প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৩রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৯শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৮ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

বেশি দামের বিদ্যুতেই নজর বেশি

editor
প্রকাশিত জুলাই ২, ২০২৬, ০৯:১২ পূর্বাহ্ণ
বেশি দামের বিদ্যুতেই নজর বেশি

Manual8 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

দাম বেশি হলেও বেসরকারি উৎপাদনকারীদের বিদ্যুৎ কেনায় সরকারের আগ্রহ বেশি। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বছরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৬২ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কেনে পিডিবি। গত অর্থবছরে বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে প্রায় ৭২ শতাংশ।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডই (পিডিবি) বলছে, তাদের নিজস্ব ও সরকারি কোম্পানির বিদ্যুতের দাম তুলনামূলকভাবে কম। সরকারের হাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ থাকলে ভর্তুকি কম দিতে হতো। আগামী অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৪৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। ভর্তুকি কমে আসতে পারে কেবল সরকারি অংশগ্রহণ বাড়লে।

Manual8 Ad Code

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের পরিকল্পনা ছিল বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারি এবং বেসরকারি অংশগ্রহণ সমান ৫০ শতাংশ হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতেই এ পরিকল্পনা। কিন্তু সে পরিকল্পনা ভেঙে দেশি-বিদেশি কোম্পানিকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আর দেশের সরকারি খাত উপেক্ষিত থেকে গেছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে পিডিবির যে আগ্রহ সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে তা নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। বিগত আওয়ামী সরকার ভারতের আদানি, রিলায়েন্সের মতো বড় কোম্পানিকে উৎপাদনের সুযোগ করে দেওয়ায় বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণ বেড়েছে।

কত টাকার বিদ্যুৎ কেনা হবে আগামী দুই অর্থবছরে : পিডিবির হিসাব বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৬২ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কিনেছে সরকার। দেশের বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা এককভাবে ৭২ হাজার ৭১ কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিক্রি করেছে, যা একক খাত হিসেবে সর্বোচ্চ। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়েছে ১৯ হাজার ২২২ কোটি টাকার। পিডিবি নিজে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে ১২ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকার আর সরকারি কোম্পানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে ১৪ হাজার ২০৯ কোটি টাকার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৯০১ কোটি টাকার। এর মধ্যে আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছ থেকে ৫৭ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে, ভারত থেকে আমদানি করা হয়েছে ১৯ হাজার ৪২২ কোটি টাকার বিদ্যুৎ। সরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির কাছ থেকে কেনা হয়েছে ১১ হাজার ১০০ কোটি টাকার, পিডিবি নিজে উৎপাদন করেছে ১৩ হাজার ৪০২ কোটি টাকার বিদ্যুৎ। ওই বছর রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছ থেকে কেনা হয়েছে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বিদ্যুৎ।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৯০১ কোটি টাকার বেশি বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৪ শতাংশ বেশি বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। চলতি অর্থবছর শেষ না হওয়ায় পিডিবি হিসাব চূড়ান্ত করেনি এখনো। তবে প্রাক্কলিত হিসাব বলছে, চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) পিডিবি মোট ১ লাখ ৩৫ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কিনবে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কেনার চিন্তা রয়েছে।

Manual5 Ad Code

বেসরকারি বিদ্যুতের দাম বেশি : মোট চার খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনে পিডিবি। এর মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকারীদের বিদ্যুতের দাম সবচেয়ে বেশি। বেসরকারি (আইপিপি) বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে গড়ে ১৪ টাকা ৫৬ পয়সায়। এর পরে রয়েছে ভারত থেকে আমদানির বিদ্যুতের দাম, ওই বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ১১ টাকা ৭২ পয়সা। পিডিবি ৯ টাকা ২৬ পয়সা দরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। অন্যদিকে দেশের সরকারি কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ৬ টাকা ৫২ পয়সায়। তারপরও সরকার বেসরকারি আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছ থেকেই বেশি বিদ্যুৎ কেনে।

