সিলেটে শিশুদের সাথে বয়স্করাও আক্রান্ত হচ্ছেন হামে, বাড়ছে উদ্বেগ
সিলেটে শিশুদের সাথে বয়স্করাও আক্রান্ত হচ্ছেন হামে, বাড়ছে উদ্বেগ
editor
প্রকাশিত জুন ৩, ২০২৬, ০৫:৪৯ পূর্বাহ্ণ
Manual2 Ad Code
স্টাফ রিপোর্টার:
সিলেটে শিশুদের পাশপাশি তুলনামূলক বয়স্করাও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছেন; যাতে চিকিৎসকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কিশোর, তরুণদের পাশাপাশি বৃদ্ধ রোগীও পাচ্ছেন চিকিৎসকরা। তবে তাদের সুস্থ হওয়ার হার শিশুদের তুলনায় বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামের উপসর্গ নিয়ে সিলেট বিভাগে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৬১ শিশুর প্রাণ গেছে। এ ছাড়া সোমবার ২২ বছর বয়সী তরুণী জেরিন সুলতানা নামে এক শিক্ষানবীশ নার্সের মৃত্যু হয়েছে।
Manual3 Ad Code
সিলেটের শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের চিকিৎসক এস এম সাজ্জাদুল হক বলেন, হাসপাতালে বয়স্ক রোগীরা আসতেছেন। প্রতিদিন পাঁচ-সাতজন, এমনকি ১০-১২ জন রোগী পর্যন্ত ভর্তি হচ্ছেন। রোগীরা ছুটিও পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, আমরা আসলে প্রথমে ভাবিনি এত বয়স্ক রোগী হবে। কারণ হাম সাধারণত বাচ্চাদের হয়। বয়স্ক রোগী আসতে পারে এটা আমাদের ভাবনার মধ্যে ছিল। কিন্তু রোগীর আসার হারটা বেশি মনে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক কার্যালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টার মধ্যে ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ৬৭ জন। বর্তমানে বিভাগের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ২৬৫ জন রোগী ভর্তি আছেন।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মোট ১৬৫ জন ল্যাব-নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর নিশ্চিত হাম রোগে চারজনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
সম্প্রতি সিলেটের হাম ডেডিকেডেট শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের গিয়ে দেখা গেছে, শিশুদের পাশাপাশি বয়স্ক রোগীরা ওয়ার্ডের শয্যায় শুয়ে আছেন। কারো হাতে চলছে স্যালাইন। কেউবা বসে বসে গল্প করছেন স্বজনের সঙ্গে। আর চিকিৎসক-নার্সরা রোগীদের বিছানায় গিয়ে গিয়ে চিকিৎসা দিচ্ছেন। একই সঙ্গে ছোট ছোট শিশুরা শুয়ে আছে। কেউ কোলে নিয়ে বসে আছেন নিজের সন্তানকে।
হাসপাতালের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার বাসিন্দা ৩৪ বছরের যুবক মো. শাকবীর মিয়া চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, “প্রথমে আমার জ্বর আসে। তারপর ডাক্তার দেখালে আমার মুখে দাগ দেখে বলেন হাম হয়েছে। তারপর আমি চার-পাঁচ দিন বাড়িতে ওষুধ খেয়েছি। আমার কোনো উন্নতি না হওয়াতে সিলেট এসে এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। এখন আমার আস্তে আস্তে উন্নতি হচ্ছে।”
Manual6 Ad Code
ছোটবেলা হামের টিকা নিয়েছেন কিনা জানাতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার স্মরণ নেই। তবে আমি বলব, ছোট বাচ্চাদের তাড়াতাড়ি হামের টিকা নেওয়া দরকার। হামে আমার অনেক কষ্ট হয়েছে, বাচ্চাদের তো আরও বেশি কষ্ট হবে।”
