বয়স ৭২ বছর। শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না। অথচ জীবনযুদ্ধ থামেনি আজমত আলীর। দিনের বেলা পুরোনো কাপড় আর মাটির তৈরি সামান্য কিছু জিনিস বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোভাবে চলে দুজনের সংসার। আর রাতে স্ত্রীকে নিয়ে আশ্রয় নিতে হয় ছেঁড়া পলিথিনে ঢাকা একটি ছোট্ট ঝুপড়িতে। বৃষ্টি এলে সেই আশ্রয়ও আর আশ্রয় থাকে না।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী পৌর শহরের আড়াইআনী ব্রিজপাড় এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন আজমত আলী ও তার স্ত্রী আছিয়া খাতুন। ব্রিজের পাশেই পলিথিন দিয়ে ঘেরা একটি ছোট্ট ঝুপড়ি তাদের ঠিকানা। শক্ত দেওয়াল নেই, মাথার ওপর নেই টিনের ছাদ। চারপাশে ছেঁড়া পলিথিন আর ওপরের পলিথিনের ছাউনিই তাদের বৃষ্টি-রোদ থেকে রক্ষার একমাত্র ভরসা। তবে সামান্য বৃষ্টি নামলেই ভেঙে পড়ে সেই ভরসা।
বৃষ্টির পানি পলিথিনের ছাউনি ভেদ করে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। ভিজে যায় বিছানা, কাপড় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। অনেক সময় রাতে ঘুম ছেড়ে পানি সরাতে হয়। কখনো আবার ঘরের ভেতর শুকনো জায়গা খুঁজে বসে কাটাতে হয় রাত। বৃষ্টির দিনের কথা বলতে গিয়ে চোখ ভিজে যায় আজমত আলীর।
তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি আইলে ঘরের চেয়ে বাইরে ভালা। বৃষ্টি আইলে ঘরে থাহার কুনু উপায় থাহে না।’
এক ছেলে ও এক মেয়েকে মানুষ করেছেন আজমত-আছিয়া দম্পতি। পরে তাদের বিয়ে দিয়েছেন। সন্তানদের এখন নিজস্ব সংসার। তবে জীবনের শেষ সময়ে এসে আজমত আলী ও তার স্ত্রীর নিজের বলতে নেই এক টুকরো জমি কিংবা নিরাপদ একটি ঘর।
ঘরে থাকার মতো পরিবেশ না থাকায় ছেলে তার স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করছেন বলে জানান আজমত আলী। সন্তানরা আলাদা সংসার নিয়ে ব্যস্ত। আর বৃদ্ধ দম্পতির দিন কাটছে ব্রিজপাড়ের পলিথিনের ঝুপড়িতে।
বার্ধক্য ও অসুস্থতাকে সঙ্গী করেও প্রতিদিন কাজের খোঁজে বের হতে হয় আজমত আলীকে। ঘরের পাশের সড়কে একটি ছোট্ট ঝুপড়ি দোকানে পুরোনো ও ছেঁড়া কাপড়-চোপড় এবং মাটির তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র বিক্রি করেন তিনি।
Manual5 Ad Code
সারাদিন দোকানে বসে কিছু বিক্রি হলে দুজনের খাবারের ব্যবস্থা হয়। বিক্রি না হলে অভাবের হিসাব আরও দীর্ঘ হয়।
আজমত আলীর পরিবারের সদস্য রুস্তম মিয়া জানান, আজমত আলী বয়স্ক ভাতার একটি কার্ড পেয়েছেন। তবে সেই ভাতার টাকা তার ও স্ত্রীর ওষুধ কিনতেই শেষ হয়ে যায়।
দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন বৃদ্ধ এই দম্পতি। নিয়মিত ওষুধের প্রয়োজন হলেও তাদের সামর্থ্য সীমিত। কখনো খাবারের খরচ, কখনো ওষুধ- এই দুইয়ের মধ্যেই হিসাব কষে চলতে হয়।
দিন শেষে দোকান থেকে ফিরেও শান্তি নেই। বৃষ্টি হলে ঝুপড়ির ভেতরে ঢুকে পড়া পানি সামলানো হয়ে ওঠে নতুন সংগ্রাম। বিছানা শুকানো, ভেজা কাপড় সরানো আর রাত কাটানোর জন্য শুকনো একটি জায়গা খোঁজা এভাবেই চলে তাদের জীবন।
Manual5 Ad Code
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আজমত আলীর চাওয়া খুব বেশি নয়। বয়সের শেষ সময়ে স্ত্রীকে নিয়ে একটি নিরাপদ ঘরে থাকতে চান তিনি। মাথার ওপর একটি টিনের ছাদ থাকুক, বৃষ্টির পানি যেন ঘরে না ঢোকে এটুকুই তাঁর স্বপ্ন।
নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল মালেক বলেন, আমি খোঁজ নিয়েছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের দুই বান ঢেউটিন দেওয়া হবে।
Manual7 Ad Code
বছরের পর বছর পলিথিনের ঝুপড়িতে কাটানো আজমত আলীর জীবনে এই টিন হয়তো একটি নিরাপদ ছাদের শুরু। জীবনের ৭২টি বছর পার করে তার এখন একটাই প্রত্যাশা বৃষ্টি নামলে আর যেন বলতে না হয়, ঘরের চেয়ে বাইরে ভালো।