টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা সামাজিক মাধ্যমে প্রিয় তারকার হাসিভরা মুখ, সঙ্গে আকর্ষণীয় সংলাপÑ ‘এই খাবার পুষ্টিতে ভরপুর’। খ্যাতিমান মডেল বা অভিনয়শিল্পীদের এমন কথায় আস্থা রেখে মা-বাবারা নিশ্চিন্তে সেই খাবার তুলে দিচ্ছেন সন্তানের মুখে। কিন্তু চকচকে মোড়কের ভেতরের খাবারটি আসলে উচ্চমাত্রার চিনি, সোডিয়াম আর ক্ষতিকর রাসায়নিকে ঠাসা এক বিষটোপ, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঠেলে দিচ্ছে স্থূলতা, ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল রোগের দিকে।
জনস্বাস্থ্যের এমন ভয়াবহ ঝুঁকির পরও নৈতিক দায় নিতে নারাজ বিজ্ঞাপন নির্মাতা ও তারকা মডেলরা। আর নিয়ন্ত্রক সংস্থাও সীমাবদ্ধ শুধু সতর্কবার্তা আর চিঠির চালাচালিতে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদনকারী থেকে শুরু করে বিজ্ঞাপন নির্মাতা ও মডেলদের জবাবদিহির আওতায় আনতে একটি পূর্ণাঙ্গ ও কঠোর আইন প্রণয়নের বিকল্প নেই। তা না হলে বিজ্ঞাপনের এই মায়াজালে আটকে দেশবাসীর নিরাপদ খাদ্যের অধিকার হুমকিতেই থেকে যাবে।
Manual7 Ad Code
দেশে বিপুলসংখ্যক ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সব বয়সী মানুষকে লক্ষ্য করে খাবার তৈরি করছে। বিজ্ঞাপনে এসব পণ্যের নানা কাল্পনিক পুষ্টিগুণের কথা বলা হলেও বিভিন্ন পরীক্ষাগারের বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই; এমনকি পণ্যের মোড়কেও সেসব পুষ্টির উল্লেখ থাকে না। পুষ্টিহীন ও কৃত্রিম রাসায়নিক উপাদানসমৃদ্ধ এসব খাবার খেয়ে মানুষ নিয়মিত স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি অসুখে আক্রান্ত হচ্ছেন।
ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
বিজ্ঞাপনের প্রলোভনে পড়ে ভোক্তারা, বিশেষ করে শিশুরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। সৈয়দ শহীদ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. মো. রিয়াদ হোসেন বলেছেন, ‘বাজারে বিক্রি হওয়া উচ্চমাত্রার চিনি, অস্বাস্থ্যকর চর্বি ও সোডিয়ামযুক্ত কম পুষ্টিগুণের জাঙ্ক ফুড নিয়মিত খেলে শিশুদের গুরুতর শারীরিক, মানসিক ও আচরণগত স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। উচ্চমাত্রার চিনি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেটের কারণে ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা বেড়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অতিরিক্ত ট্রান্স ফ্যাট, স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং সোডিয়াম অল্প বয়সেই রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল (এলডিএল) ও রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। কার্বনেটেড পানীয় মুখের ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য জোগায়, যা দাঁতের এনামেল ক্ষয় করে। অতিরিক্ত লবণ, চর্বি ও চিনিযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার মস্তিষ্কে শক্তিশালী ডোপামিন নিঃসরণ ঘটায়, যা শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে আসক্ত করে ফেলে। এসব খাবারের কারণে শিশুদের স্থূলতা ও হৃদরোগের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এমনকি শিশুদের মনোযোগের ঘাটতি ও মেজাজ খিটখিটে হওয়ার পেছনেও এসব খাবার দায়ী।’
Manual5 Ad Code
দায় নিতে নারাজ নির্মাতা ও মডেলরা
খাদ্যপণ্যের ভেতরে লুকানো অতিরিক্ত চিনি, প্রসেসড ফ্যাট বা প্রিজারভেটিভের ক্ষতিকর দিকগুলো বিজ্ঞাপনে কখনোই প্রকাশ করা হয় না। বরং ক্রেতাকে প্রভাবিত করতে ব্যবহার করা হয় জনপ্রিয় তারকাদের। কিন্তু এই তারকা বা নির্মাতারা কি সত্যিই দায়মুক্ত?
