পোশাকের বাইরে নতুন চমক, চুল রফতানিতে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের
পোশাকের বাইরে নতুন চমক, চুল রফতানিতে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের
editor
প্রকাশিত নভেম্বর ১, ২০২৬, ০২:০৪ অপরাহ্ণ
Manual7 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
নাপিতের দোকানে চুল কাটার পর মেঝেতে পড়ে থাকা চুল কিংবা চিরুনিতে জমে থাকা চুল অনেকের কাছেই বর্জ্য। অথচ সেই ফেলে দেওয়া চুলই এখন আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান পণ্য। এসব চুল দিয়ে তৈরি হচ্ছে উইগ, হেয়ার এক্সটেনশন ও হেয়ারপিস। আর এই চুল ও উইগ রফতানি করেই বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে বাংলাদেশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) দেশের উইগ ও মানবচুল রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮৬ দশমিক ৪ শতাংশ। পণ্যভিত্তিক রফতানি তালিকায় এটিই সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পণ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে উইগ ও মানবচুল রফতানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রফতানি আয় বেড়েছে ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
Manual8 Ad Code
দেশের সামগ্রিক পণ্য রফতানি আয় যেখানে বেড়েছে ৬ শতাংশ, সেখানে উইগ ও মানবচুল রফতানিতে প্রায় ৮৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল রফতানি খাতে মানবচুল ও উইগ নতুন পণ্য হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এই ব্যবসা এখনো সাধারণ মানুষের কাছে অনেকটাই অজানা। অথচ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চুল সংগ্রহ, বাছাই, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উইগ তৈরিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক। তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগও।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বাড়ি বাড়ি ঘুরে চুল সংগ্রহের প্রচলন রয়েছে। কোথাও নগদ টাকায়, কোথাও প্রসাধনী, খেলনা কিংবা ছোটখাটো গৃহস্থালি পণ্যের বিনিময়ে চুল কেনা হয়। চিরুনিতে জমে থাকা চুলও সংগ্রহ করেন ব্যবসায়ীরা। এসব চুল প্রথমে স্থানীয় সংগ্রাহক ও আড়তদারদের কাছে যায়। কয়েক ধাপ হাতবদলের পর বড় ব্যবসায়ীদের গুদামে পৌঁছায়। সেখানে চুলের দৈর্ঘ্য, মান ও ধরন অনুযায়ী বাছাই, পরিষ্কার ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এরপর কাঁচামাল হিসেবে রফতানি কিংবা দেশে উইগ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
চীনের বড় বাজার, বাংলাদেশ থেকে যাচ্ছে কাঁচামাল
বাংলাদেশের মানবচুলের অন্যতম বড় ক্রেতা চীনের ব্যবসায়ীরা। তারা সরাসরি বাংলাদেশে এসে চুল কেনেন। আবার স্থানীয় রফতানিকারকদের মাধ্যমেও সংগ্রহ করেন। চীনে মানবচুল দিয়ে উইগ ও হেয়ার এক্সটেনশন তৈরির বড় শিল্প গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ থেকে সংগ্রহ করা চুল সেখানে প্রক্রিয়াজাত করে উন্নতমানের পণ্য তৈরি করা হয়। পরে এসব পণ্য ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হয়।
তবে বাংলাদেশ শুধু চুল রফতানি করে না, আমদানিও করে। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত চুল দিয়ে দেশের উইগ কারখানাগুলোর চাহিদা পূরণ না হওয়ায় ২০২১ সালে ভারত থেকে মানবচুল আমদানি শুরু হয়। বিশেষ করে দিনাজপুর অঞ্চলের কয়েকটি কারখানায় আমদানি করা চুল দিয়ে উইগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের একটি বড় অংশ বিদেশে রফতানি করা হয়।
কাঁচামাল নয়, তৈরি উইগ রফতানির উদ্যোগ
মানবচুলের ব্যবসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলেও শুধু কাঁচামাল রফতানি করে এর পুরো অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেশে উইগ তৈরির কারখানাও গড়ে উঠছে।
উত্তরার ফয়দাবাদ দীর্ঘদিন ধরে মানবচুলের ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সেখানে চুলের গুদাম, বাছাই কেন্দ্র ও ছোট-বড় উইগ তৈরির কারখানা রয়েছে। এ ছাড়া দিনাজপুর, ফরিদপুর ও নীলফামারীসহ বিভিন্ন এলাকায় এই ব্যবসার বিস্তার ঘটেছে।
নারায়ণগঞ্জের জাপানিজ ইকোনমিক জোনেও বিদেশি বিনিয়োগে আন্তর্জাতিক মানের উইগ তৈরির উদ্যোগ রয়েছে। একটি জাপানি প্রতিষ্ঠান সেখানে কাস্টমাইজড উইগ তৈরি করছে। প্রতিষ্ঠানটির তৈরি পণ্য জাপান ও সিঙ্গাপুরে রফতানি হচ্ছে। ভবিষ্যতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও প্রবেশের পরিকল্পনা রয়েছে।
একটি মানসম্মত উইগ তৈরিতে দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এ জন্য কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে হয়। ফলে এই শিল্পে দক্ষ জনবল তৈরির পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও রয়েছে।
