সাম্প্রতিক সময়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট পরিচালনায় একের পর এক কারিগরি ত্রুটি, দীর্ঘ বিলম্ব ও দুর্ভোগের কারণে যাত্রীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বিশেষ করে চলতি মাসের প্রথমদিকে কানাডার টরন্টো থেকে ঢাকায় আসার পথে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ইতালির রোমে বিমানের যাত্রীরা প্রায় ৪০ ঘণ্টা আটকে থেকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ও কষ্টের শিকার হন; যা সবাইকে উদ্বিগ্ন, ক্ষুব্ধ ও শঙ্কিত করে তুলেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এ ঘটনায় তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ১৬ আগস্ট নেপালের কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে কারিগরি ত্রুটির কারণে বিমানের একটি ফ্লাইটের ১২৭ যাত্রীকে প্রায় সাত ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। এর আগে সিলেট থেকে জেদ্দাগামী একটি ফ্লাইটও কারিগরি ত্রুটির কারণে ৮০০-এর বেশি ওমরাহযাত্রী নিয়ে বিপর্যয়ের শিকার হয়।
Manual8 Ad Code
বিজি ৩০৬ ফ্লাইট বিপর্যয়
Manual6 Ad Code
ইতালির রোমের লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি-ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে বিজি ৩০৬ ফ্লাইট বিপর্যয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস উচ্চপর্যায়ের চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছে। কমিটিকে দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ও পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
রোমের ঘটনায় শুধু ফ্লাইটের কারিগরি বিষয় নয়Ñ ক্রু, পাইলট, রোমের স্টেশন ম্যানেজার, কান্ট্রি ম্যানেজার এবং বাংলাদেশে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ফ্লাইট বিপর্যয় ও যাত্রীদের দুর্ভোগের কারণও অনুসন্ধান করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছেÑ এটি কি নিছক কারিগরি ত্রুটি, নাকি এর সঙ্গে ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের ঘাটতিও যুক্ত ছিল?
রোমের ঘটনায় তদন্তের পরিধি কতটা বিস্তৃত, তার একটি ইঙ্গিত মিলছে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্যে। সূত্র বলছে, বিমান নিজস্ব পরিসরে তদন্ত করবে, বেবিচক তাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগে বিষয়টি খতিয়ে দেখবে এবং মন্ত্রণালয় সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করবে। তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, রোমের ফ্লাইটে ১১ জন কেবিন ক্রু এবং তিনজন ককপিট ক্রু ও পাইলট ছিলেন এবং তাদেরও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। একই ঘটনায় গণমাধ্যমে ভুল তথ্যসংবলিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানোর অভিযোগে বিমানের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলামকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের আগে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
Manual3 Ad Code
‘আধুনিক উড়োজাহাজে এমন সমস্যা হওয়ার কথা নয়’
রোমের ঘটনায় তদন্তকারীরা আরও একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেনÑ বিমানের বহরে থাকা বোয়িং ৭৮৭-৯০০ উড়োজাহাজের মতো আধুনিক বিমানে এ ধরনের সমস্যা কেন হলো এবং ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর তা দ্রুত সমাধান করা গেল না কেন।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, বাংলাদেশ থেকে ইঞ্জিনিয়াররা রোমে যাওয়ার পর মাত্র ৪৫ মিনিটের মধ্যে সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হন। সূত্রটির বক্তব্য, রোমে থাকা ইঞ্জিনিয়াররা আগেই কাজ শুরু করলে ত্রুটি আরও কম সময়ে সমাধান করা সম্ভব ছিল। এমন প্রেক্ষাপটে কেন রোমের ইঞ্জিনিয়াররা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারেননি, সেটি তদন্তের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
