চোখের পলকে গায়েব হয়ে যাচ্ছে জীবনের সব সঞ্চয়। কখনও মাত্র ১৬ মিনিটের একটি ফোনকল, কখনও প্রতিদিন ২০টি ছবিতে ক্লিকের প্রলোভন, আবার কখনও হাতের মোবাইল ফোনে ঘাপটি মেরে থাকা সর্বনাশা জুয়ার অ্যাপ। ঘুম থেকে উঠে কেউ দেখছেন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফাঁকা, কেউবা হারাচ্ছেন নিজের ব্যবসা, সংসার, এমনকি অমূল্য জীবনও।
কৌশল বদলে প্রতিনিয়ত নতুন রূপ নিচ্ছে সাইবার প্রতারণা। একসময় ধারণা করা হতো, কেবল প্রযুক্তি-অজ্ঞ মানুষই এসব ফাঁদে পড়ে। কিন্তু এখন শিক্ষিত, পেশাজীবী, সাংবাদিক, গৃহবধূ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীÑ সমাজের সব শ্রেণির মানুষই এই ডিজিটাল ডাকাতদের শিকারে পরিণত হচ্ছে। মানুষের ভয়, লোভ ও অসচেতনতাকে পুঁজি করে চক্রগুলো হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
হঠাৎ পেমেন্ট এবং কথার মারপ্যাঁচে তথ্যদান
রাজধানীর এক প্রভাবশালী করপোরেট গ্রুপের মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বে থাকা শফিক (ছদ্মনাম)। এক দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। মোবাইলের স্ক্রিনে ভাসছে একটি মেসেজÑ বিকাশ থেকে ১৮ হাজার টাকা পেমেন্ট করা হয়েছে! অথচ তিনি নিজে এমন কোনো লেনদেন করেননি। আতঙ্কের এখানেই শেষ নয়; কিছুক্ষণ পর ডাচ-বাংলা ব্যাংকের হেড অফিসের পরিচয়ে ফোন করে তার কাছে কিছু গোপন তথ্য চাওয়া হয়। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে তিনি দ্রুত ব্যাংকের নবাবপুর শাখায় কল দিয়ে অ্যাকাউন্টটি ফ্রিজ করেন। তিনি বলেন, ‘তাৎক্ষণিকভাবে যদি ব্যাংকে কল দিয়ে অ্যাকাউন্ট বন্ধ না করতাম, হয়তো ব্যাংক থেকেও সব টাকা তুলে নিত প্রতারক চক্র।’
একইভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছেন এক বেসরকারি অনলাইন পোর্টালের সাংবাদিক। নিজেকে ‘বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর’ পরিচয় দিয়ে তাকে ফোন করা হয়। তাকে বলা হয়, তার নম্বর ব্যবহার করে একটি মামলা হয়েছে। ১৬ মিনিটের সেই দীর্ঘ ফোনালাপে কথার মারপ্যাঁচে ফেলে ভেরিফিকেশন কোড বা ওটিপি হাতিয়ে নেয় প্রতারক চক্র। মুহূর্তেই বিকাশ অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন তিনি।
ক্লিকের ফাঁদ
প্রযুক্তি-সচেতন শহুরে মানুষই শুধু নয়, গ্রামের সাধারণ মানুষও এখন সাইবার প্রতারণার বড় শিকার। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কলেজ রোড এলাকার রুমি এর জ্বলন্ত উদাহরণ। পরিচিত একজনের মাধ্যমে তিনি ‘আইএফওয়াই’ নামের একটি অ্যাপের সন্ধান পান। প্রলোভন ছিল খুবই সাধারণÑ প্রতিদিন মাত্র ২০টি ছবিতে ক্লিক করলেই ৫২০ টাকা আয়! তবে শর্ত হলো, অ্যাকাউন্টে ২ হাজার ৫০০ টাকা জমা না হওয়া পর্যন্ত কোনো অর্থ তোলা যাবে না। বান্ধবীর কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা ধার করে বিনিয়োগ করেন রুমি। প্রথম মাসে ১০ হাজার টাকা তুলতে পারায় তার বিশ্বাস আরও গাঢ় হয়। কিন্তু এরপরই হঠাৎ অ্যাকাউন্ট ‘ডিজেবল’ হয়ে যায়, আটকে যায় বাকি সব টাকা। রুমি হতাশার সুরে বলেন, ‘আমাদের এলাকার প্রায় প্রতি ঘরেই কেউ না কেউ এই অ্যাপে জড়িয়ে পড়েছিল।’ মূলত রেফারেল বোনাস বা একজনকে যুক্ত করলে ১ হাজার ৬০০ টাকা বোনাস পাওয়ার লোভেই পুরো গ্রামে মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছিল এই ভুয়া অ্যাপ।
