অন্তর্বর্তী সরকার সাত ইস্যুতে মনোযোগ বাড়িয়েছে। এগুলো হলো রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বাস্তবমুখী বাজেট প্রণয়ন, গুম-খুনে জড়িত ও লুটপাট করে অর্থ পাচারকারীদের বিচার করা, প্রতিবেশী ভারতসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্পর্কোন্নয়ন করা এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করা।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, ‘গত ৫৩ বছরে রাষ্ট্রকাঠামো কোন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে তা আমরা সবাই জানি। এ অবস্থায় সংস্কার ছাড়া গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কি সম্ভব? এ ক্ষেত্রে সরকার সব রাজনৈতিক দলের মতামতকে মূল্যায়ন করছে। গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।’
Manual1 Ad Code
উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন, ‘ছাত্র-জনতা স্বৈরশাসককে ক্ষমতাচ্যুত করে অন্তর্বর্তী সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। এই সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সব নির্বাচনেই কারচুপি করা হয়েছে। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে হাঁটছে সরকার। অতীতের ধারা থেকে বের হয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হলে বেশ কিছু খাতে সংস্কার করতে হচ্ছে। তবে সংস্কার কোন পর্যন্ত করে নির্বাচন দেওয়া হবে, তা রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে ঠিক করা হবে।’
Manual3 Ad Code
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ছয়টি কমিশন গঠন করে। নির্বাচন কমিশন, সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। এসব কমিশন সংস্কারের বিস্তারিত সুপারিশ জানিয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে । রাজস্ব, গণমাধ্যমসহ অন্যান্য খাতের সংস্কারেও মতামত নেওয়া হয়েছে। এসব নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ২৪টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন থেকে কবে কোন সংস্কার করা হবে তা নিয়ে কথা বলে। এসব নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আরও বৈঠক করা হবে।’
প্রধান উপদেষ্টার সিনিয়র প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনায় বসে সংস্কার নিয়ে কাজ শুরু করেছে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন, সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ, জনপ্রশাসনসহ বিভিন্ন খাতে সংস্কার জরুরি। তাই সংস্কারের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনা দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েও হাল ছাড়ছেন না। তিনি ভারতে বসেই বিভিন্ন উসকানিমূলক কথা বলছেন, নির্দেশ দিচ্ছেন। দেশের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমান সরকার যেকোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছে। বিগত সরকারের দোসরদের লুটের অর্থ ও লুটের অর্থে কেনা সম্পদ বিক্রি করে উদ্ধার করতেও জোরেশোরে কাজ চলছে।’
উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন, ‘দেশের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে বিভিন্ন মাজার, ধর্মীয় আস্তানা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। সরকার কঠোরভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করেছে। দেশের মধ্যে কোনো ধরনের সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে দেওয়া হবে না।’
এদিকে নিত্যপণ্যের বাজার স্বাভাবিক রাখতে ডিসেম্বরের শুরুতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরই জবাবে চলতি মাসের শুরুতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত সরকারের সুবিধাভোগী চার থেকে পাঁচ বড় মাপের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে ছিল নিত্যপণ্যের বাজার।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোজায় চাহিদা বাড়ে এমন সব পণ্য আমদানিতে শুল্ক ছাড়, এলসি বা ঋণপত্র খোলায় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। নতুন আমদানিকারকরাও যোগ হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা পণ্যের ৮০ শতাংশ আসে। গত বছর জানুয়ারিতে ২১৪টি প্রতিষ্ঠান রোজার পণ্য আমদানি করেছিল। এবার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৬৫। আমদানি করা পণ্যের পরিমাণও বেড়েছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান খান চৌধুরী বলেন, ‘গত অক্টোবর-নভেম্বরে রাশিয়া ও কানাডা থেকে গম আমদানি শুরু করেছি। শুধু জানুয়ারিতে ১ কোটি ১২ লাখ ডলারের তেল-চিনি আমদানি করা হয়েছে। প্রাণ গ্রুপ পর্যায়ক্রমে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যই আমদানি শুরু করবে। আমাদের লক্ষ্য হলো রোজাসহ সারা বছরই সহনীয় দামে পণ্য বিক্রি করা। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে বাজার নজরদারিতে প্রশাসনের পাশাপাশি ছাত্রদের কাজে লাগানো যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
Manual6 Ad Code
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকার প্রথম বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে এবার বাজেট ইস্যুতে তৃণমূলের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছ থেকে মতামত সংগ্রহে গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে প্রতিবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাক-বাজেট আলোচনা রাজধানীতে শুরু হলেও এবারে অতীতের রেকর্ড ভেঙে গত বৃহস্পতিবার প্রথম খুলনায় অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিগত সরকারের আমলে যেসব গুম-খুন হয়েছে তার বিচার করতে চলতি মাসে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত ঘুম-খুনের বিচারে বর্তমান সরকার মনোযোগী। শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের বিচার সরকারের এই মেয়াদেই হবে। এর জন্য যা যা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার তা করা হচ্ছে।’
বর্তমান সরকার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়নে আরও গতি বাড়িয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় সূত্র জানায়, বিভিন্ন দেশে বিগত সরকারের দোসররা আত্মগোপনে আছে। এসব ব্যক্তি দেশ থেকে অর্থ পাচার করে ওই সব দেশে সম্পদ করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে আত্মগোপনে থাকা ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ও পাচার করা অর্থ-সম্পদ উদ্ধারের লক্ষ্যে সরকার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।