স্পোর্টস ডেস্ক:
আটলান্টিকের পাড়ে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের এই রাতগুলোকে এখন বড্ড কুহকী, খুব বেশি নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে। প্রতিদিনের সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে এখানে লেখা হচ্ছে একেকটি স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস; প্রতিটি রাত এখানে আসছে কোটি কোটি ফুটবল রোমান্টিকের হৃদয় ভাঙার মহাকাব্য হয়ে। নিউ জার্সিতে নেইমারের কান্নায় ভিজেছে বিশ্বকাপ, আর আজ তেমনই এক মেঘাতুর সময়ে আটলান্টায় মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছেন কাছাকাছি বয়সের দুই ক্লান্ত অথচ পরম শ্রদ্ধেয় রাজপুত্র– লিওনেল মেসি ও মোহামেদ সালাহ।
একজন ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ‘গোট’, অন্যজন মিসরের মরুভূমি থেকে উঠে আসা আধুনিক ফুটবলের এক অনন্য ফারাও। ২০২৬-এর এই মঞ্চে মেসি এসেছেন তাঁর জীবনের শেষ নৃত্যটি সম্পূর্ণ করতে। অন্যদিকে, কায়রোর রাজা মোহামেদ সালাহ তাঁর পিরামিডের সমস্ত শক্তি আর আরব্য উপন্যাসের মায়া নিয়ে তৈরি হয়েছেন বিশ্বচ্যাম্পিয়নের রাজকীয় রথ থামিয়ে দিতে। সমর্থকদের জন্য এই ম্যাচটি স্রেফ একটা লড়াই নয়; এ হলো দুই সমসাময়িক কিংবদন্তির শেষবারের মতো একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার এক নির্মম আস্ফালন। নকআউটের এই হিসাব বড় সোজা– একজনের জাদুকরি হাসির আড়ালে আজ লুকিয়ে থাকবে অন্যজনের বিদায়ের অশ্রুসজল দীর্ঘশ্বাস।
Manual3 Ad Code
অতীত বলে, দুজনে এর আগে কখনোই জাতীয় দলের জার্সিতে এক অপরের মুখোমুখি হননি। তবে দুবার একই পিচে পা রেখেছিলেন। আর সেই দুটো লড়াই-ই ছিল উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ব্লকবাস্টার নাটক! প্রথম দেখা হয়েছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। সেদিন সালাহ খেলতেন রোমার জার্সিতে আর মেসি বার্সেলোনায়। রোমের অলিম্পিকো স্টেডিয়ামের সেই গ্রুপ পর্বের ম্যাচটি ১-১ গোলে অমীমাংসিতভাবে শেষ হয়েছিল। কিন্তু আসল মহানাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল প্রায় সাড়ে তিন বছর পর, ২০১৯ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেই সেমিফাইনালের প্রথম লেগে। ক্যাম্প ন্যুর চেনা আঙিনায় মেসি সেদিন রীতিমতো অতিমানবীয় রূপ ধারণ করেছিলেন। সালাহর লিভারপুলকে একাই ছিটকে দিয়ে মেসি করেছিলেন জোড়া গোল, যার মধ্যে ছিল সেই অবিশ্বাস্য ফ্রিকিক! বার্সেলোনা জিতেছিল ৩-০ ব্যবধানে। যদিও ফুটবল রোমান্টিকদের মনে একটা বড় আফসোস থেকে গেছে।
Manual1 Ad Code
এনফিল্ডের সেই ঐতিহাসিক দ্বিতীয় লেগের ম্যাচে, যেখানে লিভারপুল ৪-০ গোলে জিতে রূপকথা তৈরি করেছিল, ইনজুরির কারণে সালাহ সেদিন মাঠেই নামতে পারেননি! ফলে মেসির বিরুদ্ধে মাঠের লড়াইয়ে সালাহর ব্যক্তিগত জয় এখনও অধরাই রয়ে গেছে। ক্লাব ফুটবলের সেই অসমাপ্ত হিসাব মেটাতেই কি আজ আটলান্টায় মুখোমুখি হচ্ছেন ৩৯ আর ৩৪ বছরের দুই সমসাময়িক রাজা?
Manual8 Ad Code
অস্ট্রেলিয়াকে সেদিন টাইব্রেকারে হারিয়ে যখন মিসরের ফারাওরা ইতিহাস গড়ল, মিক্সড জোনে মোহামেদ সালাহকে সাংবাদিকরা চেপে ধরেছিলেন এক নিষ্ঠুর প্রশ্ন নিয়ে– কপালের সামনে তো এবার লিওনেল মেসি! নিজের শেষ ‘লাস্ট ড্যান্স’-এ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো নাকি নেইমার, কার মুখোমুখি হতে চান? সালাহ কিন্তু এক সেকেন্ডও দ্বিধা করেননি। বুক চিতিয়ে ইজিপশিয়ান কিং বলে দিলেন– ‘মেসি!’ আসলে মেসির বিপক্ষে মাঠে নামার এক প্রবল জেদ চেপে আছে সালাহর মধ্যে। এবারের বিশ্বকাপে দুজনেই নিজ নিজ সাম্রাজ্যকে টেনে নিয়ে চলেছেন প্রায় অতিমানবীয় দক্ষতায়। ৩৯ বছর বয়সের ওই বুড়ো হাড়ের ভেলকিতে লিওনেল মেসি এই বয়সেও আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের প্রধান সলতে। সাত-সাতটি গোল করেছেন তিনি একাই। আলবিসেলেস্তেদের জন্য অবোধ্য সব গোলের রাস্তা খুলে দিচ্ছেন তিনি।
অন্যদিকে, ৩৪ বছরের মোহামেদ সালাহ মিসরের ফারাও সাম্রাজ্যের একক সেনাপতি। গতি আর ড্রিবলিংয়ের সেই চেনা আরব্য উপন্যাসের মায়ায় সালাহ এবার কার্যত একা হাতে মিসরকে টেনে তুলেছেন নকআউটের এই অগ্নিগর্ভ মঞ্চে। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের কোমরের হাড় ভেঙে বক্সে ঢুকে পড়ার সেই আদিম ক্ষুধা সালাহর খেলায় এখনও তীব্র। মেসি যেখানে পুরো দলকে একটা ছন্দে বেঁধে খেলানোর শান্ত জাদুকর, সালাহ সেখানে একাই প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে কালবৈশাখী তোলার এক দুর্দান্ত ঝোড়ো হাওয়া। গ্রুপ পর্বের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানে ঐতিহাসিক জয়ের রাতে মিসরের হয়ে এই একমাত্র গোলটি করেছিলেন তিনি। তবে গোল মাত্র একটি করলেও সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রে তিনি অনন্য ভূমিকা রাখছেন।
Manual4 Ad Code
৩৯ বনাম ৩৪-এর এই পারফরম্যান্সের লড়াইটা আসলে দুই ভিন্ন ঘরানার ফুটবলের মহাদ্বৈরথ। একজন খেলছেন মগজের দাবা খেলায় নিজের শেষ রাজমুকুটটা ধরে রাখতে, আর অন্যজন লড়ছেন পায়ের গতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সিংহাসনটা কেড়ে নিতে। আটলান্টার রাতে এই দুই জাদুর মধ্যে কার জাদু শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে, সেটাই এখন দেখার প্রতীক্ষায় আরেকটি রাত।