প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৩১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৪ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

এই যুদ্ধ হউক শেষ যুদ্ধ

editor
প্রকাশিত এপ্রিল ১১, ২০২৬, ০৫:১৮ পূর্বাহ্ণ
এই যুদ্ধ হউক শেষ যুদ্ধ

Manual1 Ad Code

সম্পাদকীয়:
বিশ্বসভ্যতা অতীতে বিভিন্ন সময় অস্থির সন্ধিক্ষণে উপনীত হইয়াছিল। সেই ধরনের সন্ধিক্ষণ এখন পুনরায় আসিয়াছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি আপাতদৃষ্টিতে শান্তির এক ক্ষুদ্র দ্বার উন্মুক্ত করিয়াছে বটে, কিন্তু সেই দ্বারের অন্তরালে যে অস্থিরতা ও অবিশ্বাস সঞ্চিত রহিয়াছে, তাহা উপেক্ষা করিবার উপায় নাই। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরপরই আমরা লক্ষ করিতেছি, লেবাননে অব্যাহত হামলা এই সমগ্র প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করিয়া তুলিয়াছে। ইরানের পক্ষ হইতে স্পষ্ট ভাষায় বলা হইয়াছে-যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ অথবা যুদ্ধবিরতি-একটি বাছিয়া লইতেই হইবে। একই সঙ্গে যুদ্ধ চালাইয়া যাওয়া এবং শান্তির কথা বলা-এই দ্বৈত অবস্থান কেবল কূটনৈতিক অসংগতিই নহে, বরং এক গভীর নৈতিক সংকটের প্রতিফলন।

Manual5 Ad Code

এইখানেই মূল সমস্যা-যুদ্ধবিরতির ভাষা। আলোচনার ভাষা যেইখানে নম্রতা, সংযম ও পারস্পরিক সম্মানের উপর প্রতিষ্ঠিত হইবার কথা, সেইখানে আজ আমরা প্রত্যক্ষ করিতেছি আক্রমণাত্মক শব্দচয়ন, প্রতিপক্ষকে হেয় প্রতিপন্ন করিবার প্রবণতা, এবং একধরনের মানসিক যুদ্ধের অব্যাহত রূপ। এই ভাষা কোনো স্থায়ী শান্তির ভিত্তি নির্মাণ করিতে পারে না। বরং, ইহা অবিশ্বাসের প্রাচীরকে আরো সুদৃঢ় করিয়া তোলে। তথাপি, এই ক্ষণস্থায়ী বিরতিকেও আমরা একেবারে অস্বীকার করিতে পারি না। কারণ, যুদ্ধের উত্তপ্ত বাস্তবতার মধ্যে দুই পক্ষ আলোচনায় বসিবার যে ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছে- ইহাই এক মূল্যবান আশার আলোকরেখা। ইসলামাবাদে সম্ভাব্য আলোচনার আয়োজন এই সত্যকেই নির্দেশ করে যে, সংঘাতের মধ্যেও সংলাপের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন রহিয়াছে-এই সংলাপ কি সত্যই আন্তরিক? নাকি ইহা কেবল কৌশলগত সময়ক্ষেপণ? ইরানের পক্ষ স্পষ্ট করিয়া জানাইয়াছে, তাহারা এমন যুদ্ধবিরতি চাহে না, যাহা প্রতিপক্ষকে পুনরায় আক্রমণের সুযোগ প্রদান করে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ হইতে ‘উন্মুক্ত আলোচনার’ আহ্বান উচ্চারিত হইলেও, বাস্তবতার মাটিতে তাহার প্রতিফলন এখনো সুস্পষ্ট নহে।

Manual3 Ad Code

এই সমগ্র প্রেক্ষাপটে বিশ্ব অর্থনীতি এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মধ্যে নিমজ্জিত হইয়াছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত থমকাইয়া পড়িয়াছে, শত শত তেলবাহী জাহাজ আটকা পড়িয়া আছে। ইহা কেবল একটি আঞ্চলিক সংকট নহে-ইহা সমগ্র বিশ্বকে একপ্রকার জিম্মি করিয়া ফেলিয়াছে। জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হইলে, তাহার অভিঘাত খাদ্য, শিল্প, পরিবহন-সমস্ত ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হইবে। অর্থাৎ, এই যুদ্ধের প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা অতিক্রম করিয়া প্রতিটি মানুষের জীবনে প্রবেশ করিতেছে। ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিলে আমরা আরো গভীর এক সত্য উপলব্ধি করিতে পারি। ভিয়েতনাম কিংবা আফগান যুদ্ধ-এই সকল দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কেবল সামরিক ব্যয়ই বৃদ্ধি করে নাই, বরং রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করিয়াছে। শক্তির অহংকার যাহা অর্জন করিতে চাহিয়াছিল, বাস্তবতা তাহাকে বারংবার প্রতিহত করিয়াছে।

এইখানেই ‘ফুলস’ প্যারাডাইস’ তথা বোকার স্বর্গের ধারণাটি প্রাসঙ্গিক হইয়া উঠে। বর্তমান পরাশক্তিগণ যেন এমন এক মায়াজালে আবদ্ধ, যাহাতে তাহারা নিজেদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী বলিয়া কল্পনা করিতেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হইল-বিশ্ব ইতিমধ্যে পরিবর্তিত হইয়াছে। বহুকেন্দ্রিক শক্তির উত্থান, প্রযুক্তির বিস্তার, এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির আন্তর্নির্ভরতা-এই সকল উপাদান একক আধিপত্যের ধারণাকে ক্রমশ দুর্বল করিয়া দিতেছে। আরো এক গভীর নৈতিক প্রশ্ন এইখানে উত্থাপিত হয়। যাহারা অতীতে বহু প্রাচীন সভ্যতার সম্পদ লুট করিয়াছে, তাহারাই আজ সেই সকল অঞ্চলের জনগণকে ‘গরিব’ বলিয়া অভিহিত করে। ইহা কেবল ইতিহাসবিস্মৃতির দৃষ্টান্ত নহে-ইহা একধরনের অযৌক্তিক আত্ম-অহংকার, যাহা সভ্যতার নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

Manual2 Ad Code

এই প্রেক্ষাপটে, আমরা বলিতে চাই-এই যুদ্ধ হউক শেষ যুদ্ধ। কারণ, আধুনিক যুদ্ধ আর কেবল দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না-ইহা সমগ্র বিশ্বব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করিয়া তোলে। মনে রাখিতে হইবে, শক্তির মোহে অন্ধ হইয়া যে সভ্যতা আত্মবিনাশের পথে অগ্রসর হয়, তাহার পতন অবশ্যম্ভাবী।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০৩১

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code