প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২রা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২২শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

অর্থনীতির সব সূচকই চাপে: মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, রিজার্ভে টান

editor
প্রকাশিত এপ্রিল ১১, ২০২৬, ০৫:২৮ পূর্বাহ্ণ
অর্থনীতির সব সূচকই চাপে: মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, রিজার্ভে টান

Manual3 Ad Code

স্টাফ রিপোর্টার:
আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছর এবং পরবর্তীতে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ‘বাস্তব চিত্র’ দেশবাসীর সামনে তুলে ধরলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বললেন, বিএনপির নতুন সরকার এমন একসময়ে দায়িত্ব নিয়েছে, যখন অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই চাপে। কমেছে প্রবৃদ্ধি। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। সামগ্রিকভাবে টান পড়েছে রিজার্ভেও। জনগণের আস্থা পুনর্গঠন বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গতকাল শুক্রবার সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী অর্থনীতির ‘প্রকৃত চিত্র’ তুলে ধরেন। সকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হলে দিনের কার্যসূচিতে যাওয়ার শুরুতেই তিনি এই বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে বিগত ১৬ বছরের অর্থনীতির ক্ষতগুলো চিত্রায়িত করার পাশাপাশি বিএনপির আগের শাসনামলের ‘সাফল্য’ তুলে ধরে তুলনামূলক চিত্রও বর্ণনা করেন। একই সঙ্গে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের প্রতিশ্রুত দর্শন ও নীতি-কৌশলও তুলে ধরেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করানোর পাশাপাশি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতকে অকার্যকর করে দিয়েছে
বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদী সরকার সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের মাধ্যমে অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করানোর পাশাপাশি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতকে অকার্যকর করে দিয়েছে। বিগত বিএনপি সরকার অর্থনীতির মূল সূচকগুলো যেখানে ইতিবাচক ধারায় নিয়ে এসে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে গিয়েছিল, বিগত ১৬ বছরে তা অনেকটাই ধূলিসাত্ হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে হুন্ডি প্রবাহ এবং অর্থ পাচারের কারণে রিজার্ভের পরিমাণ কমে ২০ বিলিয়নে নেমে আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও আমদানি প্রবৃদ্ধি কমে এসেছে এবং রেমিট্যান্স বা প্রবাস আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

Manual8 Ad Code

অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো গভীর ও বহুমাত্রিক
মন্ত্রী বলেন, অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো গভীর ও বহুমাত্রিক। আশার বাণী শুনিয়ে বললেন, সুশাসন, সংস্কার ও জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।

বক্তব্যের শুরুতে আমির খসরু বলেন, সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল মেয়াদে আমরা এ দায়িত্ব পালন করেছি। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় বিশ্বাস করে এবং জনগণকে সাথে নিয়ে দেশের উন্নয়নে কাজ করে। এ দায়বদ্ধতা থেকে আমি আজ এই সংসদের মাধ্যমে আমাদের সর্বশেষ অর্থবছর ২০০৫-০৬, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছর এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক, সামাজিক খাতের সূচক এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থার একটা চিত্র দেশবাসীকে অবহিত করতে পারি। পাশাপাশি জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে একটি উন্নত, মর্যাদাশীল ও বৈষম্যহীন মানবিক রাষ্ট্র গঠনে আমাদের প্রতিশ্রুত দর্শন ও নীতি-কৌশলের বিষয়েও দেশবাসীকে অবহিত করতে চাই।

প্রবৃদ্ধি কমেছে, বেড়েছে আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ
সরকারি তথ্য তুলে ধরে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বিবৃতিতে বলেন, বিগত সরকারের আমলে সামষ্টিক অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পেলেও এর ভেতরে বেশ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে ওঠে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৮ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ছিল তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে, ৭.১৭ শতাংশ। পরবর্তী সময় দুর্বৃত্তায়ন ও ভ্রান্তনীতির কারণে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষ শেষে প্রবৃদ্ধির হার কমে ৪.২২ শতাংশ হয়। মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৯.৭৩ শতাংশে পৌঁছায়। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.৬৬ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৩.৫১ শতাংশে। কৃষিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.৭৭ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে ৩.৩০ শতাংশে নেমে আসে। মন্ত্রী বলেন, একটি অর্থনীতি যখন শিল্পের চালিকা শক্তি হারিয়ে ফেলে, তখন কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়। সামগ্রিক উত্পাদনশীলতা হ্রাস পায়। বিগত সময়ে এটি চরমভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে।

শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান কমেছে, ‘ছদ্ম বেকারত্ব’ তীব্রতর, ‘জবলেস গ্রোথ’
আমির খসরু বলেন, বিগত এক দশকে দেশের অর্থনীতির প্রধান তিনটি খাতের মধ্যে কৃষিতে মূল্য সংযোজনের অংশ কমেছে প্রায় ৪ শতাংশ। অন্যদিকে শিল্প ও সেবা খাতের অবদান বেড়েছে। কিন্তু সে সময় কৃষি খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৪.৮ শতাংশ। শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান কমেছে। শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় তরুণরা বাধ্য হয়ে কৃষি খাতে বেশি করে নিয়োজিত হয়েছে। এতে করে ‘ছদ্ম বেকারত্ব’ তীব্রতর হয়েছে। তরুণদের শ্রমশক্তি অপচয় হয়ে উত্পাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে সীমিত করেছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে কৃষি খাতে মোট জাতীয় মূল্য সংযোজনের ১১.৬ শতাংশ যোগ করলেও মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪১ শতাংশ এই খাতে নিয়োজিত। এই বৈপরীত্য কৃষি খাতে শ্রমের নিম্ন উত্পাদনশীলতাকে ইঙ্গিত করে। শ্রমবাজারের গভীর কাঠামোগত দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে, যা ‘কর্মসৃজনবিহীন প্রবৃদ্ধি’ বা ‘জবলেস গ্রোথ’-এর ঝুঁকি নির্দেশক।

টাকার মান অর্ধেকে, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত
অর্থমন্ত্রী বলেন, গত ১৫ বছরে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মান ছিল ৬৮.২ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ছিল ১১১ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরো বেড়ে দাঁড়ায় ১২১ টাকা। ক্রমাগত অবমূল্যায়নের কারণে গত ১৫ বছরে টাকার মান প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হয়েছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে তা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।

মুদ্রা সরবরাহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে মুদ্রা সরবরাহের (এম-টু) প্রবৃদ্ধি ১৯.৩ শতাংশ ছিল। রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ছিল ২৩.৯ শতাংশ, যা অর্থনীতির প্রাণশক্তির ইঙ্গিত দেয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। এম-টু প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ৭.৭ শতাংশ। রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ৭.৯ শতাংশ।

অনেক ব্যাংক কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় পরিচালিত হয়েছে, মূলধন পর্যাপ্ততা নেমেছে ৩.৮ শতাংশে
ব্যাংক খাতের ‘বিপজ্জনক’ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, খেলাপি ঋণ বেড়ে ২০ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা বাস্তবে ৩০ শতাংশ। মূলধন পর্যাপ্ততা নেমে এসেছে ৩.৮ শতাংশে। তিনি বলেন, অনেক ব্যাংক কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় পরিচালিত হয়েছে।

তিনি বলেন, মূলধন পর্যাপ্ততার চিত্র আরো উদ্বেগজনক। ২০০৫ সালে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে সিএআর ছিল ৭.৩ শতাংশ, ২০২৪ সালে যা ৩.০৮ শতাংশে নেমে আসে। মূলধন পর্যাপ্ততা ঋণাত্মক হওয়ার অর্থ হলো এই ব্যাংকগুলো কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছিল। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়—এটি দীর্ঘ দেড় দশকের অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ প্রদান, সুশাসন এবং জবাবদিহিতার অনুপস্থিতির অনিবার্য পরিণতি।

