ভূমি আইন, জরিপ, খতিয়ান ও রেকর্ডের জটিলতায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দীর্ঘদিনের। একই জমি নিয়ে পুরনো খতিয়ানে এক তথ্য, দলিলে আরেক তথ্য এবং মাঠ জরিপে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। মালিকানা, দখল, নামজারি, খতিয়ান সংশোধন কিংবা জমির শ্রেণি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে ভূমি অফিস থেকে আদালত পর্যন্ত ছুটতে হয়। এই বাস্তবতায় ভূমি প্রশাসনে দক্ষ কর্মকর্তা তৈরির লক্ষ্যে ‘ভূমি জরিপ ও প্রশাসন একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর উপকণ্ঠে একটি পরিত্যক্ত জুট মিল ভাড়া নিয়ে গত তিন বছর ধরে পাঁচটি ক্যাডারের— জুডিসিয়াল সার্ভিস, প্রশাসন, পুলিশ, বন ও রেলওয়ে-কর্মকর্তাদের সার্ভে ও সেটেলমেন্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে একাডেমি প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক কাজও শুরু হয়েছে।
Manual5 Ad Code
পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজধানীর নীলক্ষেতে থাকা ভূমি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। প্রস্তাবিত একাডেমির মূল লক্ষ্য মাঠ প্রশাসনে দায়িত্ব পালনের শুরুতেই সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ডদের ভূমি আইন, জরিপ, খতিয়ান, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিষয়ে সমন্বিত প্রশিক্ষণ দেওয়া। ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
Manual7 Ad Code
Manual3 Ad Code
একজন এসি ল্যান্ডকে দায়িত্ব পালনের সময় নামজারি, খতিয়ান, খাসজমি, ভূমি উন্নয়ন কর, জমির শ্রেণি, সরকারি জমি রক্ষা, দখল ও ভূমি অধিগ্রহণসহ নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা চাকরির শুরুতে সাধারণ প্রশাসন বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেলেও ভূমি আইন ও জরিপের খুঁটিনাটি বিষয়ে সব সময় সমানভাবে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন না। ফলে মাঠপর্যায়ে জটিল ভূমি বিষয়ে তাকে সার্ভেয়ার, কানুনগো বা সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করতে হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্মকর্তার নিজের পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকলে কোনো প্রতিবেদন বা নথির অসঙ্গতি শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। পরস্পরবিরোধী তথ্যের মধ্যে কোনটি সঠিক, সেটিও নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রস্তাবিত একাডেমির বড় ভূমিকা হতে পারে এখানেই। সার্ভেয়ার বা কানুনগোর প্রয়োজন থাকবে, তবে তাদের দেওয়া তথ্য ও প্রতিবেদন যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো জ্ঞান এসি ল্যান্ডেরও থাকা প্রয়োজন। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মান বাড়বে এবং ভুলের ঝুঁকি কমবে।
আইন জানার পাশাপাশি জরিপও জানতে হবে
একটি জমির মালিকানা বুঝতে অনেক সময় একই সঙ্গে দলিল, খতিয়ান, নামজারি, মৌজা নকশা, দখল ও মাঠপর্যায়ের তথ্য পর্যালোচনা করতে হয়। তাই আইন ও জরিপকে আলাদা না দেখে সমন্বিতভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া বেশি কার্যকর হতে পারে। প্রশিক্ষণে বাস্তব জমির ঘটনা সামনে রেখে নথি পড়া, পুরনো ও নতুন খতিয়ানের সম্পর্ক নির্ণয়, মৌজা নকশা বোঝা এবং মাঠপর্যায়ের তথ্যের সঙ্গে রেকর্ড মিলিয়ে দেখার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। একটি জমির দলিল, খতিয়ান, নকশা, নামজারি আবেদন ও মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন দিয়ে প্রশিক্ষণার্থীকে সিদ্ধান্ত নিতে দিলে শুধু আইন মুখস্থ নয়, আইন প্রয়োগের দক্ষতাও তৈরি হবে।
মাঠেই হবে বড় পরীক্ষা
প্রশিক্ষণ শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ থাকলে এর সুফল সীমিত হতে পারে। তাই একাডেমির সঙ্গে প্রশিক্ষণ মাঠ বা প্রদর্শনী জরিপ এলাকা রাখা যেতে পারে। সেখানে প্রশিক্ষণার্থীরা হাতে-কলমে জমির সীমানা নির্ধারণ, নকশা পড়া, পুরনো জরিপের সঙ্গে নতুন জরিপের তথ্য মিলিয়ে দেখা এবং বাস্তব দখল ও রেকর্ডের পার্থক্য শনাক্ত করার সুযোগ পাবেন। উদ্দেশ্য হবে একজন এসি ল্যান্ডকে সার্ভেয়ারের কাজ শেখানো নয়; বরং সার্ভেয়ারের কারিগরি প্রতিবেদন বোঝা, যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে যথাযথ প্রশ্ন করার সক্ষমতা তৈরি করা।
