নিজস্ব প্রতিবেদক :
সিলেট মহানগরীর রায়নগর এলাকায় মিতালি নিকুঞ্জ ভিলায় নির্মমভাবে তিন খুনের ঘটনায় বাবুল মিয়াকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে তুলেছে পুলিশ। এসময় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের কাছে ১০ দিনের রিমাণ্ড চাওয়া হলে আদালত ৪ দিনের রিমাণ্ড মঞ্জুর করেন।
রবিবার (১৬ আগস্ট) সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে বাবুল মিয়াকে গ্রেফতার দেখিয়ে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের কাছে ১০ দিনের রিমাণ্ড আবেদন করে।
শুনানি শেষে আদালতের বিচারক ফারহানা সুলতানা চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এসএমপির উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম কর্মকর্তা) মো. মনজুরুল আলম।
এর আগে, গত বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে মহানগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসা নিকুঞ্জ ভিলার মালিক বিয়ানীবাজার আখাখাজনা এলাকার মৃত আবরু মিয়ার ছেলে রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার মিতালি ১১১ নম্বর বাসার মালিক মো. আব্দুস সাত্তার (৮২), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (২৫) হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী কলেজের মর্গে প্রেরণ করে।
Manual7 Ad Code
এদিকে শুক্রবার (১৪ আগস্ট) আসরের নামাজের পর সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শাহী ঈদগাহ ময়দানে আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের নামাজের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এবং পরবর্তীতে মহানগরীর মানিক পীরের টিলায় নিহত দম্পতির দাফন সম্পন্ন হয়।
এদিকে নিহতদের দাফন শেষ করে এদিন রাত আনুমানিক ৮টার দিকে যুক্তরাজ্য প্রবাসী মেয়ে সেলিনা বেগম ও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ছেলে সিলেট মহানগরীর কোতোয়ালী থানায় অভিযোগ দায়ের করেন বলেও জানা গেছে। ওই অভিযোগে কাউকের আসামি করা হয় নি বলে জানা গেছে।
এইদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা থেকে একটি ফ্লাইটে করে সিলেটে এসে পৌঁছান নিহত দম্পতির ছেলে আরিফ ইফতেখার। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি বাসায় গিয়ে নিহত মা-বাবাকে শেষ দেখা দেখেন।
Manual5 Ad Code
এর আগের দিন বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) যুক্তরাজ্যপ্রবাসী দুই মেয়ে দেশে পৌঁছান। ফ্লাইটটি সকাল সাড়ে ৯টায় অবতরণের কথা থাকলেও বিলম্বের কারণে দুপুর দেড়টায় এসে সিলেটে পৌঁছান তারা। পরবর্তীতে সিলেট বিমানবন্দর থেকে তারা সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালে পৌছান। ময়নাতদন্ত শেষে সেখান থেকে মো. আব্দুস সাত্তার ও সুরাইরা বেগমের লাশ নিয়ে রায়নগরের নিজস্ব বাসভবনে যান।
Manual8 Ad Code
পুলিশ জানায়, এই ট্রিপল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়র পরপরই ওই দিন বিকাল আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে অভিযান দিয়ে অভিযুক্ত রায়নগর রাজবাড়ী এলাকার একটি কলোনী থেকে বাবুল মিয়া (৪০) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারের পর পুলিশের কাছে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার কথা স্বীকার করেন তিনি। তার দেওয়া তথ্যমতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছোরা উদ্ধার অভিযানে নামে পুলিশ। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে বাবুল মিয়ার দেখানো স্থান থেকেই এই ছোরা উদ্ধার করে পুলিশ।
বাবুল মিয়া গ্রেফতার ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে পুলিশ জানায়, গৃহকর্মী তাহমিনার সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পূর্ব পরিচিত হওয়ায় বুধবার বাবুল মিয়া ওই বাড়িতে যান। দরজায় নক করলে গৃহকর্মী তাহমিনা দরজা খুলে তাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেন। পরে একটি কক্ষে গিয়ে তাহমিনার সাথে শারিরীক সম্পর্ক করতে চান। কিন্তু তাহমিনা সেই সম্পর্কে অমত প্রকাশ করলে তার কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বাবুল মিয়া ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করে। এ সময় সুরাইয়া এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তার সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয় এবং একপর্যায়ে তাকেও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থলে তিনজনকে হত্যার পর বাবুল মিয়া বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে সে রায়নগর এলাকায় নিজের বাড়িতে ফিরে আসে। পুলিশের গঠিত বিশেষ টিমের সদস্যরা সেখানে গিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে।
প্রসঙ্গত, মো. আব্দুস সাত্তারের গ্রামের বাড়ি বিয়ানীবাজার এলাকার আখাখাজনায়। রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত তিনি। আব্দুস সাত্তার সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন। একসময় তিনি কয়লা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের উপদেষ্টা ছিলেন। এছাড়াও মিতালী আবাসিক এলাকায় তাঁর পাশাপাশি তিনতলা দুটি বাসা রয়েছে। তার মধ্যে ১১১ নম্বরের ৩য় তলাবিশিষ্ট নিজস্ব বাসায় বসবাস করতেন। উপরের তলা ও নিচতলায় ভাড়াটিয়ারা থাকতেন এবং তিনি দ্বিতীয় তলায় থাকেন। মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তারর সাথে বাসায় বসবাস করতেন তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও তাদের গৃহপরিচারিকা তাহমিনা। দুই বিল্ডিংয়ের বাকি ফ্ল্যাটগুলোতে ভাড়াটিয়ারা থাকতেন। আব্দুস সাত্তারের তিন মেয়ে ও এক ছেলে। এক ছেলে ও এক মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ও দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে থাকেন। সাত্তার মিয়া বয়স্ক লোক হওয়ায় তিনি বিভিন্ন রোগে আক্রান্তও বলে জানা যায়।