নিজস্ব প্রতিবেদক:
‘অপরাধী ধরার পর আইনের ফাঁকফোকড় দিয়ে দ্রুত জামিনে বের হয়ে যায়। বের হয়েই তারা একই অপরাধে জড়ায়। পুলিশ একটা অপরাধীকে ধরতে যত সময় লাগে, তার চেয়ে কম সময়ে তারা জেল থেকে বের হয়ে আসে। তাদের পেছনে কারা আছে? কিভাবে এতো অল্প সময়ে জামিন করিয়ে নেয়। আজ গ্রেফতার করলে কাল এসে পুলিশের সামনে এসে হাসে।’
Manual7 Ad Code
সিলেট মহানগরীর হালনাগাদ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এমন আক্ষেপের কথা বলছিলেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, পিপিএম। তবে এখন থেকে আর আক্ষেপ নয়, অপরাধীদের জেলে আটকে রাখতে পুলিশ নিয়েছে ভিন্ন কৌশল। মাদককে সকল অপরাধের সূতিকাঘার ঘোষণা দিয়ে পুলিশ নেমেছে চিরুণী অভিযানে। এই অভিযানে নিয়মিত মামলা নয়, একদম ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ কৌশল নিয়েছে পুলিশ। মাদকসেবী ও কারবারি পেলেই ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে সাজা দিয়ে পাঠানো হচ্ছে জেলে। পুলিশের এই উদ্যোগ নগরবাসীর প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গেল কয়েক মাস ধরে সিলেটে হঠাৎ করে বেড়ে যায় চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধ। অপরাধদমনে পুলিশও মাঠে নামে আধাজল খেয়ে। বিশেষ অভিযানে প্রতিদিনই দাগীদের পাশাপাশি ধরা পড়ছে নতুন অপরাধীরাও। কিন্তু গ্রেফতারের পর অল্প সময়ের মধ্যে আইনের ফাঁকফোকড় দিয়ে বের হয়ে এসে তারা ফের একই অপরাধে জড়ায়। তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, এসব অপরাধীদের প্রায় শতভাগই মাদকাসক্ত। বেশিরভাগ অপরাধী মাদকের টাকার জন্য জড়িয়ে আছে অপরাধজগতে। এছাড়া সিলেট মহানগরীতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি ধর্ষন ও খুনের ঘটনার সাথে জড়িতরাও মাদকাসক্ত ছিল বলে জানতে পারে পুলিশ। তাই শেষ পর্যন্ত মাদক নির্মূলে ‘জিহাদ’ ঘোষণা করে মাঠে নেমেছে এসএমপি।
Manual3 Ad Code
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত মে মাসে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ৬৬৫ জন অপরাধীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। চলতি বছরের আগের মাসগুলোতেও গ্রেফতারের সংখ্যা ছিল প্রায় সমান। পুলিশের এতো অভিযানের পরও অপরাধ দমন না হওয়ায় এবার মাদক নির্মূলের মাধ্যমে অপরাধমুক্ত নগর গড়ার বিশেষ ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ নিয়েছে এসএমপি। গ্রেফতারকৃত অপরাধীদের জেলে আটকে রাখতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ পরিকল্পনা। এর অংশ হিসেবে গত শনিবার রাত থেকে শুরু হয়েছে ‘চিরুণী অভিযান’ নামে ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’। জেলা প্রশাসনের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এ অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। মাদকসেবী ও কারবারি ধরেই ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে সাজা দিয়ে তাদেরকে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে জেলে।
মাদক ও অপরাধমুক্ত নগর গড়ার ঘোষণা দিয়ে চিরুণী অভিযান অব্যাহত রেখেছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)। বুধবার (১০ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মহানগরীতে চিরুণী অভিযান চালায় পুলিশ। এসময় বিভিন্ন অপরাধে ১৫৪ জনকে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে দণ্ড দেওয়া হয়। এর মধ্যে কোতোয়ালী থানায় ৩৪ জন, জালালাবাদে ২১ জন, এয়ারপোর্টে ২৬ জন, দক্ষিণ সুরমায় ২৭ জন, মোগলাবাজারে ১৯ জন ও শাহপরাণ থানা এলাকা থেকে ২৭ জনকে আটক করে দণ্ড দেওয়া হয়।
Manual8 Ad Code
এর পরে সোমবার (৮ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে শুরু হয়ে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মোট ৪ ঘন্টা এবং মঙ্গলবার (৯ জুন) মোগলাবাজার থানার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সাড়ে ১২ঘন্টার অভিযানে ১১০ জনকে আটক করা হয়। অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আটক ব্যক্তিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আটককৃতদের মধ্যে কোতোয়ালি মডেল থানায় ২৪ জন, জালালাবাদ থানায় ১৪ জন, এয়ারপোর্ট থানায় ২৩ জন, দক্ষিণ সুরমা থানায় ২১ জন, মোগলাবাজার থানায় ৬ জন এবং শাহপরাণ (রহঃ) থানায় ২২ জন রয়েছেন বলে জানায় পুলিশ।
গত শনিবার (৬ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে মাত্র ৪ ঘন্টার অভিযানে মাদকসেবী ও কারবারীসহ ১৩৯ জনকে আটক করে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে সাজা দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। পুলিশের এই ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’র পর থেকে মাদকজগতে অস্থিরতা শুরু হয়েছে বলেও জানা গেছে।
এসএমপি কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী জানান, আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে মাদকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান শুরু হয়েছে। মাদক ও অপরাধমুক্ত মহানগরী না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান চলবে। তবে এই মিশনে পুলিশের একার পক্ষে সফল হওয়া খুবই চ্যালেঞ্জিং। এজন্য সকল শ্রেণির নাগরিকদের সহযোগিতা প্রয়োজন। সামাজিক সংগঠন ও জ্ঞানী-গুণী লোকজন এগিয়ে আসলে সমাজ পরিবর্তন সহজ হয়।
পুলিশ কমিশনার জানান, মাদকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্যাম্পিং ও অভিভাবক সমাবেশ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে আলোচনাসভার আয়োজন করা হবে। মাদকের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তিনি জানান, অপরাধ নির্মূলে অপরাধপ্রবণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি চলছে, মাদকের হটস্পট চিহ্নিত ও কিশোরগ্যাং নির্মূলে অ্যাকশন প্ল্যান করা হয়েছে। সকল অপরাধের সূতিকাঘার হচ্ছে মাদক। মাদক নির্মূলে মাদকের কারবারি ও তাদের গডফাদারদের চিহ্নিত করার কাজও চলছে।