Manual2 Ad Code

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ভাষ্য : বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সময় দেওয়া নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম কম বা উৎপাদন খরচ কম সেখান থেকে আগে এবং বেশি বিদ্যুৎ কিনতে হবে। এভাবে ক্রমান্বয়ে উচ্চদরের বিদ্যুৎ কিনতে হবে।

সম্প্রতি বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘আমরা বলেছি, চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে কম খরচের উৎপাদনকে প্রাধান্য দিতে হবে। সবচেয়ে কম দামে যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন করে সেগুলো থেকে আগে বিদ্যুৎ কিনতে হবে। পরে বেশি দামের বিদ্যুৎ কিনতে হবে।’

বাস্তবে ঘটছে ঠিক এর উল্টো। দেখা যাচ্ছে, কম দামে উৎপাদনকারী বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বসিয়ে রেখে বেশি দামের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ¦ালানি সরবরাহ না করে কিংবা জ্বালানির দাম পরিশোধ না করে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে পিডিবির নজর বেশি।

চাপে সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও কমবে : সরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, তাদের পিডিবির কাছ থেকে চেয়ে টাকা নিতে হচ্ছে। কখনো মাসের শেষে বলতে হচ্ছে আমরা কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছি না কিছু টাকা দেন। আবার কখনো ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধের আগে বলতে হচ্ছে, আমাদের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে, টাকা প্রয়োজন। তখন পিডিবির তরফ থেকে পাওনা টাকার একটি অংশ দেওয়া হচ্ছে। স্বাধীনভাবে প্রকল্প নির্মাণ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে টেক্কা দিয়ে কাজ করার জন্য কোম্পানিগুলো গঠন করা হলেও বাস্তবে ঘটছে তার উল্টো।

Manual5 Ad Code

ভর্তুকির অঙ্ক বাড়বে : সাধারণত বিদ্যুৎ খাতে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ভর্তুকির প্রয়োজন হয়। বাকি টাকা গ্রাহকের কাছ থেকে পাওয়া যায়। সরকারি হিসাব বলছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ক্রয়ে ব্যয় ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে ভর্তুকির পরিমাণ ৪৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এ হিসাবে এ অর্থবছরে মোট ব্যয়ের প্রায় ৩২ শতাংশ ভর্তুকি দিতে হবে। পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৬-২৭ সালে ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকার ৩২ শতাংশ ভর্তুকি ধরা হলে তার পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৫ হাজার ৭৯৪ দশমিক ৫৬ কোটি টাকা।

ভর্তুকি সামাল দিতে বাড়বে বিদ্যুতের দাম : সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সময় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন জানায়, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় হবে সরকারের। বিদ্যুৎ ক্রয় যত বেশি হবে তত সরকারের ব্যয় বাড়বে। সরকার চাইলেও সব টাকা ভর্তুকি দিতে পারবে না। এজন্য বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা তৈরি হলে প্রতি বছর বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে তা সমন্বয় করা হয়। বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়লেই ভোক্তার ঘাড়ে অতিরিক্ত বিলের বোঝা চাপে। বেসরকারি খাতের হাতে উৎপাদন বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা থেকে গেলে দাম বৃদ্ধি করা ছাড়া সরকারের কোনো উপায় থাকবে না।

বিশেষজ্ঞ অভিমত : পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, ‘যখন বিদ্যুৎ খাত বেসরকারি করার প্রক্রিয়া শুরু হয় তখনই আমরা সরকারকে সতর্ক করেছিলাম, ভবিষ্যতে সংকট সৃষ্টি হবে। তখন আমাদের কথা কেউ শোনেনি। এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ছে আর সরকার উপলব্ধি করছে ঢালাওভাবে বেসরকারিকরণ ঠিক হয়নি। একটা পর্যায়ে লাগাম টানা উচিত ছিল, কিন্তু সরকার তা করেনি।’

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০৩১  

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code