Manual5 Ad Code
রামেশ্বরপুরে জুয়ার নেশায় ঝরল জীবনও
সাইবার প্রতারণার সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতির গল্পটি বগুড়ার গাবতলীর রামেশ্বরপুরের মারুফা বেগমের। তার স্বামী শাহিনুল ইসলাম ছিলেন বিকাশ-নগদের এজেন্ট, পরে শুরু করেছিলেন গ্যাস সিলিন্ডার ও চুলার ব্যবসা। ২০২৩ সালের দিকে তিনি একটি অনলাইন জুয়ার অ্যাপের নেশায় বুঁদ হন। দোকানে বসে সারা দিন কী যেন খেলতেন, কাউকে কিছু বলতেন না। একসময় সর্বস্বান্ত হয়ে দোকান বিক্রি করে দেন। জুয়ার নেশায় তার ঘাড়ে চাপে প্রায় ৫০ লাখ টাকার বিশাল ঋণ। বাধ্য হয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন স্ত্রী মারুফা। পরিবারের সহায়তায় শাহিনুলকে সৌদি আরবে পাঠানো হলেও সেখানে ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি তিনি। চরম মানসিক চাপে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয় তার। আর্থিক সংকটে তার মরদেহটিও দেশে আনা সম্ভব হয়নি। মারুফ বেগম এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘দুই সন্তান নিয়ে আমি এখন মহাবিপদে আছি। সব শেষ হয়ে গেছে আমাদের।’
Manual7 Ad Code
নতুন প্রযুক্তি, নতুন শঙ্কা
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ করার শর্তে স্বীকার করেছেন, প্রতারকরা এখন আরও ভয়ংকর সব কৌশল অবলম্বন করছে। এর মধ্যে রয়েছেÑ দূর থেকে ভুক্তভোগীর ফোনের স্ক্রিন নিয়ন্ত্রণ করা; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে পরিবারের সদস্যদের কণ্ঠস্বর হুবহু নকল করে মুক্তিপণ বা জরুরি টাকা দাবি করা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগের নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া। ওই কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ে ভয় দেখিয়ে ওটিপি বা পিন নম্বর নেওয়া; ‘ক্লিক করে আয়’ বা ‘লাইক দিয়ে আয়’ ধরনের অ্যাপে শুরুতে সামান্য লাভ দিয়ে আস্থা অর্জন করে পরে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করিয়ে চম্পট দেওয়া এবং অনলাইন জুয়ায় আসক্ত করে ধীরে ধীরে নিঃস্ব করে ফেলার মতো সাইবার অপরাধ বাড়ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগের (দক্ষিণ) উপপুলিশ কমিশনার তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘সন্দেহজনক ওয়েবসাইট বা অ্যাপের তথ্য পেলেই আমরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নিই। অভিযোগ পেলে তো অবশ্যই আমরা অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করি। আমরা অভিযোগের তদন্ত করি, অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠাই।’
Manual8 Ad Code
তবে সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের সভাপতি কাজী মুস্তাফিজ প্রতিরোধকেই মূল হাতিয়ার মানছেন। তিনি বলেন, ‘ইন্টারনেটে কোনো আকর্ষণীয় অফার বা লোভনীয় প্রস্তাব দেখলেই বিশ্বাস করা যাবে না। আগে থামতে হবে, তথ্য যাচাই করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু প্রতিনিয়ত নতুন কৌশলে অপরাধ হচ্ছে, তাই সরকারিভাবে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো জরুরি।