নিউজ ডেস্ক :
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর (US Army) একজন গর্বিত সৈনিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সিলেটী বাংলাদেশি তরুণ পংকজ তালুকদার।
দীর্ঘ পাঁচ মাসের কঠোর শারীরিক ও মানসিক প্রশিক্ষণের পর সাধারণ সিভিলিয়ান জীবন থেকে তিনি এই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছেন।
Manual4 Ad Code
পংকজ সিলেটের হাতিম আলী উচ্চবিদ্যালয় ও এমসি কলেজে পড়াশোনা শেষে নিউইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক (CUNY) থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। পেশাগত জীবনে তিনি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি টিলাগড় এলাকার বাসিন্দা গৌরাঙ্গ তালুকদারের কনিষ্ঠ ভাই। তাঁদের আদি নিবাস সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায়। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কোরে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের এই কঠিন ও রোমাঞ্চকর যাত্রার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন পংকজ, যা এখন অনেকের জন্যই এক অনন্য অনুপ্রেরণা।South Asians & Diaspora
ভোর ৩টা থেকে রাত ৯টা: রুটিন যেন এক কঠিন পরীক্ষা ইউএস আর্মিতে যোগ দেওয়ার পথটি মোটেই মসৃণ ছিল না। পংকজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফিজিক্যাল ট্রেনিং, মেন্টাল ট্রেনিং এবং অ্যাডভান্সড ইন্ডিভিজুয়াল ট্রেনিং—প্রতিটি ধাপেই তাঁকে নিজের সক্ষমতার চূড়ান্ত পরীক্ষা দিতে হয়েছে। দিন শুরু হতো ভোর ৩ থেকে ৪টায় এবং শেষ হতো রাত ৮ থেকে ৯টায়। দিনের পর দিন ঘুম, বিশ্রাম বা নিজের জন্য সামান্য একটু সময় বের করাও যেন বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রতিদিনের রুটিন ছিল কেবলই ট্রেনিং, কঠোর শৃঙ্খলা এবং নিজের সীমাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার নিরন্তর চেষ্টা।
১১০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় জঙ্গলে টিকে থাকার লড়াই মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণ বা ফিল্ড ট্রেনিং ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। প্রায় ১১০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রার প্রচণ্ড গরমে টানা ৪ দিন জঙ্গলে কাটাতে হয়েছে তাঁকে। সাপ, পোকামাকড় আর অসীম ক্লান্তির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়েছে এই বাংলাদেশিকে। এর পাশাপাশি এম৪ (M4) রাইফেল হাতে শুটিং, লাইভ গ্রেনেড নিক্ষেপ, মাইন শনাক্তকরণ এবং নানা ধরনের দুর্গম অবস্টাকল কোর্স সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন তিনি।
কমেছে ২৬ পাউন্ড ওজন, ভারী ব্যাগ কাঁধে টানা ১০ মাইল হাঁটা কঠোর এই প্রশিক্ষণের কারণে মাত্র পাঁচ মাসে পংকজের ওজন কমেছে ২৬ পাউন্ড। প্রায় প্রতিদিনই ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার দৌড়াতে হতো তাঁকে। এর মধ্যে সবচেয়ে কষ্টকর ছিল কাঁধে ৪৫-৫০ পাউন্ডের ভারী রুকস্যাক ও হাতে এম৪ রাইফেল নিয়ে টানা ১০ মাইল পথ হাঁটা, তা-ও আবার মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে। শরীর ভিজে একাকার হলেও থামার কোনো সুযোগ ছিল না।
Manual7 Ad Code
পংকজ বলেন, “কখনো শরীর বলেছে আর পারছি না। কখনো মন বলেছে একটু বিশ্রাম দরকার। কিন্তু থেমে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। নিজেকেই বারবার বলেছি— আরেকটু চেষ্টা করো, তুমি পারবে।”
মোবাইল ছাড়া জীবন ও প্রিয়জনদের শূন্যতা শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিক পরীক্ষাও দিতে হয়েছে তাঁকে। দীর্ঘ সময় পরিবার, প্রিয়জন ও পরিচিত জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিলেন তিনি। মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় মাঝে মাঝে যখন মাত্র ৩০ মিনিটের জন্য ফোন হাতে পেতেন, তখন সেই অল্প সময়টুকুর প্রকৃত মূল্য তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন।
Manual4 Ad Code
কষ্ট ছিল ক্ষণস্থায়ী, গর্ব চিরস্থায়ী সব বাধা পেরিয়ে পংকজ আজ যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর একজন গর্বিত সদস্য। পেছনে ফিরে তাকিয়ে তিনি মনে করেন, সেই নির্ঘুম রাত, ঘাম ও ব্যথাই তাঁকে আজকের মানুষটিতে পরিণত করেছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় যারা তাঁকে সাহস দিয়েছেন ও মানসিকভাবে শক্তি জুগিয়েছেন, তাঁদের সবার প্রতি তিনি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পংকজের এই অর্জনে তাঁর বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা উষ্ণ অভিনন্দন জানাচ্ছেন। সবাই তাঁর সাহস, সততা ও শৃঙ্খলার প্রশংসা করে বলছেন, এই অর্জন সত্যিই অত্যন্ত গর্বের।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে গর্বিত এই বাংলাদেশি তরুণ বলেন, “সিভিলিয়ান হিসেবে যে যাত্রা শুরু করেছিলাম, আজ সেই যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ করে আমি গর্বিতভাবে বলতে পারি— I am a U.S. Army Soldier”
পংকজের দৃপ্ত উচ্চারণ, “এই পথ সহজ ছিল না। কিন্তু প্রতিটি কষ্ট সার্থক হয়েছে। The pain was temporary. The pride is forever. Hooah!”South Asians & Diaspora