প্রায় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে পূর্ব সিলেট তথা বিয়ানীবাজার উপজেলার শিক্ষার অন্যতম আলোকবর্তিকা পঞ্চখন্ড হরগোবিন্দ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (পিএইচজি হাইস্কুল)। নানা কর্মকান্ডে এই প্রতিষ্টানের অভ্যন্তরীন বিভিন্ন বিষয় প্রকাশ্যে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
জানা যায়, জমিদার শ্রী গৌর চন্দ্র দাস মুন্সির পুত্র পবিত্রনাথ দাস ১৯১০ সালে নিজ ভূমিতে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯১৭ সালে এটি ‘হরগোবিন্দ হাই স্কুল’ নামে সরকারি স্বীকৃতি পায় এবং পরবর্তীতে এর সাথে ‘পঞ্চখণ্ড’ পরগনার নাম যুক্ত হয়। এটি বৃহত্তর সিলেটের মফস্বল অঞ্চলের দ্বিতীয় প্রাচীন উচ্চ বিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে। ২০১৮ সালের ২৫ এপ্রিল বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ করা হয়।
বিচারপতি, ভাষাসৈনিক থেকে খ্যাতিমান সাহিত্যিক, প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাসহ অসংখ্য কৃতী মানুষের শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়েছে এই স্কুলে। বিগত দিনে এসএসসি পরীক্ষার ফল, মেধা তালিকা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমেও প্রতিষ্ঠানটি অনন্য শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছিল। কিন্তু এখন আর সেইদিন নেই।
পিএইচজি হাইস্কুলের ঐতিহ্য, সাফল্য আর গৌরবের এই উজ্জ্বল আবরণের আড়ালে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে আরেকটি নির্মম বাস্তবতা। ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষা ব্যবস্থা, ভালো ফলাফল এখন দূরের পথ। ডিজিটাল শিক্ষা ও স্মার্ট বাংলাদেশের যুগে আধুনিক প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং সময়োপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতিতে ধুঁকছে জেলার অন্যতম এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ। আধুনিক কোডিং বা স্টেম শিক্ষা তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে মৌলিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাও কাঙ্ক্ষিতভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই শিক্ষা ও সংস্কৃতির ধারক হিসেবে পিএইচজি হাইস্কুল দেশের অন্যতম সেরা মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক হাছন আলী ও আলী আহমদ এর সময়ে শুরু হয় এই প্রতিষ্ঠানের স্বর্ণযুগ। তাঁদের সময়কার একাধিক কৃতিত্ব স্কুলটির ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অতীতের ধারাবাহিকতা রাখা সম্ভব হয়নি। সবশেষ ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখা মিলিয়ে ৮৯ ভাগ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়। ২০২২ সালের এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানের ৩৭জন শিক্ষার্থী এ প্লাস পায়। শুধু ফলাফল নয়, দেশের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই প্রতিষ্ঠানের নাম। এছাড়া বিভিন্ন ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগীতায় পিএইচজি হাইস্কুল কৃতিত্বের সাক্ষর রাখছে। উপজেলা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সুনাম অর্জন করছে।
বিগত সাফল্যের ধারাবাহিকতার বিপরীতে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। বর্তমানে ৬ষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৫৫০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। সরকারি হওয়ার পর শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে, কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি শিক্ষক কিংবা পাঠদানের সময়। ২৭ জন শিক্ষকের স্থলে আছেন মাত্র ১২জন। প্রধান শিক্ষক নেই সরকারি হওয়ার পর থেকে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল হেকিম বলেন, ১শ’ বছরের বেশী পুরোনো এই প্রতিষ্ঠান এখনো সুনামের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান অবকাঠামোয় আর শিক্ষার্থী বাড়ানোর সুযোগ নেই। এখন দ্রুত শিক্ষক সংকট দূর করতে পারলে এই প্রতিষ্টানের ফলাফলে সুফল পাওয়া যাবে।
Manual8 Ad Code
