দেশের আকাশসীমা দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একের পর এক বিদেশি উড়োজাহাজ। এত দিন এসব উড়োজাহাজের চলাচল নজরদারি ও হিসাব রাখার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ছিল।
ফলে আকাশসীমা ব্যবহারের বিপরীতে প্রাপ্য রাজস্ব আদায়েও পুরোপুরি সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছিল না। আধুনিক রাডার ও এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা চালুর পর সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।
জানা গেছে, নতুন রাডারে বাংলাদেশের আকাশসীমায় উড়োজাহাজ শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা বেড়েছে কয়েক গুণ। এর সঙ্গে বেড়েছে বিদেশি উড়োজাহাজের কাছ থেকে আদায় করা ‘ওভারফ্লায়িং চার্জ’।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এই খাত থেকে বিমান চলাচল খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) আয় করেছে ৪১৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আয় বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ।
বেবিচকের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, বাংলাদেশের আকাশসীমায় থাকা উড়োজাহাজের অবস্থান এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে। ফলে কোন উড়োজাহাজ কতটুকু আকাশসীমা ব্যবহার করছে, তার হিসাব রাখা এবং সে অনুযায়ী চার্জ আদায় করা সহজ হয়েছে।
একই সঙ্গে নিরাপদে আরো বেশি উড়োজাহাজ পরিচালনার সক্ষমতাও তৈরি হয়েছে। জানতে চাইলে বেবিচকের সদস্য (এটিএম) এয়ার কমোডর মো. নূর-ই-আলম বলেন, ‘আগে ওভারফ্লায়িং থেকে মাসে গড়ে ৬০-৬১ কোটি টাকা আয় হতো। নতুন রাডার পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পর তা বেড়ে এখন মাসে গড়ে ৬৯ থেকে ৭১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।’
বিমান চলাচল খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যবর্তী সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় প্রতিদিন অসংখ্য আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পর্যটন, প্রবাসী যাত্রী পরিবহন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আকাশসীমায় বিমান চলাচলের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। এই ক্রমবর্ধমান অতিরিক্ত ট্রাফিক দক্ষতার সঙ্গে সেবা দেওয়ার জন্য একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম খুবই প্রয়োজন ছিল।
দেড় বছরেই উঠে আসবে প্রকল্পের ব্যয় : নতুন এটিসি (এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল) টাওয়ারের যাত্রা রাতারাতি শুরু হয়নি। এর নেপথ্যে রয়েছে এক দশকের বেশি সময়ের প্রক্রিয়ার ফল। ২০১২ সালে একনেক পুরনো রাডার বদলানোর উদ্যোগ অনুমোদন করে; ২০২০ সালের জুনে ক্রয় অনুমোদন ও ২০২১ সালের ২১ অক্টোবর বেবিচক-থ্যালাস চুক্তি হয়। প্রকল্পে টাওয়ার, রাডার, যোগাযোগ-নেভিগেশন, নজরদারি ও এটিএম সিস্টেম অন্তর্ভুক্ত ছিল; ২০২৪-এর মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও ২০২৫ সালে সম্পূর্ণ হয়।
ফ্রান্সের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান থ্যালাসের অত্যাধুনিক রাডার ও নেভিগেশন প্রযুক্তি স্থাপনে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৯৪২ কোটি টাকা। বেবিচকের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান হারে রাজস্ব আদায় অব্যাহত থাকলে আগামী ১৬ থেকে ১৮ মাসের মধ্যেই এই প্রকল্পে ব্যয় হওয়া অর্থ উঠে আসবে।
রাডার ও এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সেন্টারের কর্মক্ষমতার মেয়াদ ধরা হয়েছে প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর। ফলে প্রকল্পের ব্যয় উঠে যাওয়ার পরও দীর্ঘ সময় এই ব্যবস্থা থেকে রাজস্ব আসবে। অর্থাৎ একদিকে আকাশপথের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্বও বাড়বে।
Manual8 Ad Code
তবে শুধু ওভারফ্লায়িং চার্জ নয়, বিদেশি উড়োজাহাজের ল্যান্ডিং, পার্কিং, রুট নেভিগেশনসহ অন্যান্য এরোনটিক্যাল চার্জ হিসাব করলে বিমান চলাচল খাত থেকে মাসিক রাজস্বের পরিমাণ প্রায় ১৪০ কোটি টাকা। আকাশসীমা ব্যবস্থাপনায় নতুন প্রযুক্তি পুরোপুরি কাজে লাগানো গেলে এ আয় আরো বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
১৫ মিনিটের ব্যবধানের বদলে নির্দিষ্ট দূরত্ব : নতুন রাডারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে উড়োজাহাজের ‘সেপারেশন’ বা নিরাপদ দূরত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে। আগে পুরনো প্রযুক্তির কারণে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের অনেকাংশে সময়ের ব্যবধান ধরে দুটি উড়োজাহাজকে আলাদা রাখতে হতো। একটি উড়োজাহাজ যাওয়ার পর পরবর্তী উড়োজাহাজকে ১৫ মিনিট পর প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার মতো পদ্ধতি অনুসরণ করা হতো। এতে একই সময়ে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারকারী উড়োজাহাজের সংখ্যা সীমিত থাকত।
Manual5 Ad Code
নতুন রাডারে এখন উড়োজাহাজের অবস্থান ও পারস্পরিক দূরত্ব সরাসরি দেখা যায়। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট নটিক্যাল মাইল দূরত্ব বজায় রেখে উড়োজাহাজ পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে। এতে আকাশসীমার সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়বে।
এয়ার কমোডর মো. নূর-ই-আলম বলেন, ‘দূরত্বের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট সেপারেশন দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হওয়ায় আগের তুলনায় একই সময়ে তিন-চার গুণ বেশি উড়োজাহাজ নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। আন্তর্জাতিক রুটে উড়োজাহাজ চলাচল বাড়লে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে রাজস্ব আয়ে।’
Manual1 Ad Code
শাহজালাল থেকে দেখা যায় ৪৫০ নটিক্যাল মাইল : শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্থাপিত নতুন রাডারের একক কাভারেজ প্রায় ৩৫০ নটিক্যাল মাইল। চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রাডারের সঙ্গে ডিজিটাল সংযোগ স্থাপনের ফলে দক্ষিণ দিকে কভারেজ আরো প্রায় ১০০ নটিক্যাল মাইল বেড়েছে। ফলে ভবিষ্যতে শাহজালাল বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক সেন্টার থেকে বঙ্গোপসাগরের দিকে প্রায় ৪৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত উড়োজাহাজের গতিবিধি মনিটর করা সম্ভব হবে।
এই সক্ষমতা দেশের আকাশসীমা ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন এনেছে। পুরনো রাডারে যেখানে সীমিত পরিসরে উড়োজাহাজের অবস্থান দেখা যেত, সেখানে এখন অনেক দূর পর্যন্ত আকাশপথের পরিস্থিতি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে।
তবে কাভারেজের সীমা পেরিয়ে গভীর সমুদ্রে প্রবেশ করার পরও উড়োজাহাজের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে না। সিপিডিএলসি ও এডিএসসি প্রযুক্তির মাধ্যমে কন্ট্রোলাররা পাইলটের ককপিটে সরাসরি টেক্সট বার্তা পাঠাতে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদান করতে পারবেন।
বঙ্গোপসাগরের সাত রুটে নজর বাংলাদেশের : দেশের সামনে এখন আরো বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বঙ্গোপসাগরের আন্তর্জাতিক আকাশপথ নিয়ে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী সমুদ্রসীমার ওপর এয়ার ট্রাফিক সার্ভিস দিতে হলে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ, নির্ভরযোগ্য নজরদারি এবং দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে অনুসন্ধান ও উদ্ধার সক্ষমতা প্রয়োজন।
বেবিচক বলছে, যোগাযোগ ও রাডার কাভারেজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ অনুসন্ধান ও উদ্ধার সক্ষমতা আরো শক্তিশালী করা।
এ জন্য বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে নিয়ে আন্ত মন্ত্রণালয় পর্যায়ে বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) অনুমোদন নেওয়া হবে।
অনুমোদন পাওয়া গেলে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণাঞ্চলের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আকাশপথে বাংলাদেশ এয়ার ট্রাফিক সার্ভিস পরিচালনার সুযোগ পেতে পারে। এর ফলে শুধু দেশের আকাশসীমা ব্যবহারের রাজস্বই নয়, আন্তর্জাতিক এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা থেকেও দেশের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
পুরনো রাডারের ৪০ মাইল থেকে ৪৫০ মাইল : ১৯৮০-এর দশকে ইতালির তৈরি পুরনো রাডারের কাভারেজ ছিল মাত্র ৪০ থেকে ৫০ মাইল। সেই প্রযুক্তিতে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য নজরদারি চালানোও কঠিন ছিল। নতুন প্রযুক্তিতে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। বর্তমানে ৪৫০ মাইল পর্যন্ত নজরদারি করা যাচ্ছে।
বেবিচকের কর্মকর্তারা বলছেন, এতে শুধু রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতাই বাড়েনি, বাংলাদেশের আকাশসীমার নিরাপত্তাও শক্তিশালী হয়েছে।
প্রশিক্ষিত জনবল, দ্রুত হচ্ছে বিল আদায় : নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের প্রশিক্ষণও জোরদার করা হয়েছে। ২০১৯ সাল থেকেই আধুনিক এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থার জন্য নিয়ন্ত্রকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়। বর্তমানে অর্ধশতাধিক উচ্চ প্রশিক্ষিত এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার ২৪ ঘণ্টার শিফটে নতুন রাডার ও ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা পরিচালনা করছেন।
নতুন এটিসি টাওয়ারের সুফল এরই মধ্যে দৃশ্যমান বলে জানিয়েছেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ। তিনি বলেন, ‘টাওয়ারটি চালুর পর ফ্লায়িং ওভার চার্জ আদায়ের হার বেড়েছে। একই সঙ্গে দেশের আকাশসীমার পূর্ণাঙ্গ নজরদারি নিশ্চিত হওয়ায় রাডার এড়িয়ে কোনো ফ্লাইটের প্রবেশের সুযোগ নেই। দেশের বিমান চলাচল ব্যবস্থার জন্য এটি মাইলফলক।’