প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৯ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

আমেরিকায় সিলেটের সাবেক পুলিশ সুপারের হাজার কোটি টাকার সম্পদ

editor
প্রকাশিত এপ্রিল ১, ২০২৬, ০৫:১৬ পূর্বাহ্ণ
আমেরিকায় সিলেটের সাবেক পুলিশ সুপারের হাজার কোটি টাকার সম্পদ

Manual7 Ad Code

নিউজ ডেস্ক:
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা নুরুল আলম নুরু হত্যার ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও বিচারের মুখ দেখেনি এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে এই হত্যার নেপথ্যের পরিকল্পনা, পেশাদারি কায়দায় অপহরণ এবং নির্মম হত্যার বিবরণ উঠে এসেছে। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের অভিযোগ- চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফ্যাসিস্ট এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী এই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা হলেও তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে পারেনি প্রশাসন। পরিবার ও বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, ফজলে করিমের নির্দেশে নুরুকে হত্যা করা তিন পুলিশ কর্মকর্তা চট্টগ্রামের তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) নূরে আলম মিনা, রাউজান থানার সাবেক ওসি কেফায়েত উল্লাহ ও উপপরিদর্শক (এসআই) জাবেদের বিচার হয়নি।

Manual5 Ad Code

২০১৭ সালের ২৯ মার্চ, রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে চট্টগ্রামের চকবাজার থানাধীন চন্দনপুরা এলাকায় নিজ বাসায় ঘুমিয়ে ছিলেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম নুরু। রাউজান থানার এসআই জাবেদ হঠাৎ তার বাসায় এসে তাকে তুলে নিয়ে যায়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর সরাসরি নির্দেশে রাউজান থানার ওসি কেফায়েত উল্লাহ এই অপারেশনে নেতৃত্ব দেন। নুরুর ভাগ্নে রাশেদুল ইসলাম বাসার দরজা খোলার পর, ঘুমন্ত অবস্থায় নুরুকে বিছানা থেকে টেনে তুলে হাতকড়া পরান এসআই জাবেদ। পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু নুরুর পরিবারের লোকজন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখতে চাইলে তিনি দেখাতে পারেননি।

সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাসে করে প্রথমে নুরুকে নেওয়া হয় রাউজানের নোয়াপাড়া কলেজ ক্যাম্পাসে, যেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ক্যাডাররা। সেখান থেকে তাকে আরেকটি গাড়িতে তুলে নেওয়া হয় নোয়াপাড়া পুলিশ ক্যাম্পে। সেখানেই কাপড় দিয়ে চোখ-মুখ বেঁধে, রশি দিয়ে হাত বেঁধে শুরু হয় ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতন। দীর্ঘ নির্যাতনের একপর্যায়ে নুরুর মাথায় গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। পরে তার লাশ ফেলে যাওয়া হয় রাউজান উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের খেলারঘাট এলাকায়, কর্ণফুলী নদীর তীরে। পরদিন ৩০ মার্চ সকালে পুলিশ সেখান থেকে নুরুর মরদেহ উদ্ধার করে।

Manual7 Ad Code

নুরুর স্ত্রী সুমি আক্তার দীর্ঘদিনের চেষ্টা ও সংগ্রামের পর, ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন তৎকালীন সংসদ সদস্য ফজলে করিম, রাউজান থানার সাবেক ওসি কেফায়েত উল্লাহ, এসআই জাবেদ, নোয়াপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক ইনচার্জসহ মোট ১৭ জন। তবে মামলা দায়েরের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মামলার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। উল্টো নুরু হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকা অভিযুক্তদের কয়েকজনকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে, যা ন্যায়বিচারপ্রত্যাশী পরিবারটির জন্য আরও বেদনাদায়ক বলে জানিয়েছেন সুমি আক্তার।

Manual2 Ad Code

নুরু হত্যার সঙ্গে জড়িত সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের হাতে গ্রেপ্তার হন। এর পর থেকে জুলাই হত্যার একাধিক মামলায় কারাগারে রয়েছেন। চট্টগ্রামের তৎকালীন এসপি নূরে আলম মিনা পলাতক রয়েছেন। সর্বশেষ রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমিতে কর্মরত থাকাকালীন ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়েই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় পরবর্তীতে সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) নূরে আলমকে গত বছরের ১ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে বরখাস্ত করে। সেই থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী মিনা চাকরিরত অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার নাগরিক ছিলেন, সেই সুবাদে সেখানে গড়ে তুলেছেন হাজার কোটি টাকার সম্পদের পাহাড়।

