প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৬শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১১ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৩ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের কাতারে ভিয়েতনাম, বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

editor
প্রকাশিত জুলাই ২, ২০২৬, ১২:১৩ অপরাহ্ণ
উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের কাতারে ভিয়েতনাম, বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

Manual7 Ad Code

 

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

Manual3 Ad Code

তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, ইলেকট্রনিকসসহ বৈশ্বিক উৎপাদন ও রফতানি বাজারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনাম বিশ্বব্যাংকের স্বীকৃতিতে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের কাতারে উঠে গেছে। ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রফতানিমুখী শিল্পায়ন, বিপুল বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং কার্যকর নীতিগত সংস্কারের সুবাদে বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাসে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে ভিয়েতনাম।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শুধু ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বীকৃতি নয়, বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। দেশটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। অন্যদিকে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও বাংলাদেশ এখনও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবেই রয়েছে। ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় ভিয়েতনাম আরও একধাপ এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশের সামনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, কবে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের কাতারে পৌঁছাবে দেশ?

বিশ্বব্যাংকের ১ জুলাই প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভিয়েতনামের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (গ্রস ন্যাশনাল ইনকাম) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯৭০ মার্কিন ডলার, যা উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের জন্য নির্ধারিত ৪ হাজার ৬৩৬ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। এর ফলে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিম্ন-মধ্যম আয়ের তালিকা থেকে বেরিয়ে উচ্চমধ্যম আয়ের অর্থনীতির কাতারে স্থান করে নিয়েছে।

ভিয়েতনামের এই সাফল্যের তাৎপর্য

বিশ্বব্যাংকের আয়ের ভিত্তিতে দেশগুলোর শ্রেণিবিন্যাস আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক। কোনো দেশ উচ্চ-মধ্যম আয়ের পর্যায়ে পৌঁছালে সেখানে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, উৎপাদন সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা যায়। ফলে বিদেশি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক ঋণ, উৎপাদন খাত সম্প্রসারণ এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ভিয়েতনামের এই অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রফতানিনির্ভর শিল্পনীতি, দক্ষ শ্রমশক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ। বিশেষ করে ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর, মোবাইল ফোন, টেক্সটাইল, জুতা এবং কৃষিপণ্য রফতানিতে দেশটি বিশ্ববাজারে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নতুন অবস্থান

ভিয়েতনামের এই উন্নতির ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাঁচটি বড় অর্থনীতি—সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন—সবগুলোই এখন উচ্চ-মধ্যম আয়ের বা তারও ঊর্ধ্বের অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় এটি ভিয়েতনামের জন্য বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়

অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনও বিশ্বব্যাংকের হিসাবে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ। দেশের মাথাপিছু আয় গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক উন্নয়ন ও রফতানি খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে মাথাপিছু জাতীয় আয় এখনও উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের নির্ধারিত সীমায় পৌঁছায়নি।

বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে থাকলেও সেটি বিশ্বব্যাংকের আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে এক নয়। অর্থাৎ এলডিসি থেকে উত্তরণ মানেই উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া নয়। বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাস পুরোপুরি মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের ওপর নির্ভরশীল।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ শ্রেণিবিন্যাসে ভিয়েতনামের উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে উন্নীত হওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এটি প্রমাণ করে, ধারাবাহিক অর্থনৈতিক সংস্কার, রফতানির বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে তুলনামূলক স্বল্প সময়েও একটি দেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করতে পারে।

তিনি বলেন, ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের শেখার মতো অনেক বিষয় রয়েছে। দেশটি তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল না থেকে ইলেকট্রনিক্স, প্রযুক্তিপণ্য এবং অন্যান্য উচ্চ-মূল্য সংযোজিত পণ্যের রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে রফতানিমুখী শিল্পনীতি, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং স্থিতিশীল নীতিগত পরিবেশের মাধ্যমে বিপুল বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।

রুবেল আরও বলেন, বন্দর, বিদ্যুৎ, সড়ক ও শিল্পাঞ্চলসহ অবকাঠামো উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষায় জোর দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। স্থিতিশীল সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি, সুশৃঙ্খল বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসাবান্ধব নীতিমালাও ভিয়েতনামের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করেছে।

বাংলাদেশের জন্য করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, এখনই রফতানির বহুমুখীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক্স, ওষুধশিল্প, উচ্চ-মূল্য সংযোজিত পোশাক, রাসায়নিক শিল্পসহ সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে নীতিগত সহায়তা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর (এসইজেড) কার্যকারিতা বাড়ানো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি জরুরি।

তিনি আরও বলেন, বন্দর, রেলপথ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎসহ অবকাঠামো খাতে দ্রুত বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, প্রশাসনিক জটিলতা ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এমএসএমই) জন্য সহজ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনায় পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পায়ন এবং জলবায়ু অভিযোজনমূলক নীতিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ভিয়েতনামের উন্নয়নের অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে সঠিক নীতি, ধারাবাহিক সংস্কার, দক্ষ মানবসম্পদ, রফতানির বৈচিত্র্য এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশও দ্রুত উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে।

কেন এগিয়ে গেল ভিয়েতনাম?

Manual8 Ad Code

অর্থনীতিবিদদের মতে, গত দুই দশকে ভিয়েতনাম কয়েকটি ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে গেছে। এরমধ্যে রয়েছে, উৎপাদনমুখী বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ; রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ; উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশ; দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন; ব্যবসা সহজীকরণে ধারাবাহিক সংস্কার এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে শক্ত অবস্থান তৈরি।

Manual1 Ad Code

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনার পর বহু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন কেন্দ্র ভিয়েতনামে স্থানান্তর করেছে। এতে কর্মসংস্থান, রফতানি এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

Manual1 Ad Code

বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা

বিশ্লেষকদের মতে, ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। শুধু তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভর না থেকে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প, প্রযুক্তি পণ্য, ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর, অটোমোটিভ যন্ত্রাংশ এবং উন্নত উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত স্থিতিশীলতা, দ্রুত সেবা প্রদান, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে আরও গতি আনতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ যদি আগামী এক দশকে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারে, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে এবং রফতানিকে বহুমুখী করতে সক্ষম হয়, তাহলে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে পৌঁছানো অসম্ভব নয়। তবে এজন্য অর্থনৈতিক সংস্কার, সুশাসন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

ভিয়েতনামের উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া শুধু দেশটির সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। কারণ কয়েক বছর আগেও দুই দেশের অর্থনীতিকে অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে একই পর্যায়ে বিবেচনা করা হতো। এখন ভিয়েতনাম আয়ের নতুন স্তরে পৌঁছে বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে এবং উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে পৌঁছাতে বাংলাদেশকে আরও দ্রুত অর্থনৈতিক সংস্কার, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পথে এগোতে হবে।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code