সিলেট বিমানবন্দর ও দুর্গম সীমান্তে পাচারকারীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট
সিলেট বিমানবন্দর ও দুর্গম সীমান্তে পাচারকারীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট
editor
প্রকাশিত মার্চ ২৭, ২০২৬, ০৭:৩০ পূর্বাহ্ণ
Manual4 Ad Code
স্টাফ রিপোর্টার:
সিলেট বিভাগের সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের সীমান্ত এলাকা আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের শক্তিশালী ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দফায় দফায় অভিযান, সচেতনতামূলক সভা এবং কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও থামছে না পাচার। বর্তমানে সিলেট বিভাগীয় মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে ৪৫০টিরও বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তবে সাক্ষীর অভাবে অপরাধীদের সাজার হার ১ শতাংশেরও নিচে।
সিলেট বিমানবন্দর ও দুর্গম সীমান্ত এলাকাগুলোকে কেন্দ্র করে পাচারকারীরা অনেক শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে।
Manual5 Ad Code
পরিসংখ্যান বলছে, গত ৩ বছরে সিলেট বিভাগ থেকে প্রায় ২২০০ জনকে পাচার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৩০ জন উদ্ধার হয়েছে। আর পাচারে জড়িত ৩১০ জন গ্রেফতার হয়েছে। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, জকিগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও বিয়ানীবাজার সীমান্ত দিয়ে মূলত পার্শ্ববর্তী দেশে নারী ও শিশু পাচার হয়। ওসমানী বিমানবন্দর ব্যবহার করে ‘ভিজিট ভিসা’র আড়ালে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে কর্মী পাচার হয়।
পাচার সিন্ডিকেটগুলোতে প্রভাবশালী ব্যক্তি থেকে শুরু করে অসাধু সরকারি কর্মকর্তা রয়েছেন। এই নেটওয়ার্কের মূল হোতা হিসাবে সাবেক সংসদ সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নাম উঠে এসেছে। তাকে গ্রেফতারের পর মঙ্গলবার রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। মাসুদের সঙ্গে সিলেটে তৎপর পাচার নেটওয়ার্কের অন্য নেপথ্য কারিগরদের নামও উচ্চারিত হচ্ছে। সিলেটের বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ ও দক্ষিণ সুরমা এলাকায় তাদের আস্তানা।
পাচারবিরোধী কাজে নিয়োজিত সূত্র বলছে, জেনারেল মাসুদের মালিকানাধীন ‘ফাইভ স্টার এন্টারপ্রাইজ’র আড়ালে সিলেটের জিন্দাবাজার ও বন্দরবাজার এলাকার অন্তত ১২টি ট্রাভেল এজেন্সি সাব-এজেন্ট হিসাবে কাজ করে। তাদের প্রতারণায় হাজার হাজার বিদেশগামী কর্মী নিঃস্ব হয়েছেন। জেনারেল মাসুদের নেটওয়ার্কটি মূলত ‘রিক্রুটিং এজেন্সি’র আড়ালে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক পাচার করে। প্রত্যেকের কাছ থেকে নেওয়া হয় ৫-৭ লাখ টাকা।
তদন্তে নিয়োজিতদের তালিকায় মাসুদের পরই বিয়ানীবাজারের বাসিন্দা এবং বিমান কর্মকর্তা মিজানুর রহমান শিশিরের নাম রয়েছে। তিনি গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর ওসমানী বিমানবন্দরে ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ সিন্ডিকেট ও জাল নথিপত্রে ইউরোপ পাচারের অভিযোগে গোয়েন্দা জালে আটকা পড়েন। এছাড়া উঠে এসেছে তার সহযোগী কৃষ্ণ সুধার নামও।
সিন্ডিকেটের তৃতীয় ব্যক্তি জিন্দাবাজারের ‘ইউরো বাংলা ট্রাভেলস’র মালিক শিপন আহমেদ। তাকে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে পোল্যান্ড ও পর্তুগালের ভুয়া ভিসা দেওয়ার নামে কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে সিলেট সদর থেকে গ্রেফতার করা হয়।
Manual1 Ad Code
লিবিয়া-ইতালি রুটের ‘গেম ঘর’ পরিচালনার অভিযোগে মাওলানা আব্দুল আজিজকে ২০২৪ সালের মে মাসে দক্ষিণ সুরমা থেকে গ্রেফতার করে র্যাব-৯। তিনি মূলত জকিগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জের যুবকদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের কারিগর ছিলেন। জকিগঞ্জ সীমান্তের শীর্ষ পাচারকারী হিসাবে রয়েছে লুৎফুর রহমান ও জহিরুল ইসলামের নাম। তারা ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর নারী ও শিশু পাচারের সময় হাতেনাতে আটক হন।
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট এলাকার আবুল হোসেন পাচার চক্রের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী হিসাবে পরিচিত। ২০২৫ সেপ্টেম্বরে ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্তের জয়নাল আবেদিন সীমান্ত পারাপার ও পাচারের কারিগর। তিনি ফেব্রুয়ারিতে গ্রেফতার হন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, বিয়ানীবাজারের শিপু আহমদ এই সিন্ডিকেটের মাঠপর্যায়ের দালাল। একাধিক গোপন প্রতিবেদনে তার নাম রয়েছে।
গত বছরের ৯ জুলাই লিবিয়ার মাফিয়াদের হাত থেকে উদ্ধার হওয়া মতিউর রহমান সাগর, তানজির শেখ ও আলমগীর হোসেন এসব দালালদের মাধ্যমেই বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। দালালের প্রলোভনে পড়ে তারা সর্বস্ব খুইয়েছেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে সিলেটের গোলাপগঞ্জের আহমেদ রাজু ও ফাহিম আহমদের মৃত্যু হয়।
Manual8 Ad Code
এবার ঈদের ছুটিতে (গত ৯ দিনে) সিলেট সীমান্তে নারী-পুরুষ ও শিশুসহ ২৪ জন আটক হয়েছে। পুলিশ বলছে, জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট সীমান্ত ঘিরে সক্রিয় কয়েকটি চক্র নারীদের কাজের প্রলোভন দিয়ে ভারতে পাচার করছে। এর মধ্যে রোববার পাচারকারী চক্রের ২ সদস্যকে আটক করে পুলিশ। এর আগে শুক্রবার প্রতাপপুর সীমান্ত দিয়ে দুই তরুণীকে পাচারের সময় একজনকে আটক করে বিজিবি। এরও আগে ১৪ মার্চ দুজনকে আটক করে র্যাব।
গোয়েন্দা ও বাংলাদেশ ব্যাংক ইন্টেলিজেন্স ইউনিট সূত্র জানায়, মানব পাচার করে অর্জিত বিশাল অঙ্কের টাকা হুন্ডির মাধ্যমে দুবাই ও মালয়েশিয়ায় পাচার হয়। সিলেট নগরীর অনিবন্ধিত ট্রাভেল এজেন্সিগুলো এই প্রক্রিয়ায় জড়িত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কঠোর আইন থাকলেও জেনারেল মাসুদের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় থাকায় এবং স্থানীয় দালালদের নেটওয়ার্ক ছিন্ন করতে না পারায় পাচার বন্ধ করা যাচ্ছে না।জেলা সংবাদ
Manual4 Ad Code
এ ব্যাপারে সিলেটের পুলিশ কমিশনার মো. আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, ‘সিলেট প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল। এখানের বেশ কয়েকটি পাচার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান, গ্রেফতার ও মামলা হয়েছে। এ ব্যাপারে আমরা সতর্ক রয়েছি।’