কাঠমান্ডুতেও সাত ঘণ্টার বিপর্যয়
রোমের ঘটনা নিয়ে তদন্ত শুরু হওয়ার মধ্যেই গত ১৬ আগস্ট কাঠমান্ডুতে আরেকটি ঘটনা ঘটে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৭২ ফ্লাইটটির কাঠমান্ডু থেকে ঢাকার উদ্দেশে বিকাল ৪টায় উড্ডয়নের কথা ছিল। যাত্রীদের নিয়ে উড়োজাহাজটি টার্মিনাল এলাকা ছেড়ে রানওয়ের দিকে যাওয়ার সময় কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়ে। পরে উড়োজাহাজটি আবার টার্মিনালে ফিরিয়ে আনা হয় এবং ১২৭ যাত্রীকে নামিয়ে অপেক্ষায় রাখা হয়।
বিমান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ত্রুটি মেরামতে কত সময় লাগবে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব হয়নি। পরে যাত্রীদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে ঢাকা থেকে একটি বড় বিকল্প উড়োজাহাজ পাঠানো হয়। রাত ১০টার দিকে সেটি কাঠমান্ডুর উদ্দেশে রওনা হয় এবং রাত ১২টা ১০ মিনিটে যাত্রীদের নিয়ে ঢাকায় পৌঁছে।
অর্থাৎ যাত্রীদের শেষ পর্যন্ত দেশে ফেরানো গেলেও একটি ফ্লাইটের ত্রুটির কারণে শতাধিক যাত্রীকে দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে হয়েছে।
সিলেট-জেদ্দা রুটেও একই চিত্র
এর কয়েক দিন আগেই সিলেট থেকে জেদ্দাগামী বিমানের একটি ফ্লাইটে কারিগরি ত্রুটির কারণে প্রায় ২২ ঘণ্টার ফ্লাইট বিপর্যয় তৈরি হয়েছিল। সিলেট ও জেদ্দা মিলিয়ে আটশর বেশি যাত্রী এই বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েন। সিলেট থেকে জেদ্দাগামী বিজি-০২৩৫ ফ্লাইটে প্রায় ৪০১ জন যাত্রী ছিলেন। একই উড়োজাহাজ দিয়ে জেদ্দা থেকে ফিরতি ফ্লাইট পরিচালনার কথা থাকায় সেখানে আরও চারশর বেশি যাত্রী আটকা পড়েন। যাত্রীদের অভিযোগ, ফ্লাইট বিলম্ব সম্পর্কে বিমান সময়মতো পর্যাপ্ত তথ্য দেয়নি। যাত্রীদের অভিযোগ, এমনকি বিমানের ওয়েবসাইটেও ফ্লাইটটিকে ‘অন টাইম’ দেখানো হচ্ছিল। ফলে অনেকে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পাননি। শুধু সময়ের ক্ষতি নয়, জেদ্দায় আটকে থাকা যাত্রীদের হোটেল ও খাবারের মান নিয়েও অভিযোগ ওঠে। অর্থাৎ কারিগরি ত্রুটির পর দ্বিতীয় সংকট তৈরি হয়েছে যাত্রী ব্যবস্থাপনায়।
প্রশ্ন উঠছে সমন্বয় নিয়ে
রোমের ঘটনা সম্পর্কে বিমান বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বিমান চাইলে পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে সামাল দিতে পারত।’ তার মতে, ‘সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। যাত্রীদের দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা বা হোটেলের ব্যবস্থা আগে করা গেলে সংকট এতটা বড় হতো না।’ তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘শুধু তদন্ত কমিটি করলেই হবে না; তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে একই ধরনের ঘটনা আবার না ঘটে।’
প্রশ্ন এখন তদন্তের ফল নিয়ে
বিমানের জনসংযোগ বিভাগের মহাপরিচালক মহিউদ্দিন আহম্মেদ বলেছেন, ‘প্রতিটি ঘটনার পর বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়। রোমের ঘটনাও তদন্ত করা হচ্ছে। কেউ দোষী বা দায়িত্বে অবহেলা করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, অতীতের এসব তদন্ত থেকে কী শিক্ষা নেওয়া হয়েছে?
বিশেজ্ঞরা বলছেন, কারিগরি ত্রুটি উড়োজাহাজ পরিচালনার একটি বাস্তব ঝুঁকি। বিশ্বের কোনো এয়ারলাইনই যান্ত্রিক ত্রুটি থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। কিন্তু ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর কত দ্রুত তা শনাক্ত করা হচ্ছে, কত সময়ে মেরামত হচ্ছে, বিকল্প উড়োজাহাজ কত দ্রুত পাঠানো হচ্ছে, যাত্রীদের কীভাবে তথ্য দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের থাকার-খাওয়ার ব্যবস্থা কতটা মানসম্মত হচ্ছেÑ এগুলো একটি এয়ারলাইনের ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে তাই শুধু ‘কারিগরি ত্রুটি’ কথাটি ব্যবহার করে দায় শেষ করার সুযোগ নেই।