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ মন্থর, ব্যাংকিং খাতে তারল্য চাপ
অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯.৩ শতাংশ এবং রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ছিল ২৩.৯ শতাংশ, যা অর্থনীতিতে প্রাণশক্তির ইঙ্গিত দেয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় মাত্র ৭.৭ শতাংশ এবং রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.৯ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ সম্পদ প্রবাহের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, জুন ২০০৬-এ অভ্যন্তরীণ সম্পদের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯.৫ শতাংশ, যা ২০২৫-এ নেমে এসেছে ৬.৭ শতাংশে। অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধিও ২১.১ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে যা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ মন্থরতা ও ব্যাংকিং খাতে তারল্য চাপের বহিঃপ্রকাশ।

Manual4 Ad Code

সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধ বেড়েছে ১৩ গুণ
বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধ বেড়েছে ১৩ গুণ। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে যা ছিল ৮৫ বিলিয়ন টাকা, সেটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ১৪৭ বিলিয়ন টাকা। এটি বাজেটের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। উন্নয়ন ব্যয় সীমিত করছে।

ভয়াবহ আয় বৈষম্যে ‘বৈষম্যমূলক অলিগার্কিক সমাজ’ প্রতিষ্ঠা
আয়ের বৈষম্য ভয়াবহভাবে বেড়েছে দাবি করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫ সালে ধনী-গরিব আয়ের পার্থক্য ৩৫ গুণ। ২০২২ সালে তা ৮১ গুণ। এর ফলে একটি ‘বৈষম্যমূলক অলিগার্কিক সমাজ’ প্রতিষ্ঠা হয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা : খেলাপি ঋণ ছাড়িয়েছে ৩০ শতাংশ, প্রকৃত চিত্র গোপন করা হয়েছিল
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিগত সময়ে প্রশাসন দলীয়করণ হয়েছে। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত দুর্বল হয়েছে। পরিসংখ্যান ব্যবস্থাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ফলে সঠিক নীতিনির্ধারণ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য দুটি সূচক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের হার এবং মূলধন পর্যাপ্ততা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের বরাতে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এসে সেই চিত্র আমূল পালটে যায়। সামগ্রিক খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়ায় ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। এখন তা দাঁড়িয়েছে ৩০ শতাংশের ওপরে। এখানে উল্লেখ্য, খেলাপি ঋণের আন্তর্জাতিকভাবে অনুসৃত সংজ্ঞাকে কৌশলে পাশ কাটিয়ে ভুলভাবে প্রদর্শন করে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকৃত চিত্র গোপন করা হয়েছে।

Manual6 Ad Code

২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর জন্য নেওয়া হয়েছে বেশ কিছু উদ্যোগ।

জ্বালানি বাজার অস্থির, অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে হতে পারে ৩৬ হাজার কোটি টাকা, যা চাপ বাড়াবে রিজার্ভে
জ্বালানী সাশ্রয়ে দেশবাসীকে আহ্বান ও সতর্ক করে মন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। ফলে, সরকারকে অতিরিক্ত ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে, যা বাজেট ও রিজার্ভ-দুটির ওপরই চাপ তৈরি করবে। সরকার এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবেলায় জনগণকে জ্বালানি ও বিদ্যুত্ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে পরামর্শ দেওয়াসহ বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

নানামুখী চাপের মধ্যেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে হাত দিয়েছে সরকার
মন্ত্রী বলেন, একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ এই বাস্তবতার বাইরে নয়। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে অতিরিক্ত ভর্তুকি প্রদানের প্রয়োজন হলেও জনগণের কষ্টের কথা মাথায় রেখে সরকার এখনো পর্যন্ত পূর্ণ সমন্বয় না করে পূর্বের মূল্যই বহাল রেখেছে। এই প্রতিকূল বৈশ্বিক পরিবেশের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে। অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা স্থাপন ও নানামুখী চাপ মোকাবিলা করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ হাতে নিয়েছে সরকার।

