বৃহস্পতিবার রাত ১টা। বিয়ানীবাজার উপজেলার প্রবেশদ্বার আলীনগর ইউনিয়নের জায়গীরদার মসজিদের সামনে রাস্তার দু’পাশে কিছু তরুণের জটলা। তবে সবাই শৃংখলিত। ৫-৬ জনের একটি দল মোবাইলের স্ক্রীনে মত্ত। রাত পৌনে ২টা, বিয়ানীবাজারের শেষপ্রান্ত বারইগ্রাম বাজারেও ৪-৫টি ব্যবসা প্রতিষ্টানকে ঘিরে স্থানীয় লোকজন আড্ডা দিচ্ছেন। কথাবার্তায় মনে হল সবার বাড়ি আশপাশে। এতরাতে বাড়ি যাননি কেন, জানতে চাইলে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক যুবক জানালেন- বৃষ্টি হচ্ছে, তাই বাড়ি ফিরতে পারছিনা।
বিয়ানীবাজার উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রধান সড়কের প্রতিদিনের নিয়মিত চিত্র এমনই। এরমধ্যে বৃষ্টির গর্জন, বিদ্যুতের আসাযাওয়া, বিদঘুটে অন্ধকার আর মশার ঘেনঘেন আছেই। কষ্টের বিষয়, রাতের বিয়ানীবাজার শহরে দেখার কিছু নেই। জ্বলেনা নিয়ন আলোর বাতি, সন্ধ্যে রাতের হলদে বাতির আলো ঝলকানি কখনো দেখা যায়।
Manual3 Ad Code
Manual4 Ad Code
এই জনপদের গ্রামীন পরিবেশও রাতজাগা। এ উপজেলার তরুণ-যুবকদের কাছে রাতের নীরবতা যেন এক অদ্ভুত ভালোবাসা নিয়ে আসে। দিনের সকল কোলাহল, দৌড়ঝাঁপ থেমে গেলে রাত জেগে থাকে হাজারো অনুভূতির সাথী হয়ে। তরুণদের এসব রাতজাগা-আড্ডাবাজি নিয়ে মাঝেমধ্যে কিছু অভিযোগ আসে।
বিয়ানীবাজার পৌরশহরও থাকে জমজমাট। হাসপাতালের আশপাশ, নয়াগ্রাম রোড, মোকাম মসজিদ রোড, ফতেহপুর পয়েন্ট, দাসগ্রাম, লাসাইতলায় গভীররাত অবধি দলবেধে থাকে তরুণরা। সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনায় রাতজাগা শহরের বিষয়টি অনেকের মনে নেতিবাচক প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। শুক্রবার রাতে আলিশা সেন্টারে অনৈতিকতার অভিযোগে ধরা পড়ে ২ নারীসহ ৩ তরুণ। এ ঘটনায় বাড়ির মালিক-কেয়ারটেকার পালিয়ে গেছেন। মাথিউরা ইউনিয়নের সাবেক এক ইউপি সদস্যের নামও ওঠে আসে অনৈতিকতার শেল্টারদাতা হিসেবে। খাসায় ক্লুলেস সুনীল আচার্য হত্যা রহস্য এখনো উদঘাটন হয়নি। বৃহস্পতিবার রাতে তিনিও নিখোঁজ হন। পৌরশহরের সুপাতলা এলাকায় একটি কমিউনিটি সেন্টারে চোর সন্দেহ করে একাধিক যুবককে গণপিটুনি দেয়া হয়। এতে দুবাগ ইউনিয়নের মেওয়া গ্রামের মানষিক প্রতিবন্ধি এক যুবকও পিটুনির শিকার হন। পঞ্চখন্ড হরগোবিন্দ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পশ্চিম দিকের অন্ধকার অংশেও নানা অপরাধ সংগঠিত হয়।
Manual2 Ad Code
রাতজাগা জনপদ বিয়ানীবাজারে দূর থেকে ভেসে আসে কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাক। মাঝে মাঝে পুলিশকে গাড়ি নিয়ে টহল দিতে দেখা যায়। কোথাও দেখা মিলে পাহারাদারের। গ্রামীণ এলাকায় বেশীরভাগ গ্রামের প্রায় একইচিত্র। বিয়ানীবাজারে তরুণদের বেশির ভাগ এখন রাত জাগেন। কেউবা রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটান। প্রয়োজন বা অপ্রয়োজনে এই অভ্যাসটা শরীরের জন্য ভালো নয়। অনেকের কাছেই রাত শুরু হয় রাত ১২টার পর। তারা ঘুমাতে যান ভোরবেলা। আল্লাহ তাআলা রাতকে বিশ্রাম গ্রহণ এবং দিনকে জীবিকা উপার্জনের সময় হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। রাত জাগলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়, হৃদরোগের ঝুঁকি দেখা যায়। নিদ্রাহীন রাতের কারণে সকাল ১১টার আগে পৌরশহর প্রায় জনশূণ্য থাকে। পিএইচজি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক কবির আহমদ বলেন, সড়কের মোড়ে, রাস্তাঘাটে কিংবা মার্কেটের সামনে আড্ডা দিয়ে সুফল পাওয়া যায় না। অহেতুক আড্ডা দিলে মানুষের মনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়।
বিয়ানীবাজার উপজেলা সুজন সভাপতি এডভোকেট মো. আমান উদ্দিন বলেন, তরুণদের এই প্রবণতার পেছনে রয়েছে নিজেকে জাহির করার প্রবণতা, কর্মসংস্থানের অভাব, সময়ের সদ্ব্যবহারে অনীহা এবং আধুনিক প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব। আবার অনেক সময় অভিভাবক পর্যায়ে নজরদারির ঘাটতির জন্য এই পরিস্থিতিকে ঘনীভূত করেছে।
বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আশরাফ উজ্জামান বলেন, এখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলনামুলক ভালো বলেই রাতের বিয়ানীবাজার জেগে থাকতে পারছে। দুই-একটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছাড়া গত কয়েকমাসে উপজেলায় বড় ধরনের কোন ঘটনা ঘটেনি। মানুষ ঘরে-বাইরে নিজেকে নিরাপদ ভাবছে। এরপরও আড্ডার আড়ালে অপরাধ সংঘটিত যাতে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখছি।