এইচএসসি’র পুনঃপরীক্ষা: উপজেলা পর্যায়ে পরীক্ষা কেন্দ্র
এইচএসসি’র পুনঃপরীক্ষা: উপজেলা পর্যায়ে পরীক্ষা কেন্দ্র
editor
প্রকাশিত নভেম্বর ১, ২০২৬, ০২:১৯ অপরাহ্ণ
Manual3 Ad Code
স্টাফ রিপোর্টার:
Manual3 Ad Code
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য পুনঃপরীক্ষা আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আগামী ডিসেম্বর মাসে এ পরীক্ষা নেওয়া এবং একই মাসে ফলাফল প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।
আর পরীক্ষার্থী কম থাকায় উপজেলা পর্যায়ে একটি কেন্দ্রে পরীক্ষা হতে পারে। আগামী দুই দিনের মধ্যে পরীক্ষার রুটিন ও ফরম পূরণের সময়সূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা।
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান পুনঃপরীক্ষার বিস্তারিত নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দ্রুত পরীক্ষা নিয়ে ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে তাদের চলমান শিক্ষাবর্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
এ কারণে পুনঃপরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, পরীক্ষার ফি শিক্ষার্থীদের জন্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করা হবে।
একটি পরীক্ষা কেন্দ্র পরিচালনার জন্য ন্যূনতম যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, মূলত সেই পরিমাণ ফি নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত কোনো চার্জ নেওয়ার পরিকল্পনা নেই বলেও জানান তিনি।
উপজেলা পর্যায়ে হতে পারে একটি করে পরীক্ষা কেন্দ্র
পুনঃপরীক্ষা আয়োজনের ক্ষেত্রে কেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান জানান, শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় উপজেলা পর্যায়ে একটি করে পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশে প্রায় ৫০০টি উপজেলায় কেন্দ্র স্থাপন করা হলে পরীক্ষার্থীদের সহজেই আসনবিন্যাস করা সম্ভব হবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কোনো একটি বিষয়ে সর্বোচ্চ দুই থেকে আড়াই লাখ শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিলেও উপজেলা পর্যায়ে ভাগ করলে প্রতি কেন্দ্রে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকবে।
তবে কোন বিষয়ে কতজন পরীক্ষার্থী থাকবেন, তার ওপর ভিত্তি করে কেন্দ্রের সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে। বিশেষ করে ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় এসব বিষয়ের জন্য কেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।
সর্বোচ্চ চার বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ
পুনঃপরীক্ষায় অংশগ্রহণের বিষয়সংখ্যা নিয়েও কথা বলেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একজন শিক্ষার্থী সর্বনিম্ন তিনটি এবং সর্বোচ্চ চারটি বিষয়ে পুনঃপরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন।
তবে কোনো শিক্ষার্থী একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হলে তিনি একটি বিষয়েই পরীক্ষা দিতে পারবেন। আবার কেউ একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হলে সেই অনুযায়ী তাকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে বিষয় ও পত্রসংক্রান্ত বিস্তারিত নিয়ম চূড়ান্ত নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইংরেজি ও আইসিটিতে অকৃতকার্যের সংখ্যা বেশি
অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি বলে সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। এক বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া প্রায় ২ লাখ ৯৮ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে আনুমানিক ৮০ শতাংশের অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ের ভূমিকা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ফলে এসব বিষয়ে পুনঃপরীক্ষার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে সামগ্রিক পাসের হারও বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ডিসেম্বরেই পরীক্ষা ও ফল প্রকাশের পরিকল্পনা
পুনঃপরীক্ষার ক্ষেত্রে সময়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান জানান, ডিসেম্বর মাসেই পরীক্ষা গ্রহণ এবং ফলাফল প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে একই সময়ে বৃত্তি পরীক্ষা থাকায় সময়সূচি নির্ধারণে কিছুটা সমন্বয় করতে হতে পারে।
তিনি আরও জানান, বৃত্তি পরীক্ষার কেন্দ্রের সঙ্গে পুনঃপরীক্ষার কেন্দ্রের সাংঘর্ষিক হওয়ার আশঙ্কা নেই। তাই দুটি পরীক্ষা আয়োজনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
শুধু মূল্যায়ন নয়, শিক্ষার মান বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি সাক্ষাৎকারে পরীক্ষার ফলাফল ও শিক্ষার মান নিয়ে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলেন, শুধু মূল্যায়ন পদ্ধতির মান উন্নত করলেই হবে না, একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের শেখার মানও বাড়াতে হবে।
শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি, পাঠদানের মান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তার মতে, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও শিক্ষাদানের মানের মধ্যে সমন্বয় না হলে শিক্ষার্থীদের ফলাফলের বৈষম্য দূর করা কঠিন হবে।
সব মিলিয়ে, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত পুনঃপরীক্ষার আয়োজন এবং ডিসেম্বরের মধ্যেই ফল প্রকাশের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আগামী দুই দিনের মধ্যে পরীক্ষার রুটিন ও ফরম পূরণের সময়সূচি ঘোষণার কথা থাকায় এখন সেই আনুষ্ঠানিক নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।
পুনঃপরীক্ষার সুযোগ, সিদ্ধান্তকে স্বাগত
Manual7 Ad Code
এইচএসসি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এক মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন একজন শিক্ষাবিদ। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরীর বলেন, সময়মতো এ সিদ্ধান্ত নেওয়া ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি যারা পরবর্তী পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হতে পারবে না, তাদের জন্য বিকল্প শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
Manual3 Ad Code
তিনি বলেন, দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দ্রুত পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এসব শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখা উচিত নয়। তাদের যেন দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে না হয় এবং শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে না পড়ে, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আগেরবার (এসএসসি) সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময়ক্ষেপণ হয়েছিল। সচিবালয়ে এ নিয়ে আলোচনা ও উদ্যোগ থাকলেও যথাসময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে এবার অন্তত সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।
তবে পুনঃপরীক্ষাই অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য একমাত্র সমাধান নয় বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, পুনঃপরীক্ষার পরও যারা উত্তীর্ণ হতে পারবে না, তাদের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষা, বৃত্তিমূলক শিক্ষা, স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ এবং ভাষা শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। তিনি বলেন, তিন মাস বা ছয় মাসের বিভিন্ন কর্মমুখী কোর্স চালু করে এসব শিক্ষার্থীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। বিশেষ করে চীনা ও জাপানি ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি উন্নত বিশ্বে চাহিদাসম্পন্ন কেয়ারগিভিং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এসব প্রশিক্ষণে বিনামূল্যে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানান রাশেদা কে চৌধুরী। তার মতে, পরীক্ষায় খারাপ ফলের কারণে অনেক শিক্ষার্থী মানসিক চাপ ও হতাশার মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় তাদের শুধু অভিভাবকদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু অকৃতকার্য হিসেবে চিহ্নিত না করে তাদের দক্ষ ও কর্মক্ষম জনশক্তিতে পরিণত করার উদ্যোগ নিতে হবে। পুনঃপরীক্ষার সুযোগের পাশাপাশি বিকল্প শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করা গেলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা সম্ভব হবে।
অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দ্রুত পুনঃপরীক্ষা নেওয়ার দাবি
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন রক্ষায় এক মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে শিক্ষার্থী স্বার্থরক্ষাকারী সংগঠন অভিভাবক ঐক্য ফোরাম। সংগঠনটির সভাপতি মো. জিয়াউল কবির দুলু ও সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম মিয়া এক যৌথ বিবৃতিতে এ দাবি জানান।
বিবৃতিতে নেতৃদ্বয় বলেন, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে দুই বছর পড়াশোনা করার পর কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে তাকে নতুন করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য আর্থিক ব্যয় বহন করতে হয়। একই সঙ্গে মানসিক চাপের কারণে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ফলে তাদের একটি অংশ নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
তারা বলেন, কোনো অভিভাবকই চান না তাঁর সন্তান পরীক্ষায় অকৃতকার্য হোক। তাই অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও শিক্ষাজীবনের কথা বিবেচনা করে দ্রুত পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করা জরুরি। এক মাসের মধ্যে এই পরীক্ষা নিতে হবে।