ইউপি নির্বাচন: ‘যদি’ ‘কিন্তু’তে বিলম্বিত হচ্ছে ইসির রোডম্যাপ
ইউপি নির্বাচন: ‘যদি’ ‘কিন্তু’তে বিলম্বিত হচ্ছে ইসির রোডম্যাপ
editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ১২:২২ অপরাহ্ণ
Manual6 Ad Code
Manual1 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
নভেম্বর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন শুরুর প্রাথমিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোলেও সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আপত্তিতে সেই পরিকল্পনা এখন অনিশ্চয়তার মুখে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে নভেম্বর-ডিসেম্বরে নির্বাচন না করে জানুয়ারি থেকে ভোট শুরু করার পরামর্শ এসেছে।
শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দিবস, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যস্ততা, সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির বিষয় সামনে এনে সচিবদের বড় অংশ এই মত দেন। ফলে নভেম্বর থেকে সাত ধাপে ভোট শুরুর প্রাথমিক রোডম্যাপ এখন পুনর্বিবেচনার পর্যায়ে। এদিকে গতকাল রবিবার নিজ দপ্তরে ইসি আব্দুর রহমানেল মাছউদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে শুরু হতে পারে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন।
নির্বাচন নভেম্বর থেকে জানুয়ারিতে সরে গেলে সময় কমবে; ধাপ কমানো বা ব্যবধান সংকুচিত করলে প্রশাসনিক চাপ বাড়বে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, আগামী বছরের ৬ জুনের আগে ইউপি নির্বাচন শেষ করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা একমত হয়েছেন। তবে ভোট শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। তিনি বলেন, নভেম্বর-ডিসেম্বরে পরীক্ষা থাকায় নির্বাচনের জন্য সময়ের সুযোগ কম। জানুয়ারিতে কিছুটা সময় পাওয়া গেলেও ফেব্রুয়ারির শুরুতে রমজান এবং এরপর এসএসসি পরীক্ষা রয়েছে। এসবের মধ্যে উপযুক্ত সময় বের করতে আরও সমন্বয় প্রয়োজন।
পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, ইসির সামনে এখন প্রশ্ন শুধু ভোট শুরু করা নয়; বরং জানুয়ারিতে শুরু হলে কত ধাপে, কোন তারিখে এবং কী ধরনের প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে নির্ধারিত ওই সময়ের মধ্যে নির্বাচন শেষ করা সম্ভব–সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ নভেম্বরের ‘যদি’ আর জানুয়ারির ‘কিন্তু’ পেরিয়ে ৬ জুনের সময়সীমায় পৌঁছাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সরকার-ইসির কার্যকর সমন্বয়ই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ইসির প্রাথমিক পরিকল্পনায় প্রথম ধাপ ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর এবং পরবর্তী ধাপগুলো ২০২৭ সালের ১৭ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২২ এপ্রিল ও ২৭ মে করার কথা বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে ইসি জানিয়েছিল, এগুলো চূড়ান্ত তফসিল নয়।
এ বিষয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকারও জানান, ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে। কিন্তু সেই সূচি এখন নতুন হিসাবের মুখে পড়েছে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় নভেম্বর-ডিসেম্বরকে নির্বাচনের জন্য অনুকূল মনে করছে না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা ও প্রস্তুতি, প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্ব এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও জাতীয়-আন্তর্জাতিক কর্মসূচির নিরাপত্তার বিষয় সামনে এসেছে। ফলে জানুয়ারিতে ভোট শুরু হলে একদিকে এসব বিষয় সমন্বয় করতে হবে, অন্যদিকে ৬ জুনের আগেই নির্বাচন শেষ করতে হবে।
৬ জুনের আগে নির্বাচন শেষ করার কঠিন চ্যালেঞ্জে ইসি
দেশে ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা ৪ হাজার ৫৮০। এর মধ্যে ৪ হাজার ২৭২টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ বিপুলসংখ্যক ইউপির নির্বাচন সাত ধাপে করার প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল ইসির। জানুয়ারিতে শুরু করলে হাতে থাকা সময় আরও কমে যাবে। প্রতিটি ধাপে মনোনয়নপত্র জমা, যাচাই-বাছাই, আপিল, প্রত্যাহার, প্রতীক বরাদ্দ, প্রচার ও ভোট গ্রহণের সময় রাখতে হবে। পাশাপাশি প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা নিয়োগ, ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত, নির্বাচনি সামগ্রী সরবরাহ, প্রশিক্ষণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন, পরিবহন এবং নিরাপত্তা পরিকল্পনাও করতে হবে। ফলে সময় কমানোর সঙ্গে প্রশাসনিক চাপও বাড়বে।