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ জানায়, ‘আমরা আমাদের স্কুল নিয়ে গর্ব করি। কিন্তু প্রযুক্তির দিক থেকে আরও উন্নতি দরকার।’ আরেক শিক্ষার্থী সাদ জানায়, ‘আইসিটি বিষয়ে আমরা তাত্ত্বিক জ্ঞান পাই, কিন্তু ব্যবহারিক সুযোগ সীমিত।’
বিয়ানীবাজার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মৌলুদুর রহমান বলেন, পিএইচজি হাইস্কুল ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকা কাম্য নয়।
Manual5 Ad Code
স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য সামনে রেখে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদানের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিক্স, কোডিং, স্টেম শিক্ষা ও ডিজিটাল দক্ষতা এখন বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অন্যতম শর্ত। অথচ বিয়ানীবাজারের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পিএইচজি হাইস্কুলে এখনো আগের কম্পিউটার দিয়েই চলছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) শিক্ষা। অধিকাংশ যন্ত্রপাতি পুরোনো, নেই আধুনিক ডিজিটাল ল্যাব, নেই কোডিং ক্লাব কিংবা স্মার্টবোর্ড। ফলে তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করলেও ব্যবহারিক দক্ষতায় পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। প্রকাশ্যে দিনদুপুরে বিদ্যালয়ের আশপাশে ঘুরে বেড়ায় বখাটেরা। রাতে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে মাদক সেবন চলে। অতি সম্প্রতি বিদ্যালয়ের বাউন্ডারী দেয়াল নির্মাণ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পাওয়া গেছে। দেয়াল নির্মাণের পক্ষে-বিপক্ষে দু’পক্ষ অবস্থান নিয়েছে। বিদ্যালয়ের মালিকানাধীন বিপুল পরিমান ভূমি বেদখল হয়ে গেছে। পিএইচজি স্কুল মার্কেটের দোকান বরাদ্দ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন অনেকে। বিদ্যালয়ে নেই কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়াম, আধুনিক শিক্ষক কক্ষ, এবং পর্যাপ্ত ওয়াশরুম। নির্মিতব্য একটি গেটের কাজ কবে শেষ হবে, তা বলতে পারছেনা কেউ। অভিভাবক ও তদারকিহীন এই প্রতিষ্টানের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন সাবেক শিক্ষার্থীরা।
এদিকে তথ্যপ্রযুক্তি এখন আবশ্যিক বিষয় হলেও বিদ্যালয়ে আইসিটি বিষয়ের দক্ষ শিক্ষক নেই। অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিয়ে কম্পিউটার ক্লাস পরিচালনা করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার গুণগত মানের জন্য উদ্বেগজনক। বিজ্ঞান শিক্ষা ক্ষেত্রেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের জন্য আলাদা ল্যাব থাকলেও অনেক যন্ত্রপাতিই বহু বছরের পুরোনো। আধুনিক পরীক্ষণ সরঞ্জামের অভাবে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষা প্রত্যাশিত মানে পৌঁছাতে পারছে না।
বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরাও মনে করেন, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি। প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ উন্নয়নে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
Manual3 Ad Code
স্থানীয় শিক্ষাবিদদের মতে, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, প্রধান শিক্ষক পদে দ্রুত নিয়োগ, আইসিটি শিক্ষক সৃষ্টি, আধুনিক ল্যাব সরঞ্জাম, স্মার্ট ক্লাসরুম, উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং প্রযুক্তিনির্ভর সহশিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিত করতে না পারলে অবকাঠামোর উন্নয়নও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
এই স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী ডা: শাহরিয়ার হোসেন বলেন, ঐতিহ্য, শতভাগ পাসের গৌরব, অসংখ্য কৃতী শিক্ষার্থীর জন্ম দেওয়া এই বিদ্যাপীঠ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আগামী দিনের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন আরও বড় বিনিয়োগ মানসম্মত শিক্ষক, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সময়োপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা। ঐতিহ্যের গৌরব ধরে রাখতে হলে এখন সেই পরিবর্তনের অপেক্ষাতেই পঞ্চখন্ড হরগোবিন্দ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়।