বাজেট ঘাটতি কমানো যাচ্ছে না
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিবৃতিতে বলেন, বিগত সরকারের সময়ে রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থায়ও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। কর-জিডিপি অনুপাত সন্তোষজনক মাত্রায় উন্নীত করা সম্ভব হয়নি এবং রাজস্ব ফাঁকি ও অপচয়ের কারণে সরকারের সম্পদ আহরণ সক্ষমতা সীমাবদ্ধ থেকেছে।

তিনি বলেন, ২০০৫-০৬ সালে মোট রাজস্ব ছিল ৪৩৯ বিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ৮.২ শতাংশ। অন্যদিকে, ব্যয় ছিল ১১.১ শতাংশ- ফলে বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির ২.৯ শতাংশ। ২০২৩-২৪ সালে রাজস্ব বেড়ে ৪,০৯০ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়ালেও জিডিপির অনুপাতে তা ৮.২ শতাংশেই স্থির থাকে। অন্যদিকে, ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১২.২ শতাংশে, ফলে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ৪.০৫ শতাংশে। রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির চেয়ে ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজেট ঘাটতি কমানো যাচ্ছে না। শুধু বাজেট ঘাটতি যে বেড়েছে তাই নয়, এ বৃদ্ধির মানও প্রশ্নবিদ্ধ। প্রকল্প ছিল অতিমূল্যায়িত এবং এগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাইও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে করা হয়নি। বিগত সরকারের আমলে বাস্তবায়িত মেগা প্রকল্পগুলো এই ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ফলশ্রুতিতে জনগণ সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল ভোগ করতে পারেননি। লুটপাটের মাধ্যমে লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত ‘শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি’র প্রতিবেদনে বিষদভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

ঋণ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারি ঋণের ক্ষেত্রে একটি অস্বাস্থ্যকর পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং তুলনামূলক উচ্চ সুদের ব্যয় সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে ঋণ পরিশোধের দায়ও বৃদ্ধি পায়।

মাথাপিছু আয় বাড়লেও সেটার সিংহভাগ মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীর হাতে
অর্থমন্ত্রী বলেন, মাথাপিছু জাতীয় আয়ের দিকে তাকালে সংখ্যাটা প্রথমে চমকপ্রদ মনে হতে পারে। মাথাপিছু আয়ের সংখ্যা নিয়েও বড় বিতর্ক আছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, কিন্তু সেই আয়ের সিংহভাগ ছিল মুষ্টিমেয় কিছু সুবিধাভোগীর হাতে। তিনি বলেন, সম্পদের অসম বণ্টন ব্যবস্থা, সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতির কারণে বৈষম্য বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় জরিপ (হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে-এইচআইইএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, আয়-ভিত্তিক জিনি কোফিশিয়েন্ট ২০০৫ সালে ছিল ০.৪৬৭। ২০০৫ সালের পর থেকে এই সূচকের ধারাবাহিক অবনতি হয়ে সর্বশেষ ২০২২ সালে এসে পৌঁছায় ০.৪৯৯ পয়েন্টে। ২০০৫ সালে সবচেয়ে ধনী পাঁচ শতাংশ খানার আয় ছিল সবচেয়ে কম আয়ের পাঁচ শতাংশ খানার ৩৫ গুণ; ২০২২ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৮১ গুণ। ফলশ্রুতিতে একটি বৈষম্যমূলক অলিগার্কিক সমাজের উত্থান হয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক দলীয়করণ ও দুর্নীতি
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলোর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে ধ্বংস করা, যা বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার সুনিপুণভাবে করে গেছে। এর মধ্যে প্রশিক্ষিত ও পেশাদার ব্যুরোক্রেসি একটি রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং একটি রাজনৈতিক সরকারের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করে থাকে। বিগত ১৬ বছরে এটিকে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে।

তথ্য ব্যবস্থাপনা
অর্থমন্ত্রী বলেন, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতার কারণে নীতিনির্ধারণে সময়োপযোগী ও নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রাপ্তি অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, রপ্তানির ক্ষেত্রে ১০ বিলিয়ন ডলার অতিরঞ্জনের একটি তথ্য বিভ্রাট দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল, যা সম্প্রতি সংশোধন করা হয়েছে।

