বিয়ানীবাজারে তদারকির অভাব এবং জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে বিয়ানীবাজারের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা এখন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে হাফিজিয়া, আলিয়া ও কওমি—এই তিন ধারায় পরিচালিত মাদ্রাসাগুলোতে নিয়মিত তদারকি, শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা এবং আধুনিক মানের পাঠদান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের শূন্যতা দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং কিছু ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ায় বিয়ানীবাজারজুড়ে তদারকির অভাবটি ব্যাপকভাবে সামনে এসেছে।
বিয়ানীবাজার উপজেলায় মাদ্রাসার মোট সংখ্যার তথ্য স্থানীয় মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস কিংবা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দপ্তরে লিপিবিদ্ধ নেই। এরপরও নিয়মিত বাড়ছে মাদ্রাসার সংখ্যা। দেশের অন্যান্য এলাকায় মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ ও সংকট সৃষ্টি হওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে বিয়ানীবাজারেও। উপজেলায় প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থী মাদ্রাসা শিক্ষা গ্রহণ করছে।
সূত্র জানায়, আলিয়া মাদ্রাসার জন্য সরকারি তদারকি কাঠামো ও শিক্ষা বোর্ড থাকলেও হাফিজিয়া বা কওমি ধারার প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব বোর্ড দ্বারা পরিচালিত হয়। এর ফলে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনায় দুই ধারায় প্রশাসনের তদারকির ধরণ এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ একরকম হয় না। ফলে ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা।
Manual1 Ad Code
সরজমিন দেখা গেছে, যেকোনো ব্যক্তি একটি ভাড়া করা বাড়ি বা স্থানে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি ছাড়াই কওমি মাদ্রাসা শুরু করতে পারে। এর ফলে কওমি বোর্ডের অধীনে বিয়ানীবাজারে বিপুল সংখ্যক মাদ্রাসা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানের ছাত্রভর্তি, অর্থায়ন বা শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় ডেটা বা নজরদারি চোখে পড়েনি। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক মাদ্রাসায় কোনো সিসি ক্যামেরা নেই, নেই কোনো সুনির্দিষ্ট শিশু সুরক্ষা পলিসি। এর ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেও তা ধামাচাপা দেওয়ার সুযোগ থেকে যায় বলে মনে করছেন পঞ্চখন্ড হরগোবিন্দ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক মাওলানা হুমায়ুন রশীদ জাইদী।
শ্রীধরা গ্রামের হযরত সৈয়দ শাহ (র) হাফিজিয়িা মাদ্রাসার সেক্রেটারী আমিনুল হক দিলু বলেন, কিছু মাদ্রাসার হিফজখানা ও শাসনের নামে অতিরিক্ত শারীরিক শাস্তি, বেত্রাঘাত এবং নির্যাতনের চিত্র প্রায়শই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যায়, যা ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে এই ধারার শিক্ষার ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে।
সারোপার হাফিজিয়া মাদ্রাসার সাবেক সুপার ফয়জুল হক শিমুল বলেন, পর্যাপ্ত একাডেমিক প্রশিক্ষণ, শিশু মনস্তত্ত্বের অভাব এবং আধুনিক লিডারশিপ স্কিল না থাকায় শিক্ষকরা অনেক সময় মানবিক উপায়ে শিক্ষার্থীদের পরিচালিত করতে পারেন না। এর প্রভাব পড়ছে পুরো মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায়।
Manual2 Ad Code
সরজমিন আরো দেখা যায়, মাদ্রাসায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও নিয়মিত নজরদারি বাধ্যতামূলক করা, শিশুদের মারধর বা যেকোনো ধরনের শারীরিক ও মানসিক হয়রানি সম্পূর্ণ বন্ধ করা, ভয় বা অপমানের পরিবর্তে প্রজ্ঞা, ভালোবাসা ও মানবিকতার ভিত্তিতে শৃঙ্খলা রক্ষা করা গেলে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার অনেক দূর্নাম গোচানো সম্ভব হবে।
বিয়ানীবাজার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মৌলুদুর রহমান বলেন, কিছু আবাসিক মাদ্রাসায় শিক্ষকদের দ্বারা শিক্ষার্থীদের হয়রানি বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও মামলা সামনে এসেছে । এর ফলে সংক্ষুব্ধ জনতা ও অভিভাবকদের মধ্যে এক ধরনের আস্থার সংকট ও ভীতি তৈরি হচ্ছে, যা স্থানীয়ভাবে শিক্ষার্থী কমার পেছনে ভূমিকা রাখছে।