প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও। সফরের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে আলোচনা চললেও এখনও চূড়ান্ত হয়নি সিদ্ধান্ত। একদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণ, অন্যদিকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও দিল্লিতে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক তৎপরতার কারণে সফরটি সৌজন্য সফরের পর্যায়ে নেই। দুই দেশের সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে রেখে এ সফর।
Manual6 Ad Code
এদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল শুক্রবার আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে কোনো অগ্রগতি হলে তা জানানো হবে। তবে ভারতের গণমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে পরস্পরবিরোধী খবর। ভারতের এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী সপ্তাহের শেষার্ধে নয়াদিল্লি সফর করতে পারেন তারেক রহমান। দুই দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে এ নিয়ে কয়েক দিন ধরে নিবিড় আলোচনা চলছে এবং সম্ভাব্য সফরটি দুদিনের দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সেখানে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, পানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।
তবে একই সময়ে ভারতের দ্য ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের বিষয়ে অগ্রগতি না হলে তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেবেন না কিংবা ভারত সফরও করবেন না। এমনকি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সাক্ষাতে এ বার্তা দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশ সরকার প্রকাশ্যে এখনও সফরের বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, সরকার সফরের বিষয়ে ইতিবাচক, কিন্তু তারিখ বা দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। তার ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রীর সময়সূচি, দেশের অভ্যন্তরীণ কিছু সাংবিধানিক কাজ ও ঢাকা-দিল্লির আলোচনার অগ্রগতির ওপর সফরটি নির্ভর করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানও বলেছেন, সফর নিয়ে এখনও কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার গঠনের দিনই তারেক রহমানকে একটি চিঠি দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ দ্বিপক্ষীয় আমন্ত্রণটি আলাদা এবং ব্রিকস সম্মেলনের আমন্ত্রণটি আলাদা।
প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক। বলা হচ্ছে, ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে আঞ্চলিক জোটগুলোর প্রধানদের আমন্ত্রণ জানানোর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এই আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রের মতে, নির্বাচিত সরকারপ্রধানকে প্রটোকলগতভাবে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ার বিষয়টি ঢাকায় নেতিবাচকভাবে নেওয়া হয়েছে।
সম্ভাব্য সফরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। বর্তমান সরকারের কাছে এটি শুধু একটি আইনি বা কূটনৈতিক প্রশ্ন নয়; জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় গভীর জনআবেগের সঙ্গে যুক্ত এটি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি তোলা হয়েছে এবং বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত করার আহ্বান জানিয়েছে। একই আলোচনায় শহীদ ওসমান হাদির সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের বাংলাদেশে ফেরত দেওয়ার বিষয়টিও তোলা হয়েছে বলে তিনি জানান।
Manual5 Ad Code
অন্যদিকে বিরোধী দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন কাঠামো নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত তারেক রহমানের ভারত সফর করা উচিত নয়। বিরোধী দল জামায়াতও প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। এতে বোঝা যায়, সরকারের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ আছে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর সামনে একটি ভারসাম্যের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। খুব দ্রুত ভারত সফরে গেলে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো সেটিকে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার তাড়াহুড়ো হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে। আবার সফর অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দিলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রয়োজনীয় সংলাপ ব্যাহত হতে পারে এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক অনিশ্চয়তার দিকে যেতে পারে।
গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সংবাদ সম্মেলন দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে নতুন অস্বস্তি তৈরি করেছে বলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুর বাইরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের দীর্ঘদিনের বেশ কিছু অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত হত্যা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ঘাটতি, যোগাযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং সীমান্তে ‘পুশইন’ নিয়ে উদ্বেগ। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনারের সাক্ষাতে সীমান্ত হত্যা ও পুশইন প্রসঙ্গ সংক্ষেপে এসেছে। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, এগুলো প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনার বিষয় নয়; এসব নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় এসব ইস্যু প্রধানমন্ত্রীর সফরের আলোচনার বাইরে থাকবে এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং বাংলাদেশের জনগণের কাছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মূল্যায়ন অনেকাংশেই নির্ভর করে সীমান্তে প্রাণহানি কমানো, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভারসাম্য কতটা নিশ্চিত হচ্ছে তার ওপর।
