স্টাফ রিপোর্টার:
এতদিন জল্পনা ছিল। রুটটি শুধু পশুর নয়, মানুষেরও। পাচারের জন্য ‘তীর্থস্থান’। কিন্তু প্রমাণ মেলেনি। এখন প্রমাণিত। সিলেটের জৈন্তাপুরের পশুর চোরাই রুটে মানব পাচার হয়। পাচারকারীদের মধ্যে বিরোধ। আর ওই বিরোধে ঘটনাটি প্রকাশ্যে এসেছে। সিলেটের পশু চোরাকারবারিদের স্বর্গরাজ্য বলা হয় জৈন্তাপুর সদরকে।
সন্ধ্যা নামলেই সীমান্ত পথ গলিয়ে অবাধে ঢুকে ভারতীয় গরু ও মহিষ। এমনকি সীমান্তে পশু বেচাবিক্রির হাটও বসে। যুগ যুগ ধরে চোরাকারবারিরা এ রুট ব্যবহার করছে। প্রশাসনের আছে নাটকীয়তা। কখনো জোরালো অভিযান আবার কখনো ঢিলে পরিবেশ। সব মিলিয়ে রুটটি আগের মতোই চলছিল।
Manual1 Ad Code
এই রুটে মানব পাচারের দৃশ্য আগে ছিল অচেনা। কিন্তু গতকাল একসঙ্গে শিশু সহ ১২ বাংলাদেশি আটকের ঘটনায় মানব পাচারের বিষয়টি সামনে এসেছে।
বেলা তখন দুইটা। উপজেলা কম্পাউন্ডের কাছাকাছি উজানীনগর। চোরাকারবারি করিম আহমদ ওরফে ব্যান্ডিজ করিমের তিনতলা বাসা। ঘেরাও করে আছে স্থানীয় জনতা। খবর যায় পুলিশের কাছে। পুলিশ এসে ওই বাসার নিচ তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে এক শিশু সহ ১২ জন নারী-পুরুষকে আটক করে। এরা সবাই বাংলাদেশের সাতক্ষীরা সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নাগরিক। কাজের সন্ধানে বিভিন্ন সময় তারা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাড়ি জমিয়েছিল। ওদের জীবনে নানা ঘটনা। কেউ কেউ বন্দি হয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটিয়েছে। আবার অনেকেই কাজে গিয়ে ফিরে আসতে পারেনি।
বাসা ঘেরাওকালে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন- চোরাকারবারি ব্যান্ডিজ করিম ও আব্দুল্লাহ’র সহযোগিতায় ওই বাসাকে মানব পাচারের ট্রানজিট স্থান হিসেবে ব্যবহার করছিল মানব পাচারকারী হানিফ আহমদ। তার বাড়িও সীমান্তের ডিবির হাওরে। গতকাল ভোররাতে হানিফের তত্ত্বাবধানে ওই নাগরিকদের ভারত থেকে ডিবির হাওর দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে জৈন্তাপুরে। এরপর তাদের রাখা হয়েছে করিম আহমদের মালিকানাধীন ওই বাসায়। জৈন্তাপুর থানা পুলিশ গিয়ে তাদের আটক করে থানায় নিয়ে আসে।
Manual1 Ad Code
ওসি মাহবুবুর রহমান মোল্লা জানিয়েছেন- ওরা ভারত থেকে চোরাই পথে জৈন্তাপুর আসায় তাদের জনতা আটক করে পুলিশে দিয়েছে।
তিনি বলেন- ফেরত আসা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। তারা কাজের সন্ধানে ভারত পাড়ি জমিয়েছিল। দালাল মারফত তারা জৈন্তাপুরে ঢুকেছে। ঘটনাটি নিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে বলে জানান তিনি।
জৈন্তাপুর সদরের স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন- যারা সদরের কয়েকটি সীমান্ত পথ চোরাই রুট হিসেবে ব্যবহার করেন তারাই মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত। গণ-অভ্যুত্থানের পর ওই রুটে দলে দলে লোকজনকে ভারত পাঠানো হয়েছে। এমনকি ঢাকার কয়েকজন রাজনীতিককেও টাকার বিনিময়ে ভারত পাচার করে হানিফ আহমদ। সে মূলত ক্যারিয়ার হিসেবে কাজ করে। তাদের শেল্টার দেয় চোরাকারবারি চক্র। এ জন্য অভিযোগের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে করিম আহমদ ওরফে ব্যান্ডিজ করিম ও তার ব্যবসায়ীক পার্টনার আব্দুল্লাহকে। তবে ওই অভিযোগকে অস্বীকার করে আব্দুল্লাহ জানিয়েছেন- মানব পাচারের সঙ্গে হানিফ আহমদ জড়িত।
কয়েক মাস আগে তারা হানিফের ব্যাপারে উড়ো খবর পেয়েছিলেন। তখন সত্যতা মেলেনি। হানিফের বাড়ি যেহেতু ডিবির হাওরে সে মানব পাচারের রুট হিসেবে ওই স্থান ব্যবহার করছে বলে শুনেছেন।
Manual4 Ad Code
গতকালের ঘটনা সম্পর্কে মো. আব্দুল্লাহ বলেন- মাউথআটি গ্রামের ফারহান ও মুন্নার নেতৃত্বে করিমের বাসা ঘেরাও করা হয়েছিল। ওই ফারহান ও মুন্নার বিরুদ্ধেও মানব পাচারের অভিযোগ এলাকার মানুষের মুখে মুখে রয়েছে। মূলত হানিফের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জের ধরে তারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। এর সঙ্গে তিনি কিংবা করিম আহমদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে এ ঘটনাটি জানলেও জানতে পারে করিম আহমদের ভাই আব্দুল কাদির।
ওই বাসার একটি ফ্ল্যাটে আব্দুল কাদির বসবাস করে। করিম আহমদ বর্তমানে চিকিৎসার জন্য ভারতের আসাম রাজ্যের গৌহাটিতে রয়েছেন বলে জানান আব্দুল্লাহ।
এদিকে; ঘটনার সময় ফারহান ও মুন্না সাংবাদিকদের জানিয়েছেন- হানিফের সঙ্গে মানব পাচারে একটি চক্র রয়েছে। জৈন্তাপুর বাজারে রয়েছে তাদের একাধিক বাসা ও বিশাল সম্পত্তি। ওরা এখন নিজেদের রক্ষা করতে তাদের ওপর দোষ দিচ্ছে।
Manual2 Ad Code
এলাকার লোকজন জানিয়েছেন- ৫ আগস্টের পর বিএসএফ বাংলাদেশের এ সীমান্ত দিয়ে একাধিকবার পুশইন করেছে। কয়েক মাস ধরে পুশইন বন্ধ থাকায় গ্রেপ্তার এড়াতে লোকজন দালাল মারফত জৈন্তাপুরে এসে নিজ বাড়িতে চলে যায়। ফলে দেশে আসা লোকজন আইনি ঝামেলা থেকে দূরে থাকতে পারেন।