জানা গেছে, মিনা ভারত হয়ে আমেরিকায় পালিয়ে গেছেন। রাউজানের তৎকালীন ওসি মোহাম্মদ কেফায়েত উল্লাহ বর্তমানে কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। অন্যদিকে এসআই শেখ মো. জাবেদ বর্তমানে কোথায় চাকরিরত, সেই তথ্য পাওয়া যায়নি।

খোঁজ নিয়ে নুরুর স্ত্রী সুমি জানতে পারেন, বাসা থেকে গ্রেপ্তারের পর রাত ৩টায় নোয়াপাড়া কলেজ ক্যাম্পাসে নিয়ে যাওয়া হয় নুরুকে। সেখানে নাইলনের রশি দিয়ে তার চোখ, মুখ ও হাত বেঁধে নির্যাতন করে পুলিশ। পরে কোনো একসময় তাকে গুলি করে হত্যা করার পর বাগওয়ান ইউনিয়নের খেলারঘাট এলাকায় কর্ণফুলী নদীর তীরে মরদেহ ফেলে দেওয়া হয়। পরদিন স্থানীয় লোকজনের কাছে খবর পেয়ে নিহতের আত্মীয়-স্বজনরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি শনাক্ত করেন। ওই দিন বিকেলে রাউজান থানা পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। ৩১ মার্চ মরদেহটি দাফন করা হয়। এ ঘটনায় ৩১ মার্চ রাতে রাউজান থানায় উপপরিদর্শক কামাল হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন।

পুলিশ মামলা করার দুই দিন পর ওই বছরের ৩ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-অপরাধ) বরাবর মামলার তদন্ত করতে অপারগতা প্রকাশ করে একটি চিঠি পাঠানো হয়। সে সময় রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কেফায়েত উল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, মামলাটি পিবিআইকে তদন্ত করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পিবিআই মামলার কোনো সাক্ষী না থাকায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করলে আদালত তা আমলে নিয়েছেন। যদিও পরিবারের দাবি ভিন্ন। তারা বলছেন, সাক্ষীর অভাবে শেষ হচ্ছে না নুরু হত্যার বিচার। নুরু হত্যা মামলাটির কোনো সাক্ষী না থাকার কারণে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সাক্ষীর কারণে অনেকটা শেষ হয়েও শেষ হচ্ছে না এই আলোচিত মামলার বিচারকাজ।

রাউজান উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফিরোজ আহমেদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘দ্রুত বিচারকাজ সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০১৭ সালেই নুরু গুম হওয়ার পরপরই ডিআইজি ও এসপিকে ফোন করে তাকে খুঁজে বের করার অনুরোধ করেছিলেন, তবুও জীবিত নুরুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। রাউজান বিএনপির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের দাবি, দ্রুত নুরু হত্যার বিচার করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হোক।’

Manual8 Ad Code

চট্টগ্রামের রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনা ২০১৭ সালের। আদালতে বিচারাধীন বিষয়ে থানা পুলিশ শুধু আসামি গ্রেপ্তারে ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা বর্তমানে রাউজান এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মামলার তদন্ত এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দায়িত্ব পালন করছি।’

রাউজানের তৎকালীন ওসি মোহাম্মদ কেফায়েত উল্লাহ বর্তমানে কক্সবাজার জেলা ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। কেফায়েতের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। শেখ মো. জাবেদের হদিস পাওয়া যায়নি। নূরে আলম মিনা পলাতক থাকায় বক্তব্য জানা যায়নি।

মিনার বিদেশে হাজার কোটি টাকার সম্পদ: ২০২৪ সালের আগস্টের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বেশ কয়েক মাস কর্মস্থলে থাকার পর, একাধিক মামলা হওয়ায় গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে চলে যান মিনা। ভারত সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সে দেশের গোয়েন্দাদের সহায়তায় আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছেন। মিনা চাকরিকালীন সময়ে আমেরিকায় বিপুল সম্পদ গড়েছেন। সেখানে তার হাজার কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। আগে থেকেই পরিবারের সদস্যরা সেই সম্পদ ভোগ করছেন।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, মিনা চাকরিরত অবস্থায় আমেরিকায় যাওয়ার অনুমোদন না পেলেও কৌশলে ভারতে যাওয়ার অনুমতি নিতে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করতেন। পরবর্তীতে বিদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে আমেরিকায় চলে যেতেন, ছুটি কাটিয়ে আবারও বিদেশি পাসপোর্টে ভারতে ফিরতেন। সেখান থেকে বাংলাদেশি পাসপোর্টে দেশে ফিরতেন। স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ায় পুলিশ সদর দপ্তর বিষয়টি অবগত হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ সিন্ডিকেটের সদস্য এই মিনা হুন্ডির মাধ্যমে আমেরিকায় হাজার কোটি টাকা পাচারসহ সেখানে গাড়ি-বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্রয় করে পরিবারসহ বসবাস করছেন।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code