কার্তিকের আধেক দিন শেষ। হেমন্তের এ সময় শীতের আগমনী বার্তা থাকার কথা। ভোরে হালকা কুয়াশা, রাতের তাপমাত্রা কমতে শুরু করা ও বাতাসে শুষ্কতার অনুভূতিÑ স্বাভাবিক হিসাব এ রকম। কিন্তু বাস্তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি, মেঘলা আকাশ, ভ্যাপসা গরম ও তাপমাত্রার ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। কোথাও বৃষ্টির কারণে দিনের তাপমাত্রা কমছে, আবার রোদ উঠলে বাড়ছে গরম। ঋতু পরিবর্তনের পরিচিত ছকের সঙ্গে আবহাওয়ার এই আচরণের মিল কমে আসছে।
Manual6 Ad Code
আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী এ পরিস্থিতির পেছনে একক কোনো কারণ নেই। মৌসুমি বায়ুর প্রত্যাবর্তনের সময় ও গতিপথ, বঙ্গোপসাগরের বায়ুচাপ, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ, এল নিনো ও ভারত মহাসাগরীয় দ্বিমেরু পরিস্থিতির মতো প্রাকৃতিক নিয়ামক কাজ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। ফলে আবহাওয়ার স্বাভাবিক পরিবর্তনকালেও বৃষ্টি, তাপমাত্রা ও বাতাসের আচরণে অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের (বিএমডি) জলবায়ু বিষয়ক নির্দেশিকায় অক্টোবর-নভেম্বরকে বর্ষা ও শীতের মধ্যবর্তী পরিবর্তনকাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় বৃষ্টিপাতের হার কমে যায়, তাপমাত্রা হ্রাস পেতে শুরু করে ও শুষ্ক মৌসুমের সূচনা হয়। তবে বঙ্গোপসাগরে এ সময় ঘূর্ণিঝড় ও নিম্নচাপ সৃষ্টির প্রবণতা থাকে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর শনিবার দেশের আট বিভাগেই বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টির পূর্বাভাস দেয়। দক্ষিণ আন্দামান সাগর ও সংলগ্ন এলাকায় সৃষ্ট লঘুচাপটি সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের কাছাকাছি অবস্থান করছিল।
বৈশ্বিক আবহাওয়ায় বড় পরিবর্তনের আভাস
Manual8 Ad Code
এবারের আবহাওয়ার অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি। প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের মধ্য ও পূর্বাংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে গেলে এল নিনো তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসনের (এনওএএ) জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্রের প্রতিবেদনে জানানো হয়, এল নিনো ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত শক্তিশালী থেকে অতি শক্তিশালী এল নিনো থাকার সম্ভাবনা ৮৩ শতাংশের বেশি।
Manual7 Ad Code
আইওডির প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের আবহাওয়ার ওপর ভারত মহাসাগরের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভারত মহাসাগরীয় দ্বিমেরু পরিস্থিতি বা আইওডি বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। ভারত মহাসাগরের পশ্চিম ও পূর্ব অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পার্থক্যের মাধ্যমে এ পরিস্থিতি নির্ধারিত হয়। ডব্লিউএমওর অক্টোবরের পূর্বাভাসে ইতিবাচক আইওডি পরিস্থিতি সক্রিয় থাকার কথা বলা হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে আইওডির তাপমাত্রাগত বিচ্যুতি প্রায় ০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হতে পারে।
তাপমাত্রা ও বৃষ্টির অস্বাভাবিকতা
কয়েক দশকের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে আবহাওয়ার চরম পরিস্থিতির পরিবর্তন স্পষ্ট হয়। ওয়েদার অ্যান্ড ক্লাইমেট এক্সট্রিমসের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের চরম পরিস্থিতি বিষয়ক একটি গবেষণায় ১৯৮১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৪০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটিতে দেশের ০ দশমিক ০৫ ডিগ্রি বাই ০ দশমিক ০৫ ডিগ্রি উচ্চ রেজল্যুশনের গ্রিডভিত্তিক দৈনিক তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে। দেখা গেছে, চার দশকে বাংলাদেশের দৈনিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রতি দশকে গড়ে ০ দশমিক ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ০ দশমিক ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। উষ্ণ দিন ও উষ্ণ রাতের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতাও পাওয়া গেছে। কোনো কোনো অঞ্চলে প্রতি দশকে উষ্ণ দিন ও রাতের সংখ্যা সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৭৫ দিন পর্যন্ত বেড়েছে। একই সময়ে শীতল দিন ও রাতের সংখ্যা কমেছে। বিশেষ করে দেশের পূর্বাঞ্চলে উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রবণতা বেশি পাওয়া গেছে। অপর এক গবেষণায় ১৯৭৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশের ২৬টি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশের অধিকাংশ পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে বৃষ্টিপাতের নিম্নমুখী প্রবণতা রয়েছে। মধ্যাঞ্চলে বৃষ্টিপাত হ্রাসের প্রবণতা উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে বার্ষিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা পাওয়া গেছে।
সামনে শীত কেমন হবে
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ২৩ অক্টোবরের পূর্বাভাস অনুযায়ী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা আরও কমতে পারে। উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় এরই মধ্যে তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমেছে। তেঁতুলিয়া, রাজারহাট ও দিনাজপুরে শীতের প্রাথমিক অনুভূতি তৈরি হয়েছে।
আবহাওয়াবিদ তারিফুল নেওয়াজ কবির বলেছেন, চলমান আবহাওয়া ব্যবস্থা সরে গেলে তাপমাত্রা আরও কমতে পারে এবং নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ শীতের অনুভূতি বাড়তে পারে। তবে উত্তরাঞ্চলে শীতের অনুভূতি আগে তৈরি হলেও রাজধানী ও দক্ষিণাঞ্চলে তা দেরিতে আসতে পারে। ঢাকায় প্রকৃত শীতের অনুভূতি পেতে ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
Manual1 Ad Code
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করছে ২০২৭ সালের আবহাওয়া পরিস্থিতি। পূর্বাভাস অনুযায়ী শক্তিশালী এল নিনো ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ডব্লিউএমওর পূর্বাভাসেও বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন অঞ্চলে খরা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ার কথা বলা হয়েছে।