Manual6 Ad Code

সরবরাহ চেইন
মন্ত্রী বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর দুর্বলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। বাজার সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য হিসেবে এ পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করেছে।

এ সরকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছে
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিগত দীর্ঘ ১৬ বছরের দুঃশাসন, অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও লুটপাট, সামাজিক বৈষম্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ধ্বংসের প্রেক্ষাপটে জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে বিএনপি তার নির্বাচনি ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট, লক্ষ্যভিত্তিক এবং বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচি ঘোষণা করে। যার পরিপ্রেক্ষিতে জনগণ বিএনপিকে দেশ পরিচালনায় নিরঙ্কুশভাবে নির্বাচিত করেছে। নির্বাচিত হয়েই কালবিলম্ব না করে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছি।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলোর বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার রাজস্ব আহরণে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিতকরণে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আমাদের সরকারের এক্ষেত্রে একটি অনুসৃত সামাজিক চুক্তির প্রতিপাদ্য হলো-রাজস্ব আদায়ে আনতে হবে স্বচ্ছতা, সরকারি ব্যয়ের সুবিধাসমূহ হবে দৃশ্যমান এবং নীতি হবে সামনে এগিয়ে চলার। এর মাধ্যমে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়িয়ে উন্নয়ন অর্থায়ন করে ঋণ নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা এবং জনগণকে তার প্রদেয় করের বিনিময়ে সুশাসন, নিরাপদ ও উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা বিধান করা। রাজস্ব ব্যবস্থাপনা জনবান্ধব করার মাধ্যমে জনগণকে কর প্রদানে উত্সাহিত করে ক্রমান্বয়ে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ২০৩৪ সালে ১৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া এ সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।

ব‌্যাংকিং খাত সংস্কারের উদ্যোগ
আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। এছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দক্ষ ঋণ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিচ্ছে, ঘাটতি অর্থায়নের বিকল্প ও সহজ শর্তের বৈদেশিক উত্স ও অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজার উন্নয়ন গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে, ঘাটতি অর্থায়ন ও এর উেসর মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ ও ঋণের ঝুঁকি হ্রাসের দিকে নজর দিচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্পে রাজস্ব খাত থেকে অর্থায়ন বাড়িয়ে ঋণ নির্ভরতা হ্রাস করা এবং জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে ঋণ-জিডিপি অনুপাত কমিয়ে আনা এবং ফিসক্যাল স্পেস তৈরির মাধ্যমে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে টেকসই করা হবে। মধ্যমেয়াদি বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক (এমটিবিএফ) এবং মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনীতি ফ্রেমওয়ার্ক (এমটিএমএফ) প্রণয়নে একটি ডায়নামিক ম্যাক্রো-ফিসক্যাল মডেল উন্নয়ন করে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে রূপান্তরের নির্ভরযোগ্য ও বাস্তবায়ন উপযোগী প্রক্ষেপণ করে সে অনুযায়ী সেক্টরাল বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে।

সরকারের লক্ষ্য
অর্থমন্ত্রী তার বিবৃতিতে বর্তমান সরকারের লক্ষ্যসমূহ তুলে ধরে বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: মূল্যস্ফীতি ৫-৬ শতাংশে নামিয়ে আনা, যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন সহজতর হয়। রাজস্ব সংস্কার: এজন্য করজাল বৃদ্ধি, কর ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন ও অটোমেশন করা হচ্ছে, যাতে ঋণের নির্ভরতা কমে। পাশাপাশি রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত লক্ষ্যমাত্রা ১৫ শতাংশ অর্জন করা। পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছি। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতে আমরা এসএমই খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছি; যা প্রকৃত জিডিপি বাড়াবে এবং উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। এটি করা হবে ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, ঋণপ্রাপ্তি সহজীকরণ এবং সহনীয় হারে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১
২৩৪৫৭৮
৯১০১১১১৩৪১৫
১৬১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৯
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code