দেশে একদিকে বাড়ছে ডিগ্রিধারীর সংখ্যা, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ সেই হারে বাড়ছে না। প্রতি বছর ৬ লাখের বেশি তরুণ উচ্চশিক্ষা শেষ করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। এরই মধ্যে দেশে বেকার গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজারে। সর্বশেষ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ছিল ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ, যা দেশের সব শিক্ষাগত স্তরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে দেশের সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
অথচ দেশে সরকারি চাকরিতেই ৫ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি শূন্য পদ রয়েছে। গত ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের অনুমোদিত মোট ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ২৭২টি পদের মধ্যে ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০টি পদে কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। বাকি ৫ লক্ষাধিক পদ বছরের পর বছর শূন্য থাকায় একদিকে সরকারি সেবা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে লাখ লাখ তরুণ বেকার ঘুরছেন। সরকারি বিভিন্ন দপ্তর বা মন্ত্রণালয়ে কোথাও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর পরীক্ষা হচ্ছে না, কোথাও পরীক্ষা হলেও নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ হচ্ছে না, আবার কোথাও অনুমোদিত পদ থাকলেও নিয়োগের উদ্যোগ নিতে দীর্ঘ সময় লাগছে। ফলে চাকরির বাজারে প্রবেশের অপেক্ষাও দীর্ঘ হচ্ছে তরুণদের।
আবার শুধু ‘চাকরি কম’ বিষয়টি এত সরল নয়। সমস্যা হলো, একদিকে দ্রুত বাড়ছে উচ্চশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা, অন্যদিকে পর্যাপ্ত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না; আবার যে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, তার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার সঙ্গেও অনেক গ্র্যাজুয়েটের যোগ্যতার মিল থাকছে না। ফলে ৪ বছর বা তার বেশি সময় পড়াশোনা শেষে পাওয়া সনদ কাউকে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের নিশ্চয়তা দেয় না। বিপরীতে নিয়োগদাতারাও প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়েন।
Manual2 Ad Code
বেকার গ্র্যাজুয়েট ৮ লাখ ৮৫ হাজার : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের শ্রমশক্তির জরিপ অনুসারে, ২০২৪ সালে দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ছিল ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার ছিলেন গ্র্যাজুয়েট। অর্থাৎ, মোট বেকারের বড় একটি অংশই উচ্চশিক্ষিত। শিক্ষাগত যোগ্যতা যত বাড়ছে, বেকারত্বের হারও তত বাড়ছে শ্রমবাজারের এই বৈপরীত্যই এখন বড় উদ্বেগের কারণ। ২০২৪ সালে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের হার ছিল ১ দশমিক ২৫ শতাংশ। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্নকারী ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ, মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্নকারী ২ দশমিক ৯১ শতাংশ, উচ্চমাধ্যমিকে ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষিতদের ক্ষেত্রে ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অর্থাৎ, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করলেও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা মিলছে না; বরং শিক্ষিতদের একটি বড় অংশের জন্য ডিগ্রি শেষ হওয়ার পর শুরু হচ্ছে দীর্ঘ চাকরির অপেক্ষা। বিবিএসের একই জরিপে দেখা যায়, ২০২৪ সালে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গ্র্যাজুয়েট ২ বছর পর্যন্ত বেকার ছিলেন। আবার এক-ষষ্ঠাংশের বেশি গ্র্যাজুয়েট ২ বছরেরও বেশি সময় চাকরির বাইরে ছিলেন।
Manual7 Ad Code
বছরে ৬ লাখের বেশি নতুন গ্র্যাজুয়েট : শ্রমবাজারের এই সংকট আরও প্রকট হওয়ার কারণ প্রতি বছর উচ্চশিক্ষা শেষ করে বিপুলসংখ্যক তরুণের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ। বিশ্বব্যাংকের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে বাংলাদেশে প্রতি বছর সাড়ে ৬ লাখের বেশি উচ্চশিক্ষিত গ্র্যাজুয়েট শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। ২০১৯ সালের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে সংস্থাটি জানিয়েছে, গ্র্যাজুয়েশনের এক থেকে দুই বছর পরও অর্ধেকের কম গ্র্যাজুয়েট কর্মসংস্থানে যেতে পারে। ফলে প্রতি বছর নতুন করে চাকরিপ্রত্যাশীর সারিতে যুক্ত হচ্ছে লাখ লাখ তরুণ। বিদ্যমান বেকারদের বড় অংশের কর্মসংস্থান না হওয়ার আগেই নতুন চাকারিপ্রার্থীরা সেই সারি আরও দীর্ঘ করছে।
