প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১২ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৬ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

সক্রিয় ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ চক্র

editor
প্রকাশিত জুন ৪, ২০২৫, ০৭:২৫ অপরাহ্ণ
সক্রিয় ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ চক্র

Manual6 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

Manual4 Ad Code

ঈদুল আজহাকে ঘিরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট। আর প্রতি বছরের মতো এবারো এই সময়টিকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন প্রতারক চক্র। ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’- নামে পরিচিত একটি চক্র সাধারণ মানুষের সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন আসন্ন ঈদকে ঘিরে এ প্রতারক চক্র বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনালগুলো এবং পশুর হাটে আসা ক্রেতা- বিক্রেতাদের টার্গেট করতে পারে।

শয়তানের নিঃশ্বাস’ চক্রটির সদস্যরা অত্যন্ত কৌশলী এবং ছদ্মবেশে থাকে। সাধারণত তারা পরিপাটি পোশাকে জনবহুল এলাকায় ঘোরাফেরা করে, যাতে কেউ তাদের সন্দেহ না করে। এ চক্রের মূল অস্ত্র হলো- স্কোপোলামিন নামের একটি মাদক, যা নিঃশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করিয়ে মানুষকে অচেতন কিংবা নিয়ন্ত্রণহীন করে ফেলে। সামপ্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ চক্রের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। ব্যবসায়ী, পথচারী ও ব্যাংকে আসা গ্রাহকদের থেকে সর্বস্ব লুটের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রতারণায় ব্যবহার করা হয় ভয়ঙ্কর এক রাসায়নিক মাদক স্কোপোলামিন যাকে সাধারণত শয়তানের নিঃশ্বাস বা উবারষং ইৎবধঃয নামে পরিচিত। এটি নিঃশ্বাসের মাধ্যমে মাত্র ৬-১২ ইঞ্চি দূরত্ব থেকে মানবদেহে প্রবেশ করে এবং ২০ থেকে ৬০ মিনিটের মধ্যেই মানুষের স্মৃতি, বিচারশক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর করে তোলে।

স্কোপোলামিন মস্তিষ্কে অ্যাসিটাইলকোলিন নামক রাসায়নিক সংকেতকে অবরুদ্ধ করে দেয়, ফলে মানুষের চিন্তা, স্মৃতি এবং আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। আক্রান্ত ব্যক্তি বাস্তবতা বুঝতে পারেন না, এমনকি অপরাধীকে চিনতেও পারেন না। ভুক্তভোগীরা সচেতন থাকলেও তাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজেরাই সমস্ত মূল্যবান জিনিসপত্র তুলে দেন অপরাধীদের হাতে এমনকি পরে কিছুই মনে রাখতে পারেন না।

Manual1 Ad Code

সূত্রমতে, স্কোপোলামিনের উৎপত্তি দক্ষিণ আমেরিকার কলম্বিয়া ও ইকুয়েডরে। স্থানীয়ভাবে এটি ‘বুরুন্ডাঙ্গা’ নামে পরিচিত। একসময় এটি মেনিনজাইটিস, মেরিন সিকনেস এবং অস্ত্রোপচারের পর বমি রোধে ব্যবহার করা হতো। তবে বর্তমানে এটি ভয়ঙ্কর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে। শুধুমাত্র কলম্বিয়াতেই প্রতিবছর প্রায় ৫০,০০০টি স্কোপোলামিন-সম্পর্কিত অপরাধের ঘটনা ঘটে। এটি মূলত সোলানাসি পরিবারের উদ্ভিদ যেমন- বেলাডোনা, ডেটুরা এবং ব্রুগম্যানসিয়া থেকে সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশে ধুতুরা নামে পরিচিত ফুল থেকে উপাদান নিয়ে সিনথেটিক্যালি এ মাদক তৈরি হয়। স্কোপোলামিন প্রথম দিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গোয়েন্দা জ্ঞিাসাবাদের ক্ষেত্রে ‘ট্রুথ সেরাম’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। অর্থাৎ এটা যদি ইনজেক্ট করে দেয়া হয় তাহলে সে সত্য কথা বলতে শুরু করে। কারণ তার মগজের উপর নিজস্ব যে নিয়ন্ত্রণ সেটা চলে যায়। সে তখন অন্যের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, অন্যের কথা শুনতে থাকে।

