প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৩শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৮ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১০ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

লিফট যেন ‘চলন্ত বিপদ’

editor
প্রকাশিত আগস্ট ২২, ২০২৬, ০৫:২১ অপরাহ্ণ
লিফট যেন ‘চলন্ত বিপদ’

Manual7 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

Manual5 Ad Code

২০২৫ সালের ২৭ মে। রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা কারওয়ান বাজার। ঘড়ির কাঁটায় তখন সবেমাত্র সকাল পৌনে ৯টা। প্রতিদিনের মতো সেদিনও বহুতল বিডিবিএল ভবনে প্রবেশ করছিলেন কর্মীরা। কাজ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে ১৩ তলা এ ভবন থেকে নামার সময় ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।

বিকট শব্দে ছিঁড়ে পড়ে লিফটের মূল তার। লিফটম্যান তৌফিকসহ একনাবিন অডিট ফার্মের ৯ কর্মী আটকা পড়েন ভেতরে। মুহূর্তের মধ্যে লিফটটি আছড়ে পড়ে নিচে। তেজগাঁও ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে উদ্ধারকর্মীরা ছুটে এসে উদ্ধার করেন তাদের। মাথায়, হাতে, পায়ে ও পেটে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। ভয়াবহ এ দুর্ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা নয়। প্রতিদিন লাখো মানুষের বহুতল ভবনে যাতায়াত কতটা অনিরাপদ, এই ঘটনা তারই নির্মম প্রমাণ।

 

Manual8 Ad Code

নগরায়ণের ছোঁয়ায় প্রতিদিন বদলে যাচ্ছে আশপাশের পরিবেশ। বিশ-ত্রিশ-চল্লিশ তলা ভবন এখন আর নতুন কিছু নয়। আকাশচুম্বী ইমারতগুলোর প্রাণভোমরা যেন লিফট। প্রতিদিন গড়ে কয়েক হাজার নতুন লিফট সংযোজিত হচ্ছে বড় বড় শপিং মল, অফিস ও আবাসিক ভবনে। কিন্তু এই লিফটগুলোর নিরাপত্তা দেখার যেন কেউ নেই। মান যাচাইয়ের নির্দিষ্ট কোনো তদারকি কাঠামো গড়ে ওঠেনি এখনও।

 

রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় ইমারত কোড বা বিএনবিসি। সেখানে বলা আছে ইউরোপীয় মানের সুরক্ষা বিধানের কথা। কিন্তু বাস্তবে যথাযথ প্রয়োগ নেই। একাধিক সরকারি বিভাগ এর দায় এড়াচ্ছে। নির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ এর সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। ফলে প্রতিটি ভবনের লিফট অদৃশ্য মৃত্যুফাঁদ যেন।

বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী ও ব্যবহারকারীরা এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, কোনো স্বাধীন পরিদর্শন ব্যবস্থা নেই। পুরো বাজারটি রয়েছে বিরাট আইনি শূন্যতার মুখে। বাজারে আন্তর্জাতিক মানের সনদপ্রাপ্ত পণ্য মেলে। এর পাশাপাশি বিক্রি হয় দেশীয় তৈরি লিফটও। এমনকি বানানো হচ্ছে বিদেশি যন্ত্রাংশ দিয়ে জোড়াতালির লিফট।

স্থানীয়ভাবে লিফট সংযোজন নিজে থেকেই অনিরাপদ নয়। তবে বাধ্যতামূলক নজরদারি না থাকায় ঝুঁকি কমছে না। পণ্যের মান নিয়ে সব সময় অনিশ্চয়তায় থাকেন ক্রেতারা। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রপার্টি লিফটের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, লিফটের জীবনচক্র তদারকি করার কার্যকর আইনি কাঠামো নেই। এই খাতটি সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রয়েছে। ইনস্টলেশন মনিটরিং করার কেউ নেই। দুর্ঘটনা তদন্তের জন্যও কোনো সুনির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ নেই। দেশের লাখো মানুষ প্রতিদিন লিফট ব্যবহার করেন। পেছনের ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে।

গত তিন বছরের বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, লিফটের ত্রুটির কারণে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১৭ জনের। এ ছাড়া ৬ শতাধিক মানুষ গুরুতর আহত হয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। অনেক ছোটখাটো দুর্ঘটনা প্রকাশই পায় না। মৃত্যু বা শারীরিক আঘাত ছাড়াও রয়েছে বড় সমস্যা। বহু নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষ আটকা পড়েন লিফটে। তারা তীব্র মানসিক আঘাত ও আতঙ্কের শিকার হন। দুর্ঘটনার প্রভাব শুধু প্রাণহানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ভুক্তভোগীরা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমার শিকার হন।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, লিফট রক্ষণাবেক্ষণের কোনো বালাই নেই। দক্ষ কারিগর তৈরির ব্যবস্থা নেই। নিয়মিত সেফটি অডিট করার মতো কোনো স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ দেশে নেই। দ্রুত বর্ধমান শহরায়নের যুগে লিফট এখন বিলাসিতা নয়। এটি দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের মতো এখানে কোনো ব্যবস্থা নেই। পর্যায়ক্রমে ফিটনেস যাচাই করার নিয়ম নেই। লাইসেন্স দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই। ফলে প্রতিটি দুর্ঘটনার পর বড় প্রশ্ন ওঠে, যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করার আগে এই নিরাপত্তার দায়িত্ব আসলে কার?