Manual5 Ad Code
এ বিষয়ে জনপ্রিয় টেলিভিশন অভিনেতা ও মডেল মনোজ কুমার প্রামাণিক এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘মডেলদের আসলে এ বিষয়ে তেমন কিছু করার নেই। কারণ, বিজ্ঞাপনের গল্প ও নির্মাণপ্রক্রিয়ায় একজন মডেলের নির্ধারিত সংলাপ বলা ও চরিত্রে অভিনয় ছাড়া আর কোনো ভূমিকা থাকে না। কোনো পুষ্টিহীন ও ক্ষতিকর খাদ্যপণ্য প্রচারিত হলে সেই দায়বদ্ধতার জায়গাটা মডেল ও নির্মাতার নয়, বরং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের থাকা উচিত।’
একই সুরে কথা বলেন জনপ্রিয় নির্মাতা শিহাব শাহীন। তিনি বলেন, ‘ক্ষতিকারক খাদ্যপণ্যের বিজ্ঞাপন নির্মাণের ক্ষেত্রে মূল দায় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের এবং সরকারকে তা মনিটরিং করতে হবে। নির্মাতা ও মডেলদের এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম দায় থাকতে পারে, তবে তা খুব বেশি নয়।’
তবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হকের মতে, সংশ্লিষ্ট উৎপাদনকারী এবং বিজ্ঞাপন নির্মাতা ও মডেলদের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞাপন সংশ্লিষ্টদের অবশ্যই সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকা উচিত। তারা যে পণ্যের প্রচার করছেন, তার স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের ওপর বিজ্ঞাপনের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যপণ্যের প্রচারে তাদের ভূমিকা পুনর্বিবেচনা করা উচিত।’
দায়বদ্ধতা ও আইনের অসম্পূর্ণতা
নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ (ধারা ৪১ ও ৪২) ও নিরাপদ খাদ্য (বিজ্ঞাপন ও দাবি) বিশেষ প্রবিধানমালা, ২০২৫ অনুযায়ীÑ কোনো খাদ্যের গুণাগুণ নিয়ে অসত্য বা বিভ্রান্তিকর স্বাস্থ্যগত সুবিধা দাবি করলে ২ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও ২ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
তবে বিদ্যমান এই আইনকে অপর্যাপ্ত বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা। তিনি বলেন, ‘খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইনটি একটি অসম্পূর্ণ আইন। নতুন করে একটি পূর্ণাঙ্গ ও আন্তর্জাতিক মানের আইন করতে হবে। তা না হলে ১৮ কোটি মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে না।’
বিশ্বের অনেক দেশেই অস্বাস্থ্যকর ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন রয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে। যুক্তরাজ্যে চর্বি, লবণ ও চিনিযুক্ত অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিজ্ঞাপন ভোর পাঁচটা থেকে রাত ৯টার মধ্যে টেলিভিশন বা অনলাইনে প্রচার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শিশুদের সুরক্ষায় সেখানে জাঙ্ক ফুডের ‘একটি কিনলে একটি ফ্রি’ অফারও বন্ধ করা হয়েছে।
সুইডেন ও নরওয়েতে ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের লক্ষ্য করে যেকোনো ধরনের খাদ্যপণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার আইনত দণ্ডনীয়। লাতিন আমেরিকার দেশ চিলিতে নিয়ম আরও কড়া; সেখানে অস্বাস্থ্যকর খাবারের মোড়কে স্পষ্ট কালো রঙের সতর্কবার্তা দেওয়া বাধ্যতামূলক এবং এসব পণ্যের বিজ্ঞাপনে শিশুদের আকৃষ্ট করতে কোনো কার্টুন চরিত্র বা খেলনা ব্যবহার করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ।
কিন্তু বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করলে ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, ‘বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণের অর্থ উৎপাদন বা ব্যবসা বন্ধ করা নয়; বরং ভোক্তাকে সঠিক তথ্য দেওয়া ও বিভ্রান্তিকর প্রচার বন্ধ করা। আইনে এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, পণ্যের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে কোনো ভিত্তিহীন দাবি করা যাবে না এবং ক্ষতিকর উপাদানের তথ্য গোপন করা যাবে না।’
নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
জনস্বাস্থ্যের এত বড় ক্ষতির পরও উৎপাদকদের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বড় কোনো নজির নেই। তবে, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইন ও নীতি বিভাগের সদস্য (যুগ্ম সচিব) আনোয়ারুল ইসলাম সরকার এই প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেন, ‘বিজ্ঞাপনে অতিরঞ্জিত ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তথ্য প্রচার করা হলে আমাদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে চিঠি দিয়ে তা সংশোধন ও প্রত্যাহার করতে বলা হয়। তারা এসব সংশোধন করে বলে এখনও কোনো মামলা করার প্রয়োজন হয়নি। পরীক্ষাগারে খাদ্যে অনিরাপদ উপাদান পাওয়া গেলে বাজার থেকে তা প্রত্যাহার করতে বলা হয় এবং বিজ্ঞাপনও বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।’
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মো. কাওসারুল ইসলাম সিকদার বলেন, ‘সারা দেশের বিদ্যালয়গুলোতে অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়াতে আমরা নিয়মিত কাজ করছি। এর মধ্য দিয়ে বিজ্ঞাপনের অসত্য ফাঁদ থেকে শিশু-কিশোরদের দূরে রাখা যাবে।’
Manual8 Ad Code
বিজ্ঞাপনের চটকদার ফাঁদ থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে শুধু কাগুজে আইন যথেষ্ট নয়; উন্নত বিশ্বের মতো কঠোর প্রয়োগ এবং উৎপাদক থেকে মডেল পর্যন্ত সবার আইনি ও নৈতিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।