Manual1 Ad Code
প্রযুক্তি-নির্ভর ভূমি ব্যবস্থাপনা
ভূমি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড, অনলাইনে নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর, খতিয়ান ও নকশা সংগ্রহসহ বিভিন্ন সেবা এখন অনলাইন-ভিত্তিক। ফলে ভবিষ্যতের ভূমি কর্মকর্তাকে কাগজের নথির পাশাপাশি ডিজিটাল তথ্যও বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রশিক্ষণে কম্পিউটার-ভিত্তিক ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থাপনা, ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা, বৈশ্বিক অবস্থান নির্ণয় প্রযুক্তি, ডিজিটাল নকশা ও উপগ্রহ-চিত্র ব্যবহারের প্রাথমিক ধারণা থাকা জরুরি। এতে মাঠপর্যায়ে তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ বাড়বে এবং ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি কমবে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
ভূমি প্রশাসন এখন শুধু ভূমি অফিসের দাপ্তরিক কাজ নয়। বিভিন্ন দেশে ভূমির মালিকানা, নিবন্ধন, জরিপ, ভূমি ব্যবহার, নকশা, মূল্যায়ন ও ভূমি তথ্যব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে শেখানো হয়। অস্ট্রেলিয়ায় ভূমি ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত উচ্চশিক্ষায় ভূমির সীমানা, অধিকার, নিবন্ধন ও জরিপকে একই কাঠামোর মধ্যে পড়ানো হয়। রুয়ান্ডাতেও ভূমি নিবন্ধন, মালিকানা, মূল্যায়ন, ভূমি তথ্যব্যবস্থা, মানচিত্র, জরিপ ও ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের প্রস্তাবিত একাডেমিও আধুনিক ও সমন্বিত ভূমি প্রশাসনের একটি কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
প্রশিক্ষণের পাশাপাশি গবেষণা
একাডেমিটি শুধু প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান না হয়ে ভূমি আইন ও প্রশাসন-বিষয়ক গবেষণার কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে। দেশের কোন অঞ্চলে কী ধরনের ভূমি বিরোধ বেশি, কোন আইন প্রয়োগে মাঠপর্যায়ে সমস্যা হচ্ছে এবং নদীভাঙন ও চর জাগার পর কীভাবে রেকর্ড ব্যবস্থাপনা করা যায়—এসব বিষয়ে গবেষণা প্রয়োজন।
জানতে চাইলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ বলেন, ভূমি ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের ভূমি আইন ও বিধিবিধান সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা জরুরি। বিশেষ করে এসি ল্যান্ডদের মাঠপর্যায়ে ভূমি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে অনেক সময় সার্ভেয়ার ও কানুনগোদের মতামতের ওপর নির্ভর করতে হয়। যথাযথ প্রশিক্ষণ থাকলে কর্মকর্তারা নিজেরাই নথি, জরিপ ও আইনি বিষয় বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে বিভিন্ন দপ্তরের প্রকৌশলীদের ভূমি অধিগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়। তাদের ভূমি-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় সময় ও সরকারি অর্থের অপচয় কমানো সম্ভব হবে। এতে উন্নয়ন প্রকল্পও দ্রুত বাস্তবায়ন করা যাবে।
সালেহ আহমেদ আরও বলেন, প্রতিবেশীর জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ হলে ভূমি অফিসের সরকারি সার্ভেয়ারদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি মাপার নিয়ম নেই। এ ক্ষেত্রে জনগণকে ভূমিসেবা দিতে প্রশিক্ষিত সার্ভেয়ার তৈরি করা জরুরি। তাই সার্ভে একাডেমি প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।
তার মতে, প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা ও সার্ভেয়ার তৈরি হলে ভূমি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের মান বাড়বে এবং ভুলের আশঙ্কা কমবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ভূমিসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তিও কমবে। স্বচ্ছ, দক্ষ, আধুনিক ও জনবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।