কাঁচামাল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে যাওয়ার স্বপ্ন
দেশে মানবচুলের ব্যবসায় যুক্ত উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ এখন কাঁচামাল রফতানির সীমা ছাড়িয়ে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রস্তুত উইগ বিক্রির দিকে এগোচ্ছেন। এমনই একটি প্রতিষ্ঠান ‘উইগ বাংলাদেশ’। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আশরাফের ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু হয়েছিল মানবচুল রফতানির মাধ্যমে। শুরুতে বাংলাদেশ থেকে সংগ্রহ করা চুল চীনের বিভিন্ন কারখানায় পাঠাতেন তিনি। পরে বুঝতে পারেন, কাঁচামাল রফতানির পরিবর্তে দেশে তৈরি পণ্য বিদেশে বিক্রি করতে পারলে বেশি মূল্য সংযোজন সম্ভব।
Manual6 Ad Code
সেই চিন্তা থেকে উইগ তৈরির উদ্যোগ নেন তিনি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির তৈরি উইগ উত্তর আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের বাজারে যাচ্ছে। ব্রাজিল প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম বড় বাজার। এরপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মোহাম্মদ আশরাফের ভাষ্য অনুযায়ী, উইগ তৈরির ক্ষেত্রে চীনের অভিজ্ঞতা প্রায় দেড়শ বছরের। দেশটিতে এ শিল্পের জন্য উন্নত প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা থাকলেও দক্ষ শ্রমিকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ রয়েছে।
উইগ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ হলো ‘নটিং’। এ প্রক্রিয়ায় বিশেষ কৌশলে একেকটি চুল বসিয়ে উইগ তৈরি করা হয়। তাঁর প্রতিষ্ঠানের দক্ষ কর্মীরা দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ উইগ তৈরি করতে পারেন। একজন দক্ষ নটিং কর্মী মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। এমনকি বাড়িতে বসেও এ কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটিতে বিভিন্ন ধরনের চুলের গঠন ও নকশার উইগ তৈরি হয়। স্ট্রেইট, ওয়েভি ও কার্লসহ নানা ধরনের পণ্য রয়েছে। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন রঙের উইগও তৈরি করা হয়।
সৌন্দর্যের পাশাপাশি চিকিৎসায়ও চাহিদা
Manual4 Ad Code
মানবচুলের উইগের চাহিদা শুধু সৌন্দর্যচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসার প্রয়োজনেও এর ব্যবহার বাড়ছে। বিশেষ করে ক্যানসারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি নেওয়ার কারণে অনেক রোগীর চুল পড়ে যায়। তাদের স্বাভাবিক চেহারা ফিরিয়ে আনা এবং আত্মবিশ্বাস বাড়াতে উইগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. রাজিয়া মাহবুবা আক্তারের মতে, মানবচুল ও উইগের বাজার সম্প্রসারণের পেছনে সৌন্দর্যচর্চার পাশাপাশি চিকিৎসাসংক্রান্ত চাহিদাও কাজ করছে। দেশে পরিকল্পিতভাবে এ শিল্পের বিকাশ ঘটানো গেলে নতুন রফতানি খাত তৈরির পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
নীতিগত সহায়তা পেলে বাড়বে রফতানি
সংশ্লিষ্টদের মতে, মানবচুল ও উইগ রফতানিতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি হলেও এ খাত এখনো পুরোপুরি সংগঠিত নয়। চুল সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও রফতানি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে।
ড. রাজিয়া মাহবুবা আক্তারের মতে, মানবচুলকে শুধু কাঁচামাল হিসেবে রফতানি না করে দেশে প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি করতে হবে। এ জন্য সরকারের স্বীকৃতি, নীতিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি চুল সংগ্রহ ও বিক্রির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে।
অন্যদিকে উদ্যোক্তা মোহাম্মদ আশরাফ মনে করেন, দক্ষ কর্মী তৈরি, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে পারলে বাংলাদেশের উইগ শিল্প বিশ্ববাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
সামগ্রিক রফতানি আয়ে তৈরি পোশাকের আধিপত্য থাকলেও মানবচুল ও উইগ রফতানিতে ৮৬ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফেলে দেওয়া চুল সংগ্রহ করে তা রফতানিযোগ্য পণ্যে রূপান্তরের মাধ্যমে গ্রামীণ পর্যায় থেকে শিল্পকারখানা পর্যন্ত কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ রয়েছে। এখন প্রয়োজন এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কাঁচামাল রফতানির পাশাপাশি দেশে উচ্চমূল্যের উইগ ও হেয়ারপণ্য উৎপাদন বাড়ানো। এতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন উৎস তৈরির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পরিচিতিও বাড়তে পারে।