সংবিধান সংশোধনের কাঠামোগত বিষয় এখন স্পষ্ট হচ্ছে। জাতীয় সংসদে গঠিত বিশেষ কমিটির ছয়টি বৈঠকের পর কোন পথে সংবিধান সংশোধন হবে, কোন কোন বিষয়ে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ রয়েছে এবং কোথায় এখনও মতপার্থক্য রয়েছেÑ তা এখন পরিষ্কার। প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো— সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা। সংবিধানের প্রস্তাবনা ও গণভোটের সুরক্ষার আওতায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ বিধান পরিবর্তন করতে হলে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের পাশাপাশি গণভোটের প্রয়োজন হবে। এর আওতায় বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাও রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে গঠিত বিশেষ কমিটি ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, বিচারক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, শ্রমজীবী মানুষ, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের মতামত নিয়েছে। আরও বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়া হবে। কমিটির লক্ষ্য ডিসেম্বরের মধ্যে আলোচনা শেষ করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়া, যাতে আসন্ন শীতকালীন অধিবেশনে এ-সংক্রান্ত বিল সংসদে পাস করা যায়। তবে কমিটিতে বিরোধী দলের কোনো প্রতিনিধি নেই।
Manual4 Ad Code
বর্তমান প্রক্রিয়ায় বিশেষ কমিটি বিভিন্ন প্রস্তাব পর্যালোচনা করে কোন কোন বিধান সংশোধন, সংযোজন বা পরিবর্তন করা প্রয়োজন, সে বিষয়ে সুপারিশ করবে। এরপর কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইন মন্ত্রণালয় সংশোধনী বিল তৈরি করবে। বিলটি জাতীয় সংসদে উত্থাপনের পর সংসদীয় প্রক্রিয়ায় আলোচনা ও বিতর্ক হবে। এরপর বিভক্তি ভোটে বিলটি পাস হবে।
Manual6 Ad Code
সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংশোধনী বিল সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে পাস হতে হবে। এরপর বিল রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপতিকে সাত দিনের মধ্যে সম্মতি দিতে হয়; তা না হলে নির্ধারিত সময় শেষে সম্মতি দেওয়া হয়েছে বলে গণ্য হয়। তবে এবার এই প্রচলিত সংসদীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে গণভোটের একটি নতুন ধাপ যুক্ত হচ্ছে। কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধানের প্রস্তাবনায় পরিবর্তন এলে গণভোটের প্রয়োজন হয়। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ গণভোটের সুরক্ষার আওতায় থাকা কোনো অনুচ্ছেদে পরিবর্তন এলে সংসদে সংশোধনী বিল পাসের পর রাষ্ট্রপতির সম্মতির আগে গণভোটে যেতে হবে।
Manual3 Ad Code
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকেও এই সুরক্ষার আওতায় আনার প্রস্তাব বিএনপির পক্ষ থেকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে পুনর্বহাল হলে ভবিষ্যতের কোনো সংসদ সেটি পরিবর্তন বা বাতিল করতে চাইলে শুধু সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা যথেষ্ট হলে হবে না। গণভোটের বাধ্যবাধকতা রাখার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো কী হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে না। অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় বিচার বিভাগকে এ প্রক্রিয়ায় না জড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। এর বাইরে আর কোন কোন সংশোধনী গণভোটের আওতায় পড়বে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকাও এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
Manual8 Ad Code
সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি জুলাই যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা ও দায়মুক্তির মতো বিষয় উঠে এসেছে। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে সংবিধানে স্বীকৃতি দেওয়া এবং জুলাই ঘোষণাপত্র কোথায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে, সে বিষয়েও এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ ছাড়া সংসদের উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও নির্বাচনপদ্ধতিতে পরিবর্তন, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও মেয়াদ সীমিত করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কাঠামোগত সংস্কার, নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগপদ্ধতি পরিবর্তন, নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, একজন উপ-রাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি, বিরোধী দলের ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।
এর মধ্যে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হলেও এ নিয়ে ভিন্নমতও এসেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠার মতো পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি। উচ্চকক্ষের গঠন, সদস্য নির্বাচন এবং এর ক্ষমতা কী হবে, সেসব বিষয়ে বিস্তারিত সাংবিধানিক বিধানও এখনও তৈরি হয়নি।
ছয়টি বৈঠকের পর সংবিধানের সব প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়েছে, এমনটি বলা যাবে না। কমিটির কাজের একটি বড় অংশ এখনও মতামত সংগ্রহ ও প্রস্তাব যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। কমিটির বৈঠকে বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে আসা এবং লিখিতভাবে জমা পড়া প্রস্তাবগুলো প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পরবর্তী বৈঠকগুলোতে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, বিচারক, আইনজীবী, নারী নেতৃত্বসহ আরও বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বর্তমান সংবিধানের ৭খ অনুচ্ছেদে প্রস্তাবনা, প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ, মৌলিক অধিকারের বড় অংশ এবং অন্যান্য মৌলিক কাঠামোর বিধানকে সংশোধন অযোগ্য বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ১৪২ অনুচ্ছেদে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে সংবিধান সংশোধনের সাধারণ পদ্ধতি নির্ধারিত রয়েছে। ফলে যেসব প্রস্তাব সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বা প্রস্তাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত, সেগুলো বাস্তবায়নে শুধু রাজনৈতিক ঐকমত্য নয়, সাংবিধানিক ও বিচারিক প্রশ্নও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
জামায়াত-এনসিপির নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট বিশেষ কমিটির বাইরে থাকলেও সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিল সংসদে এলে তার ওপর আলোচনা, মতামত ও সংশোধনী দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন পক্ষের তাগিদ থাকলেও তাদের বিশেষ কমিটিতে আনার আর কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় যাচ্ছে না সরকার। ফলে পুরো সংশোধন প্রক্রিয়া একতরফাভাবে সম্পন্ন হতে পারে— এমন আশঙ্কা রয়েছে। তবে গণভোট আয়োজন করা হলে সেখানে জনগণের রায় কোন দিকে যাবে, তা এখনই বলা কঠিন।