ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ কয়েকটি দাবিতে রাজধানীর মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় আবারও সড়কে নেমেছেন পোশাকশ্রমিকরা। রোববার (১ নভেম্বর) সকাল থেকে বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
কোথাও পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দাবি, মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের সাধারণ আন্দোলনের আড়ালে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ জন নেতাকর্মী পেছন থেকে উসকানি দিচ্ছিলেন।
তাদের পরিকল্পনা ছিল যানবাহনে আগুন দেওয়া ও ভাঙচুরসহ নাশকতার মাধ্যমে আন্দোলনকে সহিংসতায় রূপ দেওয়া। সময়মতো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সহিংসতা আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারত বলে মনে করছে সংস্থাটি।
Manual4 Ad Code
এ ঘটনায় মিরপুরে অভিযান চালিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা ইলিয়াস মোল্লার ভাগনে আলিফ মোল্লাসহ নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১১ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। গ্রেপ্তাররা—মো. কামাল গাজী (৩২), মো. ওলিউল্লাহ অনিক (২০), আলিফ হোসেন ইমন (২৬), মো. নাহিদ হাসান (১৮), আরিফ আকন্দ (২৯), জায়েদ করিম রিয়াজ (২৪), মো. রমজান সরকার (১৮), মোয়াজ্জেম শাহরিয়া ওরফে নিয়াজ, জুবায়েদ ইসলাম জিসান (২২) এবং মো. মাহিম মোল্লা (১৯)।
Manual6 Ad Code
ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ রাকিব খান বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা বিভিন্ন জেলা থেকে আসা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী। তাদের মধ্যে বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধার বাসিন্দা রয়েছেন। মিরপুর-১২ নম্বরের মোল্লা মার্কেট ও আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি বলেন, পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ জন নেতাকর্মী পেছন থেকে উসকানি দিচ্ছিলেন। যানবাহনে আগুন দেওয়া ও নাশকতার পরিকল্পনা নিয়ে তারা মাঠে সক্রিয় ছিলেন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের ফুটেজে গেরিলা-৭১, ধানমন্ডি ৩২-সহ বিভিন্ন স্থানের নানা কার্যক্রমের চিত্র পাওয়া গেছে বলেও জানিয়েছে ডিবি।
মিরপুরে সহিংসতায় ২০ জন হেফাজতে
এদিকে, সন্ধ্যায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার বলেন, পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার পরপরই ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া মিরপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতার ঘটনায় এ পর্যন্ত মোট ২০ জনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কর্মীরা পোশাকশ্রমিকদের স্বাভাবিক আন্দোলনের সঙ্গে মিশে গিয়ে সহিংসতা চালাচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
Manual8 Ad Code
মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভ
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করা ও ছাঁটাই বন্ধের দাবিতে মিরপুরের ১০, ১১ ও ১২ নম্বর সেকশনসহ আশপাশের এলাকায় বিক্ষোভ করেন পোশাকশ্রমিকরা। একই দাবিতে সাভারের আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেও সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করেন তারা।
সকালের দিকে পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকলেও দুপুরের পর সাভারের বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন কারখানার সামনে ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি বিজিবিকেও মাঠে নামানো হয়।
পরিস্থিতি বিবেচনায় সাভারের অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানান আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া।
অন্যদিকে, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে সাভার ও গাজীপুরের বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে বেশ কিছু কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন
পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে।
রোববার (১ নভেম্বর) শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী নতুন বেতন নির্ধারণে এই বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন। সিনিয়র জেলা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে চেয়ারম্যান করে গঠিত বোর্ডটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে।
এর আগে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে বোর্ডের সভা করে শ্রমিকদের মজুরির বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর আশ্বাস দেয়। একই সঙ্গে শ্রমিকদের সড়ক ছেড়ে কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
তবে মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা এবং প্রধানমন্ত্রীর কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বানের পরও বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। ফলে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনের আড়ালে সহিংসতা ও নাশকতায় কারা জড়িত, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।