মা দিবস: একটি নির্ধারিত যাত্রার বিপরীতে একটি অনির্ধারিত যাত্রা …
মা দিবস: একটি নির্ধারিত যাত্রার বিপরীতে একটি অনির্ধারিত যাত্রা …
editor
প্রকাশিত মে ১০, ২০২৬, ০৭:২৭ পূর্বাহ্ণ
Screenshot
Manual3 Ad Code
ফয়সল মাহমুদ:
বেশ কদিন ধরেই মায়ের শরীর ভালো যাচ্ছিল না। তাই গত ২৭ এপ্রিল লন্ডন থেকে ৮ মে বাংলাদেশে ফেরার টিকিট করেছিলাম—মায়ের কাছে ফিরবো বলে। পরিকল্পনা ছিল, মায়ের সাথে ঈদ করবো, এক মাস সময় কাটিয়ে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে আবার লন্ডনে ফিরবো।
কিন্তু আমার নির্ধারিত যাত্রার অনেক আগেই আল্লাহর অনির্ধারিত যাত্রায় সামিল হয়ে গেলেন আমার মা…
তবুও যদি নির্ধারিত সময়ে দেশে পৌঁছাতে পারতাম, অন্তত মায়ের মুখে শেষবারের মতো হাত বুলিয়ে বিদায় জানাতে পারতাম। নিজের হাতে পরম মমতায় আল্লাহর দরবারে সঁপে দিতে পারতাম। কিন্তু তা আর হয়নি, সবকিছু ঠিক থাকার পরও একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে দেশে যেতে পারলাম না। মাকে শেষ বিদায়টুকুও জানাতে পারলাম না। এই কষ্ট আমাকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়াবে।
মাত্র চার দিনের ব্যবধানে মা চলে গেলেন…আমার পুরো পৃথিবী তছনছ হয়ে গেল।
মায়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর হাজারো চেষ্টা করেছি দেশে ফেরার, কিন্তু পারিনি। তখন উপলব্ধি করেছি—মানুষের ইচ্ছা, সামর্থ্য, টাকা-পয়সা সবকিছু থাকলেও দুনিয়ার সবকিছু মানুষের হাতে নেই। আল্লাহর পরিকল্পনা ও ইচ্ছাই একমাত্র সত্য।
ছোটবেলা থেকে প্রবাসে আসার আগ পর্যন্ত মাকে ছাড়া কখনো একদিনও কোথাও একা থাকিনি। ১৬ বছরের প্রবাস জীবনে প্রতিদিন মায়ের সাথে কথা বলা ছিল আমার জীবনের নিয়মিত রুটিন। ছোট থাকতে বাবাকে হারানোর পর আমার মা-ই ছিলেন আমার পুরো পৃথিবী।
মায়ের দোয়া ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ও প্রেরণা। জীবনে আল্লাহর কাছে যা চেয়েছি, মায়ের দোয়ার ওসিলায় তা পেয়েছি। মা শুধু মা-ই ছিলেন না, ছিলেন আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। জীবনের সবকিছু তাঁর সাথে শেয়ার করতাম।
মায়ের সাথে কাটানো সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর একটি ২০১৪ সালে কাটিয়ে ছিলাম ওমরাতে। মাত্র ১০ দিনের মধ্যে মায়ের পাসপোর্ট ও ওমরাহ ভিসার ব্যবস্থা করেছিলাম, তাঁকে কিছু না জানিয়ে। ফ্লাইটের আগের দিন মা জানতে পারলেন—প্রবাসে আসার চার বছর পর মা-ছেলে একসাথে ওমরাহ করতে যাচ্ছি। সেই দিন মা খুবই খুশি হয়েছিলেন।
Manual1 Ad Code
ওমরাহর সময় মা বলেছিলেন, “তোর লাগি কিতা চাইতাম আল্লাহর কাছে?”
Manual5 Ad Code
আমি দুটি জিনিস চেয়েছিলাম। মা দোয়া করেছিলেন, আর আল্লাহ কবুলও করেছিলেন। জীবনে যত বড় বিপদ এসেছে, সব পানির মতো সহজ হয়ে গেছে। অথচ আজ, সামান্য এক ঘটনার কারণে মায়ের মৃত্যুর সময় তাঁর পাশে যেতে পারলাম না…
মা নেই। আমার দোয়ার দরজাটাও যেন বন্ধ হয়ে গেল।
একমাত্র ছেলে সন্তান হওয়ায় ছোটবেলায় একটু ডানপিটে ছিলাম। তাই মা বলতেন, “এক মায়ের পুতে সুখে খায়, নতুবা দু:খে কাটে।” ছোটবেলা থেকেই কথাটা আমার মনে গভীরভাবে গেঁথে গিয়েছিল। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম—এমন কিছু কখনো মায়ের সাথে করবো না, যাতে মা মনে করেন, “ইশ! আমার যদি আরেকটা ছেলে থাকতো!”
সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি মাকে খুশি রাখতে। তবে আমার মায়ের চাওয়া ছিল খুব সীমিত।
Manual8 Ad Code
আজ সেই মা নেই। মাকে হারিয়ে দুনিয়ার আর কোনো কিছুর প্রতিই আগ্রহ খুঁজে পাই না। সত্যিই, দুনিয়া দুদিনের সফর। সবকিছু একদিন মুছে যাবে। তাহলে কিসের এত অহংকার, কিসের এত বড়াই?
দুনিয়ার সব মায়া ছেড়ে আজ আমার মা অন্ধকার কবরে প্রথম রাত পার করছেন। জানি না সেখানে তিনি কেমন আছেন।
Manual2 Ad Code
শুধু আল্লাহর কাছে একটাই প্রার্থনা—যেভাবে মা আমাকে ছোটবেলা থেকে আগলে রেখেছেন, আল্লাহ যেন তাঁর রহমতের চাদরে আমার মাকে সেভাবেই আগলে রাখেন। এটাই আমার একমাত্র কামনা। রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা। আমিন।
বি: দ্র: শুক্রবার আমার মা মারা গেছেন। শনিবার গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাংবাদিক ও বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের সদস্য।