বর্তমানে দেশের লিফটের বাজারের আকার প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ ও ভূমির উচ্চমূল্যের কারণে চাহিদা বাড়ছে। মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ লিফট বিদেশ থেকে আসে। বাকি অংশ দেশেই উৎপাদিত হয়। ফিনল্যান্ড, স্পেন, চীন ও কোরিয়ার বিখ্যাত ব্র্যান্ড রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রাণ-আরএফএল ও ওয়ালটন কাজ করছে। বাজারের এই দ্রুত সম্প্রসারণ ক্রেতাদের পছন্দ বাড়িয়েছে। তবে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবস্থাপনার দুর্বল দিকগুলোও উন্মোচন করেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, লিফট সাধারণ কোনো বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নয়। এটি অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল একটি মেকানিক্যাল সিস্টেম। ব্রেকিং পদ্ধতি ও গাইড রেইল-এর অংশ। ওভারস্পিড গভর্নর ও ইমার্জেন্সি রেসকিউ ডিভাইস থাকে। ডজনখানেক যন্ত্রাংশের নিখুঁত পারফরম্যান্সের ওপর এর জীবন নির্ভর করে।

Manual5 Ad Code

আন্তর্জাতিক মানের কোম্পানিগুলো কঠোর পরীক্ষা করে। বাজারে ছাড়ার আগে বিশেষায়িত টেস্টিং টাওয়ারে পরীক্ষা হয়। ফ্রি-ফল প্রটেকশন ও ব্রেকিং পারফরম্যান্স যাচাই করা হয়। এই ধরনের একটি টেস্টিং টাওয়ার তৈরিতে খরচ অনেক বেশি। অন্তত ২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়।

ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পক্ষে এটি অসম্ভব। বর্তমানে কেবল প্রাণ-আরএফএল ও ওয়ালটনের এই টাওয়ার আছে। হাতে গোনা কয়েকটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এই ল্যাব তৈরি করেছে। এর বিপরীতে অনেক ছোট ব্যবসায়ী ভিন্ন কাজ করে। তারা বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ বা পার্টস আনে। স্থানীয়ভাবে তা একত্রিত করে বাজারজাত করা হয়। উদ্যোক্তারা মনে করেন, যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আনা দোষের নয়। তবে স্বাধীন সংস্থার অনুমোদন ছাড়া এই পণ্য বিক্রি করা ঠিক নয়। সাধারণ ক্রেতারা ভালো ও মন্দ লিফট চিনতে পারেন না।

খান ব্রাদার্সের চেয়ারম্যান এনামুল কবির একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ করেন। তিনি জানান, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নামিদামি ব্র্যান্ডের লোগো ব্যবহার করে। নিম্নমানের যন্ত্রাংশ দিয়ে দেশেই লিফট তৈরি করা হয়। এতে ভবনমালিকরা প্রতারিত হন। তারা ভাবেন নামি ব্র্যান্ডের পণ্য কিনছেন। বাস্তবে তারা জোড়াতালি দেওয়া পণ্যের শিকার হন।

Manual4 Ad Code

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) সূত্র জানিয়েছে, ইমারত সংশ্লিষ্ট কিছু প্রকৌশলী পণ্য তারা দেখেন। তবে সরকার তাদের লিফট নিয়মিত নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেয়নি।

রাজধানী উন্নয়ন কতৃপক্ষ (রাজউক) সূত্র জানিয়েছে, তাদের প্রধান কাজ ভবন নির্মাণ অনুমোদন দেওয়া। তারা নকশা অনুযায়ী ভবন তৈরি হয়েছে কি না তা দেখে। তবে লিফটের ফিটনেস যাচাই তাদের দায়িত্ব নয়।

সরকারি কাজের অন্যতম বড় ক্রেতা পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট। একে বলা হয় পিডব্লিউডি। তারা তাদের প্রকিউরমেন্ট নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সুনির্দিষ্ট মূল্যায়নের অভাব দূর করতে শিডিউল অব রেটস আধুনিকায়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে একটি জাতীয় মানের লিফট টেস্টিং টাওয়ার গড়ার চিন্তা করছে।

তবে নজরদারির ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগ থেমে নেই। দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপগুলো বড় বিনিয়োগ করেছে। নরসিংদীর পলাশে প্রপার্টি লিফট কারখানা গড়েছে। এতে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। ঢাকার চন্দ্রায় ওয়ালটন বিশাল কারখানা গড়ে তুলেছে।

স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ছয় প্যাসেঞ্জারের লিফটের দাম কম। এর দাম প্রায় ২০ লাখ টাকা পড়ে। অন্যদিকে আমদানি করা লিফটের দাম প্রায় ৩০ লাখ টাকা। প্রাণ-আরএফএল বলছে, গুণগত মান বজায় রেখে তাদের লিফট উৎপাদিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এগুলো বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

তবে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি অন্য বিষয়ও আছে। এই খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব আইনি স্বচ্ছতার ওপর নির্ভর করে। কঠোর প্রশাসনিক নিয়ম না থাকলে সুফল মিলবে না। সরকার একটি নতুন আইন পাস করেছে। এর নাম বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি বা বিবিআরএ। তবে এই সংস্থাটি এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন এই সংস্থাকে অবিলম্বে চালু করা দরকার। এর কর্মপরিধিতে লিফটের বাধ্যতামূলক লাইসেন্স যুক্ত করতে হবে। নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করাও জরুরি।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code