Manual4 Ad Code
অপর বিছানায় থাকা ১৮ বছরের তরুণ মোস্তাকিম বলেন, “হাসপাতালে আমার চিাকৎসা হচ্ছে, তবে ভেতরে অশান্তি কাজ করছে।”
আরেক যুবক অনিক রায় বলেন, “আমার প্রথমে জ্বর ছিল, তার কয়েকদিন পর র্যাশ বের হয়। আমি এখানে এসে দেখলাম, অনেক বয়স্ক রোগী আছেন। চিকিৎসার পর আমার কিছুটা ভালো লাগছে।”
হাসপাতালের একই ওয়ার্ডে মাফিয়া বেগম তার তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে ১২ দিন ধরে চিকিৎসা করাচ্ছেন। তার ভাষ্য, প্রায় এক সপ্তাহ জ্বর থাকার পর মেয়ের র্যাশ বের হয়। জন্মের নয় আর ১৫ মাসে হামের টিকা নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে চিকিৎসা নেওয়ার পর বাচ্চার অবস্থা ভালো হয়েছে।
তিনি বলেন, আমার বাসায় আরেকটি বাচ্চা আছে তাকেও টিকা দিয়েছি। আমার মনে হয় হামের টিকা দ্রুত নেওয়া উচিত সব বাচ্চার এবং বাচ্চার ক্ষেত্রে সচেতন থাকা দরকার। সব মা-বাবার উচিত সচেতন থাকা ও টিকা নেওয়া।
এ ব্যাপারে শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের চিকিৎসক এস এম সাজ্জাদুল হক বলেন, “হাসপাতালে আসা বেশিরভাগ রোগী কিন্তু ১৫, ১৬, ১৮, ২০, ২২ বছরের। এমন নয় যে, ৫০-৬০ বছরের রোগীরা আসতেছেন। আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলেছি, টিকা নেওয়ার ব্যাপারে, তাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সর্ম্পকে জানার চেষ্টা করেছি। ধরেন, বেশিরভাগ রোগীর জন্ম ২০০০ সালের দিকে। তাহলে তো সবার ভ্যাকসিন পাওয়ার কথা। তবে বেশিরভাগ জানে না তার ইমিউন সিস্টেম সর্ম্পকে।”
বয়স্কদের আক্রান্ত হওয়া হামের নতুন কোনো ধরন কিনা এ বিষয়ে তিনি বলেন, “বয়স্ক রোগীদের প্রথমে জ্বর হচ্ছে, তারপর র্যাশ বের হচ্ছে, সঙ্গে কাশি। এর তিন বা চার দিন পর বেশিরভাগ রোগীর ডায়রিয়া হচ্ছে। বেশিরভাগের তীব্র ডায়রিয়া। বয়স্কদের ৯০ ভাগই ডায়রিয়া নিয়ে আসতেছেন। ডায়রিয়ার সঙ্গে কারো কারো বমি হচ্ছে, পেটে ব্যাথা হচ্ছে, কারো কারো ব্লাড যাচ্ছে। এটি একটি আলাদা বিষয়।
Manual5 Ad Code
এই চিকিৎসক বলেন, বাচ্চাদের ডায়রিয়া হচ্ছে না তা না। দেখা যাচ্ছে, বেশিরভাগ বাচ্চার শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া হচ্ছে। নিউমোনিয়ায় বাচ্চারা খারাপ হচ্ছে। কাশিটা বয়স্ক রোগীর হচ্ছে। আমি নিউমোনিয়া হয়ে খারাপ হচ্ছে একটা বয়স্ক রোগী পেয়েছি। তাকে আইসিইউতে পাঠানো হয়েছিল। তবে বয়স্কদের সুস্থতার হার খুব ভালো।
বয়স্কদের হামের উপসর্গ নিয়ে শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মিজানুর রহমান বলেন, “বিষয়টি উদ্বেগজনক। প্রতিদিন হাসপাতালে বয়স্ক রোগীরা আসতেছেন। এখন পর্যন্ত ১৭০ থেকে ১৮০ জন বয়স্ক রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। মঙ্গলবারও ২৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি আছেন; এর মধ্যে একজন রোগী আইসিইউতে আছেন।”
তিনি বলেন, “হাম প্রতিরোধে এখন সবাইকে সচেতন হতে হবে। মাস্ক পরে চলাচল করতে হবে। বড়দের জ্বর হলেই বাড়িতে আইসোলেশনে থাকতে হবে। জ্বর নিয়ে বাইরে চলাচল করা যাবে না। একইসঙ্গে ছোট বাচ্চাদের টিকা গ্রহণ করা জরুরি। হাম নিয়ন্ত্রণে টিকার কোনো বিকল্প নেই।”