প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২রা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২২শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

গ্যাস সংকট কাটছে শিগগিরই, সরবরাহ স্বাভাবিকের আশা

editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৬, ০৯:২৮ পূর্বাহ্ণ
গ্যাস সংকট কাটছে শিগগিরই, সরবরাহ স্বাভাবিকের আশা

Manual7 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

দীর্ঘদিনের তীব্র গ্যাস সংকট ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে। নতুন করে এলএনজি আমদানি, জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের উদ্যোগে পরিস্থিতির উন্নতির আশা করছে সরকার।

আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরবে এবং চলতি মাসেই শিল্প, বিদ্যুৎ, সিএনজি ও আবাসিক খাতে সংকট অনেকটাই কমে আসবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।তবে চাহিদার তুলনায় দৈনিক এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি ঘাটতি থাকায় সাময়িক স্বস্তির পর দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলছে, প্রাথমিক সংকট ইতিমধ্যে কেটে গেছে। মহেশখালীতে থাকা ভাসমান দুটি এলএনজি টার্মিনাল এখন পূর্ণ সক্ষমতায় সরবরাহ করতে পারবে। তবে গ্যাসের কিছুটা সংকট রয়েছে। সেই সংকট কাটাতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাড়তি দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কারণে চলতি মাসেই সংকট কেটে যাবে। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সংকট কাটাতে কূপ খনন, ওয়ার্ক ওভার, দেশীয় কয়লা উত্তোলন ও সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোসহ বিভিন্ন প্রচেষ্টা চলছে।

তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহে এখনও ঘাটতি রয়েছে। ফলে সাময়িকভাবে সংকট কমলেও দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান কীভাবে কমানো হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন এবং একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও আবাসিক— সব খাতেই। কোথাও কারখানায় উৎপাদন কমেছে, কোথাও বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসের অভাবে পুরো সক্ষমতায় চলতে পারেনি। আবার রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় রান্নার কাজেও চরম ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ মানুষ।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিনই প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি ঘাটতি থাকছে। এই ঘাটতির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যায়।

তবে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হচ্ছে এখন। নতুন করে এলএনজি কার্গো দেশে আসায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, পর্যায়ক্রমে আরও এলএনজি দেশে এলে সরবরাহের ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

 

Manual1 Ad Code

কয়েক দিনের মধ্যে স্বাভাবিকের আশা : সরকারের পক্ষ থেকেও গ্যাস সংকট দ্রুত কেটে যাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। সোমবার রাজধানীতে আয়োজিত একটি সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি আমদানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাই আশা করি, কয়েক দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও বলেছেন, সংকট কাটিয়ে উঠতে কাজ করছে সরকার। আগামী এক থেকে দেড় সপ্তাহের মধ্যেই সমাধান আসবে।

গত সপ্তাহে সংসদে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে। আগস্টে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে, সেপ্টেম্বরে তা যাতে আর না হয় এ জন্য সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।

সরকারের এসব বক্তব্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিল্প-কারখানাকে উৎপাদন কমিয়ে দিতে হয়েছে। কেউ কেউ নির্ধারিত সময়ের তুলনায় কম সময় কারখানা চালাচ্ছেন। এতে উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ও রফতানি কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ছে।

ব্যবসায়ীদের মতে, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে শিল্প-কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারবে। এতে উৎপাদন বাড়বে, রফতানি কার্যক্রমে গতি আসবে এবং নতুন বিনিয়োগের পরিবেশও কিছুটা উন্নত হবে।

Manual2 Ad Code

কয়লা উত্তোলন : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১ সেপ্টেম্বর সংসদে বলেছেন, দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে ফুলবাড়ীর উচ্চমানের কয়লা কাজে লাগানো গেলে একদিকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা সম্ভব হবে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফুলবাড়ীতে যে কয়লা রয়েছে, তা বিশ্বের উন্নত মানের কয়লার মধ্যে অন্যতম। এ কয়লা উত্তোলন করে দেশের জ্বালানি সংকট মেটানো গেলে সেটি দেশের জন্য ভালো হবে। একই সঙ্গে কয়লা আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।

তবে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও স্থানীয় জনগণের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ পদ্ধতিতে উত্তোলন করতে গেলে ওই এলাকায় বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, স্থানীয় মানুষের আয়-রোজগারের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। তাদের জীবন-জীবিকা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে গ্যাসের পাশাপাশি কয়লার মতো দেশীয় জ্বালানিসম্পদ কাজে লাগানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেশীয় কয়লা ব্যবহার করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ঝুঁকিও কিছুটা কমানো সম্ভব।

সরকারের নানা উদ্যোগ : দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে গ্যাস, এলএনজি, পারমাণবিক ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আবেদনকৃত গ্রাহকসহ দেশে গ্যাসের মোট চাহিদা ৫ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে (এমএমসিএফডি) পৌঁছাতে পারে। এই বাড়তি চাহিদা পূরণে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও জ্বালানি মজুদ বাড়ানোর পরিকল্পনাও নিয়েছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, গ্যাসের চাহিদা মেটাতে মাতারবাড়ীতে ১ হাজার এমএমসিএফডি সক্ষমতার স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে ৬০০ এমএমসিএফডি সক্ষমতার ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের লক্ষ্যে একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে।

নতুন গ্যাসকূপ খননের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিগত সরকারের ভুল নীতির সমালোচনা করে তিতুমীর বলেন, দেশের নিজস্ব গ্যাসের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানো প্রয়োজন।

এদিকে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উপদেষ্টা জানান, কেন্দ্রটি ২০২৭ সালের শুরুর দিকে উৎপাদনে আসতে পারে। তবে চালুর আগে এর শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।

জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ডিজেলের মজুদও বাড়ানো হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে দেশে মাত্র ১৭ দিনের ডিজেল মজুদ থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৩২ দিনে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে ৯০ দিনের জ্বালানি মজুদ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে সরকার। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনেও নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচির সঙ্গে খালের ওপর সোলার প্যানেল স্থাপনের একটি পাইলট প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এতে কৃষিজমির ওপর বাড়তি চাপ না দিয়ে এবং পানির বাষ্পীভবন কমিয়ে প্রতি কিলোমিটার খাল থেকে সর্বোচ্চ ৩ মেগাওয়াট পর্যন্ত পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া ৫৮ বছর পর দেশে নির্মাণ হতে যাচ্ছে দ্বিতীয় ও সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার। ত্রিশ লাখ টন সক্ষমতার এ শোধনাগার চালু হলে দেশের ৪৫-৫০ শতাংশ জ্বালানি তেলের চাহিদা স্থানীয়ভাবে পূরণ হবে। এতে ডিজেল, অকটেনসহ পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি কমবে এবং সাশ্রয় হবে বৈদেশিক মুদ্রা। প্রকল্পে ১০০ কোটি ডলার অর্থায়ন করবে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)।২০৩০ সালের নভেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

সরকারের এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Manual1 Ad Code

সব মিলিয়ে দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট থেকে আপাতত কিছুটা স্বস্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নতুন এলএনজি কার্গো আসা এবং জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগের ফলে কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করছে সরকার।

Manual8 Ad Code

দেশে চলমান জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণে কেবল সরবরাহ বাড়ানো নয়, বরং জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, কৌশলগত মজুদ গড়ে তোলা এবং শিল্প খাতে বিকল্প উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন। তিনি বলেছেন, স্বল্পমেয়াদে এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১
২৩৪৫৭৮
৯১০১১১১৩৪১৫
১৬১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৯
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code