সনদ বাড়ছে, দক্ষতা কতটা : দেশে লাখ লাখ উচ্চশিক্ষিত তরুণ বেকার, অন্যদিকে শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মীর অভাব। বাংলাদেশের শ্রমবাজারে এই বৈপরীত্যের অন্যতম কারণ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে বড় ধরনের দক্ষতা-ঘাটতি। উচ্চশিক্ষার বড় অংশ এখনো বিষয়ভিত্তিক তাত্ত্বিক জ্ঞান ও পরীক্ষানির্ভর শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ, প্রযুক্তি ব্যবহার ও শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষতায় ঘাটতি আছে। বাংলাদেশের প্রশিক্ষিত শ্রমশক্তির চাহিদা রয়েছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ইউরোপের শ্রমবাজারে। আমরা উচ্চশিক্ষার সঙ্গে ভাষা, প্রযুক্তি, কারিগরি ও পেশাগত দক্ষতা যুক্ত করতে পারে, তাহলে শুধু দেশের চাকরির বাজার নয়, বৈশি^ক শ্রমবাজারের জন্যও বড় জনশক্তি তৈরি করা সম্ভব।
সমস্যা তাই শুধু ‘চাকরি কম’ তা নয়। একদিকে ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে বাজারের প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি হচ্ছে না। প্রতি বছর নতুন বিশ্ববিদ্যালয় ও একই ধরনের প্রচলিত বিষয় বাড়ানোর পাশাপাশি কোন খাতে কত জনবল প্রয়োজন, সেই চাহিদার সঙ্গে উচ্চশিক্ষার আসন ও বিষয় পরিকল্পনার সমন্বয় না হলে ডিগ্রির সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু কর্মসংস্থানের সংকট দূর হবে না।
রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান মো. নাসের শাহরিয়ার জাহেদী বলেন, দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকার যেমন আছেন, তেমনি দক্ষ কর্মীর সংকটও আছে। আমাদের যেসব জনবলের চাহিদা, তা অধিকাংশ গ্রাজুয়েটদের মধ্যে নেই। একজন গ্র্যাজুয়েট যদি একটি ই-মেইল লিখতে না পারেন কিংবা বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে দর-কষাকষি করতে না পারেন, তাহলে তাকে কীভাবে চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হবে?
ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা-শিল্প সহযোগিতা ইউনিট স্থাপন এবং শিল্প খাতের সঙ্গে পদ্ধতিগত কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। শিক্ষা ও শিল্প খাতের সহযোগিতায় সরকারের চারটি প্রধান উদ্দেশ্য রয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা; শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞদের অতিথি শিক্ষক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদানে যুক্ত করা; কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠ্যক্রম প্রণয়নে শিল্প-প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া; বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবনলব্ধ জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে শিল্পায়নে প্রয়োগ করা।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় সংকট : দেশের উচ্চশিক্ষার বড় অংশ পরিচালিত হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর মাধ্যমে। ফলে কর্মসংস্থানের সংকটের বড় চাপও পড়ছে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ওপর। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশ বেকার থাকে। নারী গ্র্যাজুয়েটদের ক্ষেত্রে হার ছিল ৩৪ দশমিক ৩১ শতাংশ, পুরুষদের ক্ষেত্রে ১৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। গবেষণাটির ফলাফল উচ্চশিক্ষা ও চাকরির বাজারের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধানকে নতুন করে সামনে এনেছে। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ থেকে সনদ পাওয়ার পরও কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সুযোগের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
শূন্য পদ আছে, নিয়োগ নেই : চাকরিপ্রত্যাশীর সংখ্যা বাড়লেও সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ৫ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি পদ খালি পড়ে আছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে ৫ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগ’র বিষয়ে অন্যান্য মন্ত্রণালয়/বিভাগের নিয়োগের সর্বশেষ অবস্থা এবং শূন্য পদে নিয়োগের তথ্য প্রেরণের জন্য মন্ত্রণালয় হতে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া দ্রুততম সময়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও শূন্য পদের বিপরীতে নিয়োগের বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য সব মন্ত্রণালয়/বিভাগকে অনুরোধ করা হয়েছে।
Manual2 Ad Code
তাহলে সমাধান কোথায়? অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ দেওয়া জরুরি হলেও এটিকে বেকারত্ব সমাধানের প্রধান কৌশল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ সরকারি চাকরি মোট কর্মসংস্থানের একটি সীমিত অংশ। দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সবগুলো ক্ষেত্রেই কাজ করতে হবে। উচ্চশিক্ষার বিষয় নির্বাচন ও আসনসংখ্যার সঙ্গে শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ চাহিদারও সমন্বয় প্রয়োজন। শিক্ষাবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, শুধু ডিগ্রি দেওয়ার মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে ব্যবহারিক শিক্ষা, ইন্টার্নশিপ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ বাড়াতে হবে।