প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৩শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৮ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১০ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

রুপপুরে বছরে সাশ্রয় হবে ১০০ কোটি ডলার

editor
প্রকাশিত আগস্ট ২২, ২০২৬, ০৫:১২ অপরাহ্ণ
রুপপুরে বছরে সাশ্রয় হবে ১০০ কোটি ডলার

Manual2 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:
পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে শিগগিরই পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। এ লক্ষ্যে কেন্দ্রটিতে শেষ পর্যায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
সব পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হলে আগামী আট থেকে ১০ সপ্তাহের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। তবে আগামী বছরের শুরুতেই প্রথম ইউনিট থেকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের। আর বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে গেলে প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো জ্বালানির আমদানি ব্যয় সাশ্রয় হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে সংকট এবং জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয়ের মধ্যে রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কেন্দ্রটির দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে না, একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানি, বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় ও আন্তর্জাতিক বাজারনির্ভরতার চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

Manual1 Ad Code

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রূপপুরের প্রথম ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে। এতে একই সঙ্গে এলএনজি, কয়লা ও তেল আমদানির চাপ কমার পাশাপাশি জ্বালানি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ও কমবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির দুই ইউনিট মিলিয়ে দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদন করা গেলে মাসে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার জ্বালানি ব্যয় সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

এ বিষয়ে নিউক্লিয়ার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রূপপুরের একটি এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট ইউনিট বাণিজ্যিকভাবে চালু হলে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল, গ্যাস ও কয়লার প্রয়োজন কমবে। এতে প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার মতো জ্বালানি সাশ্রয় হবে। তেল, গ্যাস ও কয়লার গড় মূল্য বিবেচনায় বছরে এই সাশ্রয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার।’

Manual4 Ad Code

তিনি বলেন, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি নিরবচ্ছিন্নভাবে বেইসলোড বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে। প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো প্রতিনিয়ত জ্বালানি আমদানি করতে হয় না।
ফলে জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারদর, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তার প্রভাবও তুলনামূলকভাবে কম থাকে।’

ড. শফিকুল ইসলাম আরো বলেন, ‘রূপপুরের দুই ইউনিট চালু হলে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায়ও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। জীবাশ্ম জ্বালানির আমদানি কমে গেলে এলএনজি, কয়লা ও তেল সংরক্ষণের ওপর চাপ কমবে। বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত সময়ের জন্য জ্বালানি মজুদ রাখা সম্ভব হলেও আমদানির চাপ কমলে বিদ্যমান সংরক্ষণ সক্ষমতা দিয়ে তুলনামূলক দীর্ঘ সময়ের জন্য মজুদ রাখা সম্ভব হবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকলে আগাম জ্বালানি কেনার সুযোগও বাড়বে।’

নিউক্লিয়ার বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘রূপপুরের দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা গেলে জীবাশ্ম জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারদর, পরিবহন ব্যয় এবং আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি বিদ্যুৎ খাতে অনেকটাই কমে আসবে। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলারের ওপর চাপও কমবে।’

রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রূপপুরের প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে এরই মধ্যে ইউরেনিয়াম জ্বালানি প্রবেশ করানোর কাজ গত ১২ মে শেষ হয়েছে। দুই ধাপে শতাধিক পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এখন শেষ পর্যায়ের জটিল ও সংবেদনশীল পরীক্ষাগুলো ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হচ্ছে। প্রতিটি ধাপ বিস্তারিত যাচাইয়ের পর অনুমোদন দিচ্ছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)। কেন্দ্রটি পূর্ণ উৎপাদনে গেলে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। একবার জ্বালানি লোড করার পর একটি ইউনিট টানা প্রায় ১৮ মাস বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। এরপর রিফুয়েলিং ও প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজের জন্য ইউনিটটি সর্বোচ্চ প্রায় দুই মাস বন্ধ রাখার প্রয়োজন হতে পারে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কমিশন। কমিশনের অধীন পরিচালনার কাজটি করছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)। নির্মাণ করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদুল হাছান বলেন, ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট থেকে বছরে এক বিলিয়ন ডলারের মতো জ্বালানি ব্যয় সাশ্রয়ের হিসাব মূলত নির্ভর করবে বিকল্প হিসেবে কী ধরনের জ্বালানি আমদানি করা হচ্ছে তার ওপর। তেল, গ্যাস, এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করে এ ধরনের হিসাব করা হয়ে থাকে। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণে বিভিন্ন প্লান্টের আলাদা আলাদা উৎপাদন ব্যয় থাকায় বিষয়টি নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।’

তিনি বলেন, ‘একটি ইউনিট থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে কি না, সেটি পুরো গ্রিড ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা ও সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করবে। গ্রিড সিনক্রোনাইজেশনের কাজ আগামী ছয় থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে কেন্দ্রটির সক্ষমতা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহের চেষ্টা করা হবে।’

রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদনের নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে জাহেদুল হাছান আরো বলেন, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিং পর্যায়ে সেফটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে প্রায় দুই হাজার ৩০০ ধরনের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। আরো কিছু পরীক্ষা শেষ করতে হবে। সব পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পরই গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। কোনো নির্দিষ্ট মাস বা তারিখ উল্লেখ করলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি হতে পারে। কোনো পরীক্ষায় সমস্যা হলে আবার পরীক্ষা করতে গিয়ে কয়েক দিন সময় পিছিয়ে যেতে পারে। সব পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হলে আট থেকে ১০ সপ্তাহের মধ্যে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে। তবে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস না করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করেই পরবর্তী ধাপে যেতে হবে।’

এ বিষয়ে সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ অন্য উেসর তুলনায় বেশি স্থিতিশীল এবং এটি একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য গ্রিডের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হয়। এ জন্য গ্রিডের অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। গ্রিডে যাতে কোনো ত্রুটি বা সঞ্চালনে বাধা তৈরি না হয়, সে লক্ষ্যে পাওয়ার গ্রিড কম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ চলছে।

Manual5 Ad Code

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল অ্যানালিসিসের (আইইইএফএ) প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দেশের গ্রিডে ধারাবাহিক বেইসলোড বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাবে। বাড়তে থাকা বিদ্যুতের চাহিদা পূরণেও কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’ তিনি বলেন, ‘বিদ্যুতের ট্যারিফ এখনো চূড়ান্ত না হলেও পারমাণবিক বিদ্যুতের বড় সুবিধা হলো জীবাশ্ম জ্বালানির মতো আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার সঙ্গে এর উৎপাদন ব্যয় সরাসরি পরিবর্তিত হয় না। ফলে বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘ মেয়াদে স্থিতিশীলতা তৈরি হবে।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এরই মধ্যে রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে বাঘাবাড়ী ২৩০ কেভি, বগুড়া ৪০০ কেভি এবং গোপালগঞ্জের ৪০০ কেভি সঞ্চালন কাঠামোর কমিশনিং প্রায় শেষ হয়েছে। তবে কেন্দ্রটির পূর্ণ সক্ষমতার বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সঞ্চালনব্যবস্থার আরো নিবিড় প্রস্তুতি প্রয়োজন।

Manual4 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code