প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১লা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৬ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতন, ইতিহাস পাল্টানো বিপ্লবের সূচনার দিন আজ

editor
প্রকাশিত জুলাই ১, ২০২৬, ১০:১৪ পূর্বাহ্ণ
কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতন, ইতিহাস পাল্টানো বিপ্লবের সূচনার দিন আজ

Manual4 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

আজ ১ জুলাই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনার দিন। ঠিক দুই বছর আগে (২০২৪ সালে) সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হয়েছিল শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলন, যা পরবর্তী সময়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়ে ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।

 

জগদ্দল পাথরের মতে চেপে বসা স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পলায়নের মধ্য দিয়ে ইতিহাসে এই আন্দোলন পরিচিতি পেয়েছে ‘জুলাই বিপ্লব’ নামেই।

২০২৪ সালের ১ জুলাই ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নাম নতুন প্লাটফর্মের আত্মপ্রকাশ ঘটে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-এর ব্যানারেই গণপদযাত্রা, সড়ক অবরোধ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা সমাবেশ, বিক্ষোভ ও ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি পালন করেন।

যেভাবে শুরু জুলাই আন্দোলনের

জুলাই আন্দোলনের সূচনা সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট ২০১৮ সালে জারি করা কোটা বাতিলের সরকারি পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করলে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ মোট ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল হয়। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা নতুন করে আন্দোলনে নামেন এবং কোটা বাতিলের নির্বাহী আদেশ জারির দাবি জানান।

 

আন্দোলনের শুরুটা ছিল শান্তিপূর্ণ। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কর্মসূচি বিস্তৃত হতে থাকে। ১ জুলাই থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে অবস্থান, মিছিল ও রাজু ভাস্কর্যে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ২ থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত ধারাবাহিক কর্মসূচিও ঘোষণা করেন আন্দোলনের সমন্বয়করা।

শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, একই দিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতীকীভাবে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের দাবি জানান।

আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল আরও আগে। ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের ঘোষণা দেয়। কিন্তু ২০২৪ সালের হাইকোর্টের রায়ের পর সেই কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল হলে আবারও ক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা।

৯ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। দাবি বাস্তবায়ন না হলে সর্বাত্মক আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে দেশব্যাপী কর্মসূচি শুরু হয়।

আন্দোলনের সমাবেশে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ঘোষণা দেন, ৪ জুলাইয়ের মধ্যে দাবি আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের আবাসন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিও জানান তিনি।

Manual4 Ad Code

এরপর আন্দোলন ক্রমেই তীব্র হতে থাকে। কিন্তু আপিল বিভাগের শুনানি হাইকোর্টের রায় বহাল রাখা হয়। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর নিয়মিত আপিল করার পরামর্শ দেয় আপিল বিভাগ।

৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে আনুষ্ঠানিক নৈতিক সমর্থন জানায় জামায়াত ও বিএনপি। ৭ জুলাই ঘোষিত কর্মসূচি বাংলা ব্লকেডে সাড়া দিয়ে শিক্ষার্থীরা মোড়ে মোড়ে অবস্থান নিয়ে অবরোধ করেন। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ওই দিনই অনির্দিষ্টকালের জন্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।

৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৬৫ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। ন্যূনতম কোটা রেখে সরকারি চাকরির সব গ্রেডে ‘অযৌক্তিক’ কোটা বাতিলের দাবি শিক্ষার্থীদের।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের। সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, বল এখন সরকারের কোর্টে। এখন আর আদালত দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। সরকারই ঠিক করতে পারে, এই আন্দোলনের গতিপথ কী হবে।

 

৯ জুলাই সারা দেশে আবারও সকাল-সন্ধ্যা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা আন্দোলনকারীদের। হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলে পক্ষভুক্ত হতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর আবেদন করেন।

Manual8 Ad Code

১০ জুলাই হাইকোর্টের রায়ের ওপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চার সপ্তাহের স্থিতাবস্থা ঘোষণা। ৭ আগস্ট পরবর্তী শুনানির তারিখ ধার্য করে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের। এরপর ওই দিনই সড়ক-মহাসড়কের সঙ্গে রেলপথও শিক্ষার্থীরা অবরোধ করেন। ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

১১ জুলাই শাহবাগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের হাতাহাতি, ব্যারিকেড ভেঙে সড়ক অবরোধ। কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে শিক্ষার্থীদের অনেকে আহত হয়। সেদিন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান শিক্ষার্থীরা ‘লিমিট ক্রস করে যাচ্ছে’, বলে মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, রাস্তায় চেঁচিয়ে আদালতের রায় পাল্টানো যায় না… জনগণের চলাফেরার নিরাপত্তা এবং কাজ করার পরিবেশ রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারের। এগুলো যদি হুমকির মুখে পড়ে, তাহলে সরকারকে নিশ্চয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

১২ জুলাই পুলিশি হামলার প্রতিবাদে ঢাকার শাহবাগসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ। ১১ জুলাই শাহবাগে হাতাহাতির ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে।

১৩ জুলাই মিথ্যা মামলা দিয়ে আন্দোলনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ তোলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। একই দিন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ মন্তব্য করেন- কোটার সমাধান আদালতের মাধ্যমেই হতে হবে।

Manual2 Ad Code

 

১৪ জুলাই

কোটা বহালের পক্ষে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ পায়। সেদিনই গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-নাতি-পুতিরা কেউ মেধাবী না, যত রাজাকারের বাচ্চারা-নাতি-পুতি হলো মেধাবী, তাই না?… মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরাও (সরকারি চাকরি) পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে?