জানুয়ারিতে ভোট শুরু হলে ফেব্রুয়ারির শুরুতে রমজান, এরপর এসএসসি পরীক্ষা এবং ৬ জুনের আগে এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি–সব মিলিয়ে নির্বাচনের কার্যকর সময় সীমিত হয়ে আসতে পারে। ইসি কমিশনার সানাউল্লাহও বৈঠকের পর ভোটের সময় নিয়ে এই সংকটের কথা জানিয়েছেন। তাই সব ধাপ একই ব্যবধানে রাখা সম্ভব নাও হতে পারে। রমজান ও পরীক্ষার সময় বাদ দিয়ে নির্বাচনযোগ্য সময়কে কয়েকটি পর্বে ভাগ করতে হতে পারে। ফলে শুধু কখন ভোট নয়, কোন ধাপে কোন এলাকায় ভোট–সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তফসিল ঘোষণাতেও সময়ের চাপ
Manual1 Ad Code
ইউপি নির্বাচন ভোটের অন্তত ৪৫ দিন আগে তফসিল দেওয়ার প্রস্তুতির কথা ইসি জানিয়েছিল। জানুয়ারিতে প্রথম ধাপের ভোট নিতে হলে ডিসেম্বরের শুরুতেই তফসিল ঘোষণা করতে হবে। ডিসেম্বরেও পরীক্ষা ও জাতীয় কর্মসূচির ব্যস্ততা থাকলে তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতিতেও প্রশাসনিক সমন্বয় প্রয়োজন হবে। চলমান পরিস্থিতিতে কমিশনের পরবর্তী পরিকল্পনা জানতে চাইলে ইসি কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘আমরা আগেই বলেছি ঘোষিত সম্ভাব্য তারিখগুলো চূড়ান্ত নয় এবং আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মতামত নিয়ে আমরা শিগগিরই কমিশন সভায় বসব। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ভোটের পরবর্তী রোডম্যাপ এবং সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে।’
আগামী বছরের জানুয়ারিতে ভোট শুরু
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সিদ্ধান্ত এখনো নেয়নি ইসি। তবে চলতি বছরের ১২ নভেম্বর থেকে সাত ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করার প্রাথমিক পরিকল্পনা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ নভেম্বর-ডিসেম্বরে স্কুল-কলেজের পরীক্ষার কারণে, ভোটকেন্দ্র, শিক্ষকদের দায়িত্ব পালন ইত্যাদি বিবেচনায় রেখে ভোট করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া এর আগে ২৩, ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর রাজনৈতিক দলসহ অংশীজনদের সঙ্গে যে সংলাপের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেটিও বাতিল করেছে ইসি।
Manual1 Ad Code
প্রশাসন-আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বড় পরীক্ষা
Manual1 Ad Code
ইউপি নির্বাচন স্থানীয় পর্যায়ে বিস্তৃত ও ছড়ানো। ফলে কাছাকাছি সময়ে বেশি এলাকায় ভোট হলে মাঠ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চাপ বাড়বে। ১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে পুলিশের পক্ষ থেকে নভেম্বর-ডিসেম্বর এড়িয়ে জানুয়ারি থেকে নির্বাচন শুরুর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কর্মসূচির নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য দায়িত্বের বিষয়টি সেখানে উঠে আসে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও নির্বাচন আয়োজনের ব্যয় ও বাজেট সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। ফলে সময় কমলেও মাঠপর্যায়ের জনবল ও সক্ষমতা একই হারে বাড়বে না। তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনি আচরণবিধির কারণে সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নানা বিধিনিষেধ থাকে। দীর্ঘ সময় নির্বাচন চললে উন্নয়ন প্রকল্প ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব পড়তে পারে–এমন যুক্তিও বৈঠকে এসেছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পক্ষ থেকেও সরকারি কর্মসূচির সময়সূচির সঙ্গে নির্বাচন সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সমন্বয়েই সমাধান দেখছেন বিশ্লেষকরা
ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলীর মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হলেও বাস্তবে তা রাজনৈতিক প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। তাই নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সরকার ও ইসির মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। মাঠ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও স্থানীয় বাস্তবতার কারণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সহযোগিতাও জরুরি। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘এই সমন্বয় যেন সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বের কারণ না হয়। কারণ নভেম্বরের পরিকল্পনা থেকে সরে জানুয়ারিতে ভোট শুরু হলে ইসির হাতে থাকা সময় আরও সংকুচিত হবে।’
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট ইউনিয়ন পরিষদ বাদে দেশের ১২ সিটি করপোরেশন, ৬১ জেলা পরিষদ, ৪৯৫ উপজেলা পরিষদ ও ৩৩০ পৌরসভায় মোট ৮৯৮ জন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিত্বশীল কাঠামো পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে সামনে রয়েছে।
এ পর্যায়ে ইউপি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসির সামনে শুধু ভোটের দিনক্ষণ নির্ধারণ বড় পরীক্ষা নয়; বরং সীমিত সময়ের মধ্যে ৪ হাজার ২৭২টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনকে বাস্তবসম্মত ধাপে ভাগ করে সমন্বিত ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করা যায়–সেটিই আসল চ্যালেঞ্জ।