স্টাফ রিপোর্টার:
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সাম্প্রতিক হামলার কঠোর জবাব দিতে শুরু করেছে ইরান। তবে তেহরানের এই পাল্টা হামলার ব্যাপ্তি এবার কেবল ইসরাইলের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে একযোগে হামলা চালিয়েছে তারা। বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরবের পাশাপাশি ইরানের বিধ্বংসী আক্রমণের শিকার হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। আবুধাবিতে প্রাণ হারিয়েছেন একজন ব্যক্তি। এই সামরিক পদক্ষেপের পর বিশ্লেষকদের মাঝে এখন বড় প্রশ্ন, কেন আরব দেশগুলোর মধ্যে আমিরাতকে এত গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ্যবস্তু বানালো ইরান?
Manual3 Ad Code
এই বৈরিতার নেপথ্য কারণ খুঁজতে ফিরতে হবে ২০২০ সালে। সেই বছরের সেপ্টেম্বরে ঐতিহাসিক ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’ স্বাক্ষরের মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক বরফ গলিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন। যদিও উপসাগরীয় দেশগুলো আগে থেকেই অনানুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত, তবে এই চুক্তির মাধ্যমে তা প্রকাশ্য রূপ পায়। বিশেষ করে ২০১৫ সালে আবুধাবিতে ইসরায়েলের প্রথম কূটনৈতিক মিশন খোলার পর থেকেই দুই দেশের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে, যা মূলত ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব ঠেকানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখেছে তেহরান।
Manual8 Ad Code
বাণিজ্যিক ও সামরিক ক্ষেত্রে আমিরাত-ইসরায়েল অংশীদারিত্ব বর্তমানে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। বর্তমানে তুরস্কের পর মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার আরব আমিরাত। ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় এক হাজার ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান আমিরাতে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে ইরানের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুই দেশের ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতা। যৌথ নৌ মহড়া থেকে শুরু করে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় এবং নতুন অস্ত্র তৈরিতে আমিরাত ও ইসরাইলের এই জোটবদ্ধ অবস্থানকে নিজেদের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে ইরান।
বিশ্লেষকদের মতে, আমিরাতের এসব পদক্ষেপ ইরানকে দমানোর একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। তেহরান মনে করে, ইসরায়েলকে এই অঞ্চলে জায়গা করে দিয়ে আমিরাত প্রকারান্তরে ইরানের বিরুদ্ধে একটি ফ্রন্ট তৈরি করেছে। সবশেষ মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার পর আমিরাতে সরাসরি হামলার মাধ্যমে ইরান এই বার্তাই দিতে চাইল যে, ইসরাইলের সঙ্গে যেকোনো ধরনের নিরাপত্তা সহযোগিতা এখন থেকে সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি বহন করবে।
বহু বছর ধরে নিজেকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা দেশটি এখন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আতঙ্কে। পরিস্থিতি দ্রুত এক সর্বাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে আন্তর্জাতিক মহলে।
মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাত এবার সরাসরি সংঘাতের কেন্দ্রে। ইরানের পাল্টা হামলায় রাজধানী আবুধাবি কেঁপে উঠেছে একাধিক বিস্ফোরণে।
ইরানের শক্তিশালী সামরিক শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। বিশেষ করে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত স্থাপনাগুলোকেই নিশানা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলা কেবল সামরিক নয়, বরং একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি যেসব দেশে রয়েছে, তাদের প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা দিতে চাইছে তেহরান। ইরান জানিয়ে দিচ্ছে, কূটনৈতিক সম্পর্ক বা অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব কোনো দেশকে সুরক্ষা দেবে না, যদি তারা মার্কিন সামরিক অবকাঠামোকে আশ্রয় দেয়।
গত কয়েক বছর ধরে আমিরাত একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগী, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার কৌশল নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান হামলার পর সেই ভারসাম্য ভেঙে পড়েছে।
Manual5 Ad Code
হামলার পরপরই আমিরাতের আকাশপথে জারি হয় জরুরি সতর্কতা। একাধিক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ট্রানজিট হাব হিসেবে পরিচিত দেশটির বিমান চলাচল খাত বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে।
আঞ্চলিক শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তেলের দামে ওঠানামা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব পড়তে পারে।