Manual5 Ad Code

গত ২৮শে মে রাজধানীতে রাইড শেয়ারের নারী যাত্রী ধর্ষণের শিকার হন। রাইড শেয়ারের মোটরসাইকেলে উঠার পর চলকের দেয়া হেলমেট পড়েন তিনি এর কিছুক্ষণ পর অচেতন হয়ে পড়েন, ধারণা করা হচ্ছে হেলমেটের ভিতর স্কোপোলামিন নামক মাদকদ্রব্য প্রয়োগ করা হয়েছিল। এর আগে লক্ষ্মীপুর, বরগুনা ও গাইবান্ধাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে। গত ২০শে মে কুমিল্লায় এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে তার দোকানের ক্যাশে থাকা সব টাকা হাতিয়ে নেয় এই চক্র। পরে সিসিটিভি ফুটেজে চক্রটির সদস্যদের গাজীপুর এলাকায় দেখা যায়। সমপ্রতি গত ২রা জুন চট্টগ্রামের পটিয়ায় এ চক্রের কবলে পড়ে ১ লাখ টাকা হারান অবসরপ্রাপ্ত এক সরকারি কর্মকর্তা। গত ১৭ই এপ্রিল লক্ষ্মীপুরে ব্যাংকে টাকা তুলতে আসা এক নারীর ৮০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় শয়তানের নিঃশ্বাস নামক প্রতারক চক্র। ২০শে এপ্রিল বরগুনায় শয়তানের নিঃশ্বাস চক্রের খপ্পরে পড়ে ১ লাখ টাকা খোয়ান এক ব্যবসায়ী। এছাড়া কুমিল্লা, গাইবান্ধা ও চট্টগ্রামে এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ঈদকে ঘিরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’- নামে পরিচিত একটি প্রতারক চক্র। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে কিছুটা নিষ্ক্রিয়তা দেখা গেছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে স্কোপোলামিন জাতীয় মাদক ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধ কর্মকাণ্ড বেড়ে গেছে। এই চক্রের সদস্যরা অত্যন্ত কৌশলী এবং ছদ্মবেশে থাকে। তারা পরিপাটি পোশাকে থাকেন যাতে সাধারণ মানুষ তাদের সন্দেহ না করে। বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় তারা ঠিকানা চিনছে না এমন ভান করে ভিজিটিং কার্ড, টাকা বা কাগজপত্র মানুষের সামনে ধরে রাখে। এসব বস্তুতে থাকা স্কোপোলামিন নিঃশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। এই মাদক এতটাই ভয়ঙ্কর যে, আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের ইচ্ছাশক্তি হারিয়ে ফেলে এবং প্রতারকের নির্দেশে নিজের টাকা, মোবাইল, গয়না এমনকি মূল্যবান জিনিসপত্র হস্তান্তর করে দেয়। আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে কিছুই বোঝে না এবং পরে ঘটনার কথা মনে করতেও পারেন না। ড. তৌহিদুল হক বলেন, এই অপরাধীদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। একজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করলেই তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাদকের উৎস এবং পুরো চক্রকে খুঁজে বের করা সম্ভব। পুলিশকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি মোকাবিলা করতে হবে। জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু সতর্কতামূলক পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, পশুরহাটে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে, যাতে নিঃশ্বাসের মাধ্যমে স্কোপোলামিন শরীরে প্রবেশ না করতে পারে। হাট এলাকায় কার্যকর সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও সেগুলোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। ইজারাদারদের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবকদের দৃশ্যমান টহলের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি আরও জানান, এ ধরনের প্রতারণা সমাজে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস তৈরি করছে। কেউ বিপদের আশঙ্কায় সহযোগিতার হাত বাড়াতে ভয় পায়। অতি দ্রুত এ মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মানুষ নিজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে পরস্পরকে সহযোগিতা করা এবং মানবিক সহায়তা থেকে নিজেকে বিরত রাখবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মুখপাত্র ডিসি তালেবুর রহমান জানান, পশুরহাটকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অপরাধী চক্র সাধারণ মানুষের সর্বস্ব লুটের জন্য নানা ধরনের ফাঁদ পাতে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা সকল ইজারাদার এবং ডিএমপি’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে একাধিক মিটিং করেছি। সমপ্রতি আমাদের গোয়েন্দা টিম ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’- নামের প্রতারক চক্রের কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। আমাদের গোয়েন্দা টিম এ নিয়ে কাজ করছে। হাটে ক্রেতা-বিক্রেতারা যাতে কোনোভাবেই প্রতারিত না হন, সে লক্ষ্যে আমরা পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদাপোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত পরিমাণে সদস্য মোতায়েন রয়েছে। প্রতিটি হাটেই পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সতর্কতামূলক বার্তা প্রচার করা হচ্ছে, যাতে কেউ প্রতারক চক্রের ফাঁদে না পড়ে। ডিএমপি’র পক্ষ থেকে হাটে আসা ক্রেতা-বিক্রেতাদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে, সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি বা পরিস্থিতি দেখলে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ পুলিশের সহায়তা নিতে।

Manual3 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪৫
৭৮৯১০১১১১৩
৪১৫১৬১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৯৩০  

Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code