প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২রা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২২শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

জ্বালানি সংকট বাড়িয়ে দিয়েছে মাসের সংসার খরচ

editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬, ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ
জ্বালানি সংকট বাড়িয়ে দিয়েছে মাসের সংসার খরচ

Manual6 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজিচালিত পরিবহন, বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাসের কম চাপের কারণে সিএনজি চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। অন্যদিকে বাসাবাড়িতে রান্নার জন্য গ্যাস না পেয়ে অনেকে সিলিন্ডার ও বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভর করছেন। এতে মাসের সংসার খরচের সঙ্গে যোগ হয়েছে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়।

রাজধানীর হাজিপাড়া পেট্রোলপাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সিএনজিচালক হালিম উদ্দিন বলেন, ‘একবার গ্যাস নিতে আসলেই দুই থেকে তিন ঘণ্টা চলে যায়। আগে যেখানে একবার গ্যাস নিতে আসলে ৩৫০ টাকার গ্যাস ঢুকতো, এখন সেখানে ১৩০ টাকার বেশি নেওয়া যায় না। কারণ গ্যাসের চাপ কম। এই গ্যাস দিয়ে ৪ ঘণ্টার বেশি সিএনজি চালানো যায় না। আবার গ্যাস নিতে আসলে ২ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়। অর্থাৎ কেউ ৮ ঘণ্টা সিএনজি চালাতে হলে তাকে ৪ ঘণ্টা গ্যাসের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এদিকে আয় হোক আর না হোক মালিকের জমা তো দিতেই হয়।’

গ্যাসচালিত পরিবহনে এক চাপে যতটা গ্যাস নেওয়া যায়, তাই নিতে হয়। স্বাভাবিকভাবে গ্যাসের চাপ বেশি থাকলে সিলিন্ডারে বেশি গ্যাস ঢোকে, আর চাপ কম থাকলে কম গ্যাস নেওয়া যায়। একবার সিএনজিতে গ্যাস প্রবেশ করালে নির্দিষ্ট পরিমাণ শেষ না হলে নতুন করে গ্যাস নেওয়াও যায় না।

অন্যদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার আবাসিক বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কোনও কোনও এলাকায় একেবারেই গ্যাস থাকে না। আবার কিছু এলাকায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে টিমটিম করে চুলা জ্বলে। এতে গরম পানিও করা যায় না, রান্না তো দূরের কথা।

ফলে সকালে অফিসে যাওয়ার আগে রান্না করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন মানুষ। কেউ ভোরে উঠে রান্না করছেন, কেউ মধ্যরাতে রান্না করছেন। আবার কেউ সিলিন্ডার বা বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভর করছেন। এতে বাড়তি খরচের পাশাপাশি সময়ও নষ্ট হচ্ছে।

মিরপুরের বাসিন্দা রাসনা চৌধুরী বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরেই সকালে উঠে দেখি চুলায় গ্যাস নেই। দুপুরের আগে চুলা জ্বালানো যায় না। আগে সকালে রান্না করে রেখে বের হতাম। আর এখন অফিস থেকে এসে ক্লান্ত হয়েই রান্না করতে হয়। এই রান্না শুধু সেদিনের না, পরের দিনের দুপুরের রান্নাটাও সেরে ফেলতে হয়। দুপুরে যারা বাসায় থাকে তারা ওভেনে গরম করে সেই তরকারি খায়, আর ভাত রান্না করে রাইস কুকারে। সকালে নাস্তা করতে হলে হয় আগের দিনের বাসি খাবার ওভেনে গরম করি, না হলে বাইরে থেকে কিনে আনি। কারণ বিদ্যুতের চুলায় রান্না করতে সময় লাগে। সকালে এত সময় থাকে না। প্রতিদিন এভাবে চলা সম্ভব নয়।’

খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা আনজুম সুলতানা বলেন, ‘গ্যাসের চাপ কখন থাকবে, কখন থাকবে না, তার ঠিক নেই। সকাল ১০টার দিকে রান্না বসানোর পর হঠাৎ গ্যাসের চাপ কমে যায়। আধা রান্না করে পরে সেটা আবার সিলিন্ডার চুলায় নিয়ে যেতে হয়। সিলিন্ডারই যদি ব্যবহার করতে হয়, তাহলে আমরা গ্যাস বিল দেবো কেন? মাসের বাজারের খরচের সঙ্গে এখন গ্যাসের বাড়তি খরচও যোগ হয়েছে।’

শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতেও সংকট

Manual2 Ad Code

শুধু সিএনজি বা বাসাবাড়ি নয়, গ্যাস সংকটে চাপে পড়েছে শিল্প খাতও। চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও মেশিন বন্ধ রেখে শ্রমিকদের বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।

Manual6 Ad Code

চট্টগ্রামে প্রায় ১ হাজার ২০০টি ভারী শিল্পসহ প্রায় ৩ হাজার কারখানা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে বলে সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন কমছে। এর সঙ্গে কয়লা ও জ্বালানি তেলের সংকট এবং কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কম থাকায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও নাজুক হয়ে উঠেছে।

চলতি বছরের বিদ্যুতের হিসাবেও দেখা যাচ্ছে, গ্রীষ্মে গড়ে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। পিজিসিবির হিসাবে, গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় দেশে লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৮৪৪ মেগাওয়াট। আজ একই সময়ে লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৯৪৩ মেগাওয়াট।

পেট্রোবাংলার হিসাবে, গ্যাসভিত্তিক ৭২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৪১টিতে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনে এসব কেন্দ্রের প্রয়োজন ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ৮৫২ মিলিয়ন ঘনফুট।

চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম

বর্তমানে দুটি এলএনজি টার্মিনাল সক্রিয় হওয়ার পরও রাজধানীতে গ্যাস সংকট কাটছে না। এর প্রধান কারণ, এলএনজি সরবরাহ ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি বাড়ানো যাচ্ছে না। ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহক্ষমতার এলএনজি টার্মিনাল থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট কম পাওয়ার কারণ হিসেবে আমদানি বিঘ্নিত হওয়াকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যদিও সরকার বলছে, চলতি মাসে বেশ কয়েকটি এলএনজি কার্গো আসার কথা রয়েছে। কিন্তু যতক্ষণ সেগুলো না আসবে, ততক্ষণ সাধারণ মানুষের কষ্ট কমানো যাচ্ছে না।

Manual8 Ad Code

দেশে এখন মোট গ্যাসের চাহিদা ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার বিকেল ৪টার হিসেবে মোট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে ২ হাজার ৩২৯ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ৭০৯ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি থেকে পাওয়া যাচ্ছে। দেশীয় খনি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট।

সংসদে দুঃখ প্রকাশ

সাম্প্রতিক সময়ে সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ২ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে দেশের মানুষ কষ্টে আছে বলে স্বীকার করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

এ সময় বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। জাতীয় সংসদে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমরা লুকোচুরি করতে চাই না। মানুষ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে কষ্টে আছে। আমি আমার মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি। তবে আজকের এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। বিগত দেড় দশক ধরে ফ্যাসিস্ট সরকারের ভুল নীতির অনিবার্য পরিণতি আজ এ দেশের মানুষকে ভোগ করতে হচ্ছে।’

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তাৎক্ষণিকভাবে এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই সমাধান নয়। দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘এই পরিস্থিতি একদিনে হয়নি। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি আর এক শ্রেণিকে সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ওপর ভর্তুকির বোঝা চাপানোর ফলেই আজকের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সরকার এলএনজি টার্মিনাল করার কথা বলছে, এই টার্মিনাল করতেও কমপক্ষে তিন বছর সময় লাগবে। ফলে আজকের সংকট সমাধানের কোনও গতি নেই সরকারের হাতে।’

ফলে একদিকে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট, অন্যদিকে এলএনজি আনার পরিকল্পনা, ভোলার গ্যাস আনার পরিকল্পনা, স্থলভাগে বা সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান—যে পরিকল্পনাই করা হচ্ছে, তার কোনোটিই এখনকার গ্যাস সংকট কমাতে পারবে না। দীর্ঘমেয়াদে হয়তো চাহিদা পূরণ করা যাবে। সব মিলিয়ে গ্যাসের ভোগান্তি থেকে সহসাই মুক্তি মিলছে না সাধারণ মানুষের।

Manual8 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১
২৩৪৫৭৮
৯১০১১১১৩৪১৫
১৬১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৯
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code