তার ওই মন্তব্যের পরই মূলত কোটা সংস্কার আন্দোলন ভিন্নমাত্রা পায়। প্রতিবাদে ‘তুমি কে, আমি কে?- রাজাকার-রাজাকার; কে বলেছে, কে বলেছে?- স্বৈরাচার স্বৈরাচার, ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’ স্লোগানে মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা।

একই দিন কোটা আন্দোলনকে সরকারবিরোধী রূপ দেওয়ার পাঁয়তারা চালাচ্ছে বিএনপি, এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

পরের দিন ১৫ জুলাই ‘রাজাকার স্লোগানের জবাব দেওয়ার জন্য ছাত্রলীগই যথেষ্ট’ বলে মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এরপর হুমকি দিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনে যারা রাজাকার স্লোগান দিচ্ছেন, তাদের শেষ দেখিয়ে ছাড়বো। ওইদিন দুপুরে বহিরাগতদের নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ হামলা চালায়। পুলিশের সহযোগিতায় সেদিন ছাত্রলীগের নির্বিচারে মারধরে ছাত্রীসহ শতাধিক শিক্ষার্থী আহত, রক্তাক্ত হয়। ওই দিন বিকেলে কার্জন হল এলাকায় বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রও দেখা যায়।

 

‘ছাত্রলীগ চাইলে, ওদের ফুঁ দিলে পাঁচ মিনিট টিকবে না। পাঁচটা মিনিট দাঁড়াতে পারবে না,’ মন্তব্য করেন ছাত্রলীগ নেতা মাজহারুল কবির শয়ন। হামলার জেরে পরবর্তীতে দু’পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ছাত্রলীগ গুলি ও ককটেল নিক্ষেপ করে। আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, সংঘর্ষে ক্যাম্পাস রণক্ষেত্রে রূপ নেয়। দিনভর সংঘর্ষে উভয়পক্ষের প্রায় তিনশতাধিক আহত হয়। এর মধ্যে দুইশ’রও বেশি আন্দোলনকারী, দাবি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের।

রাতে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন দাবি করেন তাদের শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। হামলার প্রতিবাদে ১৬ জুলাই সারা দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা, বোমা বিস্ফোরণ। শিক্ষকসহ এক ডজনেরও বেশি মানুষ আহত হয়।

১৬ জুলাই হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষের লিভ টু আপিল দায়ের হয়। আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে জেলায় জেলায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ চলতে থাকে। পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনরকারীদের সংঘর্ষে রংপুরে প্রকাশে বুক পেতে দেওয়া বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করে। সেদিন আবু সাঈদসহ ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং রংপুরে ছয়জন নিহত হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুরসহ ছয় জেলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়। সারা দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা, এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আবাসিক হল খালি করার নির্দেশ, প্রত্যাখ্যান আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের। ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ নেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। ছাত্রলীগ নেতা-নেত্রীদের কক্ষ ভাঙচুর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল থেকে বেশ কয়েকজন ছাত্রলীগ নেত্রীকে বের করে দেন বিক্ষুব্ধ ছাত্রীরা। নিহতদের স্মরণে ১৭ জুলাই গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিল করার ঘোষণা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চাপের মধ্যে সরকার রাজনৈতিক দমনপীড়ন শুরু করে। ১৭ জুলাই বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, আমরা এই আন্দোলনের সঙ্গে কখনোই সরাসরি জড়িত নই। আমরা তাদের নৈতিক সমর্থন দিয়েছি। সেই সমর্থন আমরা দিয়েই যাব।

 

আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় পুলিশ মামলা দায়ের করে। কিন্তু প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে (এফআইআর) পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার তথ্য গোপন করা হয়। নিহতদের স্মরণে ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিল বের হয়।

পুলিশি হামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কফিন মিছিল পণ্ড। পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত। পুলিশি হামলার প্রতিবাদে পরদিন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা শিক্ষার্থীদের।

সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে তৎকালীন স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি বলেন, ‘আপনজন হারানোর বেদনা যে কত কষ্টের, তা আমার থেকে আর কেউ বেশি জানে না।’ ভাষণে বলেন শেখ হাসিনা, যা নিয়ে বহু ব্যঙ্গচিত্র ও মিম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

১৬ জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের ঘোষণা, উচ্চ আদালতের রায় আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধারনের আহ্বান শেখ হাসিনার। ওই দিন রাতে যাত্রাবাড়ি এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের টোলপ্লাজায় আগুন। ঢাকাসহ অর্ধশত জেলায় বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণ, বহু মানুষ হতাহত।

 

Manual5 Ad Code

উত্তরায় আন্দোলনকারীদের মধ্যে পানি বিতরণের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের (২৫) ভিডিও ভাইরাল হয়। ওই দিন বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবনে হামলা, অগ্নিসংযোগ, সেতু ভবন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবন সহ সরকারি আরও কিছু স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় হেলিকপ্টার থেকে গুলি, কাঁদানে গ্যাস এবং সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। সংস্কারের মাধ্যমে ২০ শতাংশ কোটা রাখার প্রস্তাব করে আওয়ামী লীগ।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রস্তাব করে সরকার, যা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রত্যাখ্যান করে। পরে রাত থেকে সারা দেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ, বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। কোটা আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা, কারফিউ, সেনা মোতায়েন, ইন্টারনেট বন্ধ-আরও অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েও মূলত সরকার আন্দোলন দমাতে ব্যর্থ হয়। বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলপ্রয়োগ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে থাকে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দমন-পীড়নে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে কোটা সংস্কারের দাবির আন্দোলন সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়।

শেষ পর্যন্ত টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। স্বৈরাচার শেখ হাসিনা পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

সেই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সূচনার দিন হিসেবে প্রতি বছরের ১ জুলাই এখন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। আজ সেই ইতিহাস পাল্টানো বিপ্লবের সূচনার দিন।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০৩১  

Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code