বলা হচ্ছে, পানি বণ্টনের প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সীমান্ত নদীগুলোর পানি ব্যবস্থাপনা, তিস্তা চুক্তির অমীমাংসিত অবস্থা এবং অভিন্ন নদীর পানির হিস্যা নিয়ে প্রত্যাশা বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে গেলে এসব বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলে সফরের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে দুই দেশের সম্পর্ক কেবল বিরোধের তালিকায় আটকে থাকবে কি নাÑ এমন প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে। বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সংযোগে দুই দেশের স্বার্থ পরস্পরনির্ভর। সম্ভাব্য সফরে এসব বিষয় আলোচনার কেন্দ্রে আসতে পারে। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, পানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে সম্ভাব্য আলোচ্যসূচির অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে গিয়ে যেন জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নগুলোকে পাশ কাটানো না হয়। একইভাবে ভারতের জন্যও চ্যালেঞ্জ হবে বাংলাদেশকে আগের রাজনৈতিক সমীকরণে না দেখে একটি নতুন নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকা-দিল্লির সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়তো কোনো একক ইস্যু নয়; বরং পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি। বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক অংশের মধ্যে ভারতের ভূমিকা নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে দিল্লির দৃষ্টিতে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তাদের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেÑ এমন ধারণাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরকে শুধু ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সফর’ হিসেবে উপস্থাপন করলে বাস্তব পরিস্থিতি আড়াল হতে পারে। বরং এটি হতে পারে দুই দেশের মধ্যে নতুন সম্পর্কের শর্ত নির্ধারণের একটি সুযোগ।
বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন হবে স্পষ্ট অগ্রাধিকার নির্ধারণ। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধ, পুশইন বন্ধ, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাÑ এসব বিষয়ে একটি সমন্বিত কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে দিল্লির সঙ্গে আলোচনা করা। একই সঙ্গে ভারতকে বোঝাতে হবে যে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক কেবল একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক নয়; এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক।
Manual8 Ad Code
তারেক রহমান শেষ পর্যন্ত ভারত সফরে গেলে সেটি তার সরকারের পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে। সফরের সাফল্য শুধু যৌথ বিবৃতি বা সৌজন্য বৈঠকের সংখ্যায় মাপা যাবে না। বরং প্রশ্ন হবে সফর শেষে দুই দেশের সম্পর্কের বাস্তব কোনো অগ্রগতি হয়েছে কি না। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে যদি কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়, সীমান্তে উত্তেজনা কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, পানি নিয়ে আলোচনায় নতুন গতি আসে ও বাণিজ্য-জ্বালানি-যোগাযোগে নতুন উদ্যোগ ঘোষণা করা যায়, তাহলে সফরটি দুই দেশের সম্পর্কের মোড় ঘোরাতে পারে। আর যদি তেমনটা না হয়, তাহলে দেশের অভ্যন্তরে সমালোচনা বাড়তে পারে। বিশেষ করে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো এটিকে সরকারের কূটনৈতিক দুর্বলতা হিসেবে তুলে সুযোগ পাবে।
এ সফরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই দিল্লি নয়, একই সঙ্গে ঢাকা ও দিল্লিÑ দুই দিকের প্রত্যাশা সামলানো। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই সম্পর্ক যেন দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য না হয়ে ওঠে, সেটিও সরকারের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারেÑ সম্পর্ক ছিন্ন নয়, আবার অন্ধ সমঝোতাও নয়; বরং পারস্পরিক স্বার্থ ও মর্যাদার ভিত্তিতে নতুন সম্পর্কের কাঠামো তৈরি করা।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যেমন বলেছেন, সরকারপ্রধান পর্যায়ের আলোচনা অনেক জটিল সমস্যা সমাধানের সুযোগ তৈরি করে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে ঢাকাকে যেমন বাস্তববাদী হতে হবে, তেমনি দিল্লিকেও বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জনমতের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হবে। শেষ পর্যন্ত তারেক রহমানের ভারত সফর হবে কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। কিন্তু সফরটি হলে তার তাৎপর্য হবে অনেক বড়। এটি শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর নয়; বরং জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কোন ভিত্তির ওপর দাঁড়াবেÑ তার একটি প্রাথমিক পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় সফল হতে হলে উভয় পক্ষকেই পুরনো রাজনৈতিক সমীকরণের বাইরে এসে সমমর্যাদা, পারস্পরিক আস্থা এবং দৃশ্যমান জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নতুন অধ্যায় শুরু করতে হবে।