বিএনপি সরকারের আট মাসের মাথায় বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে পতিত আওয়ামী লীগের যোগসাজশের অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, একটি পক্ষ দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে উদ্বেগের পাশাপাশি সরকারের অবস্থান ও বিরোধী জোটের আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিএনপির নেতারা বলছেন, দলটির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক সরকারকে সতর্ক থেকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার পরামর্শ দিয়েছেন। গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য সুব্রত চৌধুরীও আতঙ্কিত না হয়ে দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
Manual3 Ad Code
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। ১৭ ফেব্রুয়ারি দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের বিরোধিতা ও আন্দোলন কর্মসূচির মুখে পড়েছে ক্ষমতাসীন দল। বর্তমানে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট রাজপথে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। বিভিন্ন জেলা ও বিভাগে লংমার্চসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের দাবি তুলে ধরছে বিরোধী দলগুলো।
Manual7 Ad Code
জামায়াতের নেতারা বিভিন্ন সভা-সমাবেশে সংসদ ও সংসদের বাইরে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সরকারের বিরুদ্ধে এক দফার আন্দোলন ঘোষণার কথাও জানিয়েছেন তারা। এ পরিস্থিতিতে বিরোধী জোটের আন্দোলন কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা নিয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নেতারা জানিয়েছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বিএনপির বিরুদ্ধে একটি গোষ্ঠী সব সময় ষড়যন্ত্র করছে। তার অভিযোগ, বিএনপি সরকার গঠনের পর পতিত স্বৈরাচারের সঙ্গে আঁতাত করে একটি গোষ্ঠী নতুনভাবে মাঠে নামছে। দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে এই ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করা হবে বলেও জানান তিনি।
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। এ সময় বিভিন্ন সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি পতিত স্বৈরাচারী শক্তি ও বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে সম্ভাব্য যোগসাজশের অভিযোগ তোলেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি পক্ষ দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে দেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। রাজনৈতিক বিভাজন ও সংঘাতের পরিবর্তে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী জোটের আন্দোলন, সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান এবং পতিত আওয়ামী লীগকে ঘিরে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক মেরুকরণÑ সব মিলিয়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রী গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার বিষয়।
সাইফুল হকের অভিযোগ, জামায়াতে ইসলামী ষড়যন্ত্র করছে এবং সীমান্তের ওপার থেকে পতিত স্বৈরাচার অর্থায়নের মাধ্যমে অশুভ আঁতাত ও নানা ষড়যন্ত্রে যুক্ত রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের সতর্ক থাকা এবং প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে তা মোকাবিলা করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
Manual8 Ad Code
বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলারও পরামর্শ দেন সাইফুল হক। তিনি বলেন, ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। তার মতে, দেশের মানুষ সেই অভিজ্ঞতা ভুলে যায়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতেও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ মোকাবিলায় উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
Manual3 Ad Code
একই বিষয়ে গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য সুব্রত চৌধুরীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু এ তথ্য জানিয়েছেন, তাই বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে আতঙ্কিত হওয়ারও কিছু নেই।
সুব্রত চৌধুরীর মতে, সীমান্তের ওপারে অবস্থান করে পতিত স্বৈরাচার সরকার খুব বেশি কিছু করতে পারবে না। এ পরিস্থিতিতে বিএনপি ও সরকারকে আতঙ্কিত না হয়ে দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রসঙ্গও সামনে আসছে। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে জামায়াতে ইসলামী। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগও একই দাবিতে আন্দোলনে অংশ নেয়। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত বিএনপি সরকারও অল্প সময়ের মধ্যে পদত্যাগ করে। পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে।