষিত নয়।’

তিনি আরও মনে করিয়ে দেন, খালেদা জিয়া নিজেও এক সময় অপরীক্ষিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ১৯৮০-এর দশকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সময় তিনি জাতীয় খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তার স্বামী তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সময় নিহত হন। তিনি যুক্তি দেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তারেকের জন্য সেই সময়ের মতো নেতৃত্বের পরীক্ষার মুহূর্ত হতে পারে।’

Manual4 Ad Code

নির্বাচনের কঠিন ময়দান
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপির চ্যালেঞ্জ আরও জটিল। ১৯৯০-এর দশক থেকে বাংলাদেশে নির্বাচন প্রধানত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হতো। বর্তমানে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড অনুপস্থিত থাকায় বিএনপিকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী মাঠে লড়তে হচ্ছে।

বৃহত্তর ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জামায়াত জোটে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি অন্তর্ভুক্ত, যা ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের তরুণ নেতাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়।

মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জুলাই পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেছে। দুই দলের ঐতিহ্যবাহী আধিপত্য আর নেই। বিএনপির জন্য কাজ সহজ হবে না।’ বিশ্লেষকরা অনিশ্চয়তার দিকেও ইঙ্গিত করছেন; নির্বাচন সময়মতো হবে কি-না, শান্তিপূর্ণ হবে কি না এবং প্রধান দলগুলো জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে কি না।

Manual4 Ad Code

দলের শৃঙ্খলা রক্ষার চ্যালেঞ্জ
খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক ২০০৮ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত ছিলেন। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আসার পর দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের আশঙ্কা কমেছে। তার বক্তৃতা ও আচরণ সমর্থকদের মধ্যে ধারাবাহিকতা এবং আস্থা নিশ্চিত করেছে।

কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ে নেতাদের মধ্যে কিছু দ্বিধা রয়েছে। কক্সবাজারের চকরিয়ার সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক কামাল উদ্দিন বলেন, ‘সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে মতবিরোধ হতে পারে। তবে আমি বিশ্বাস করি, তিনি তা পরিচালনা করতে পারবেন।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তারেকের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত উল্লেখ করে বলেন, ‘তার নেতৃত্ব প্রমাণিত। তিনি কার্যকরভাবে দলকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, শৃঙ্খলা রক্ষা, অভ্যন্তরীণ সংস্কার বাস্তবায়ন এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে অবদান রাখা তারেকের নেতৃত্বের মূল পরীক্ষা।

Manual1 Ad Code

উত্তরাধিকার থেকে জনরায়
বিএনপি নেতারা স্বীকার করছেন, কেবল উত্তরাধিকার দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না। কিছু কর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এখনও রয়েছে। উপদেষ্টা মাহদি আমিন বলেছেন, ‘দল কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তা মোকাবিলা করবে।’

রাজনীতিতে ব্যক্তিগত আবেগও গুরুত্বপূর্ণ। কিশোরগঞ্জের ৫৭ বছর বয়সী দুলাল মিয়া বলেন, ‘১৯৭৯ সালে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র হিসেবে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে করমর্দনের অভিজ্ঞতা আমাকে আজীবন বিএনপির সমর্থক বানিয়েছে। তারেককে বাবা-মায়ের উত্তরাধিকার বহন করতে হবে। অন্যথায় জনগণই তাকে প্রত্যাখ্যান করবে।’

খালেদা জিয়ার মৃত্যু বিএনপিকে নতুন রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে প্রবেশ করিয়েছে, যেখানে দলের ঐক্য, শৃঙ্খলা এবং নির্বাচনী ক্ষমতা এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করছে। তার ক্ষমতা প্রমাণ করতে পারলে বিএনপি একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ এবং কার্যকরী বিরোধী দল হিসেবে নতুন রাজনৈতিক মঞ্চে স্থান করে নিতে পারবে।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১
২৩৪৫৭৮
৯১০১১১১৩৪১৫
১৬১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৯
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code