নোয়াখালীর চাটখিলের বাসিন্দা ইয়াসিন হামিদ। জীবিকার তাগিদে ২০২৫ সালের মার্চে পাড়ি জমান মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে। সেখানে থাকা এক নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে তিনি সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়ে একটি ‘ফ্রি ভিসা’ কেনেন। এরপর অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে মোট পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে যান।
ইয়াসিনকে এই অভিবাসনের ব্যয় সামলানোর জন্য ঋণ করতে হয় প্রায় দুই লাখ টাকা। পাশাপাশি জমি বিক্রি করে জোগান দেন বাকি তিন লাখের। এখন বিদেশ যাওয়ার পর এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মোট ব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি টাকা এখনো তুলতে পারেননি তিনি।
কাতার থেকে মোবাইল ফোনে ইয়াসিন বলেন, ‘এখানে আসার পর মাসে এক হাজার রিয়াল (বর্তমানে এক কাতারি রিয়াল সমান ৩৩ দশমিক ৭ টাকা) বেতন দিচ্ছে। এর বাইরে কোনো আয় নেই আমার। থাকা-খাওয়া মিলিয়ে মাসে খরচ ৫০০ রিয়াল। চলতি বছরের ইকামা (থাকা ও কাজের অনুমতিপত্র) করতে খরচ হয়েছে এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা। জীবনযাপনের খরচ ও ইকামার টাকা শেষে সামান্য কিছু থাকে, যা আমি দেশে পাঠাতে পারি।’
শুধু ইয়াসিন নন, বিদেশে অধিকাংশ বাংলাদেশি কর্মীর পরিস্থিতিই এমন। জীবনমানের উন্নতির চেয়ে বরং অভিবাসন ব্যয় তুলতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। যে ঋণ করে বিদেশ যাচ্ছেন, সেই ব্যয় তোলার আগেই অনেকে অবৈধ হয়ে দেশে ফিরছেন। ফলে দেশে এসেও ঋণের বোঝা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের।
Manual7 Ad Code
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) শ্রমশক্তি জরিপ (এলএফএস) তথ্যের ভিত্তিতে গত বছর পরিচালিত ‘কস্ট অব মাইগ্রেশন’ গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে ২০২২ সালে একজন শ্রমিকের গড় অভিবাসন ব্যয় ছিল তিন লাখ ৮৬ হাজার টাকা। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় চার লাখ ১৭ হাজার টাকা এবং ২০২৪ সালে চার লাখ ৬৩ হাজার টাকায় পৌঁছায়। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে অভিবাসন ব্যয় ২১ শতাংশ বেড়েছে। যদিও মূল্যস্ফীতির প্রভাব বিবেচনায় প্রকৃত ব্যয় তিন লাখ ৮০ হাজার টাকার কাছাকাছি স্থির রয়েছে।
Manual5 Ad Code
গবেষণার তথ্যমতে, একজন বাংলাদেশি শ্রমিককে বিদেশে যাওয়ার খরচ তুলতে গড়ে ১০ দশমিক ২ মাসের আয় ব্যয় করতে হয়। যেখানে ফিলিপাইনের কর্মীদের একই খরচ তুলতে লাগে মাত্র ১ দশমিক ১ থেকে ১ দশমিক ৪ মাস।
আইএলও বলছে, স্বল্প ব্যয়ে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ ক্রমেই কমে যাচ্ছে এবং শ্রম অভিবাসন সাধারণ মানুষের জন্য কম প্রবেশযোগ্য হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে শ্রম অভিবাসনের খরচ এখনো অত্যন্ত বেশি এবং গত কয়েক বছরে তা আরও বেড়েছে।
সংস্থাটির ২০২৪ সালের ব্যয়ের গঠন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ব্যয়ের ৩৮ শতাংশ ভিসা-সংক্রান্ত খাতে এবং ৩৫ শতাংশ দালাল বা রিক্রুটার ফি হিসেবে ব্যয় হয়েছে। বাকি ২৭ শতাংশ অন্যান্য খাতে গেছে। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশই ভিসা ও মধ্যস্বত্বভোগীনির্ভর খাতে ব্যয় হচ্ছে।
Manual4 Ad Code
কাতারপ্রবাসী ইয়াসিন বলেন, ‘ফ্রি ভিসা বলতে আসলে কোনো ভিসা নেই। এখানে এসে নিজ উদ্যোগেই ইকামা করা লাগে। কোনো না কোনো কফিলের (নিয়োগদাতা) অধীনে থাকা লাগে। না হলে অবৈধ হতে হয়। এখানে এসে দেখি অনেকে ফ্রি ভিসা দেড় লাখ টাকা থেকে দুই লাখ টাকা দিয়েও কেনেন। এরপর শুধু বিমানভাড়া। কিন্তু দালালরা এই ভিসা তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকায়ও বিক্রি করেন। ফ্রি ভিসায় এসে নিজেই কাজ খুঁজতে হয়। এখন কাজ নেই, যুদ্ধের কারণে খাবার খরচও বেশি। তাই এর মাঝে ঋণও শোধ করতে পারিনি। মন চাইলে দেশে যাওয়ারও টাকা নেই।’
শ্রমিকদের আয় বাড়লেও অভিবাসন ব্যয়ের চাপ কমেনি। গবেষণায় দেখা যায়, মাসিক আয় ২০২২ সালের ৩৭ হাজার ৬২৯ টাকা থেকে ২০২৪ সালে ৪৫ হাজার ৪৪২ টাকায় উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ আয় ৩১ শতাংশ বেড়েছে। তবে মূল্যস্ফীতির প্রভাব সমন্বয় করলে প্রকৃত আয় ৩৮ হাজার টাকার কাছাকাছি স্থির রয়েছে। ফলে আয়ের এই বৃদ্ধি অভিবাসন ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।
গবেষণায় উল্লেখিত রিক্রুটমেন্ট কস্ট-টু-ইনকাম অনুপাত অনুযায়ী, বিদেশে যাওয়ার খরচ তুলতে ২০২২ সালে গড়ে ১০ দশমিক ৩ মাস, ২০২৩ সালে ৯ দশমিক ৯ মাস ও ২০২৪ সালে ১০ দশমিক ২ মাস সময় লাগতো। অর্থাৎ একজন বাংলাদেশি শ্রমিককে বিদেশে যেতে প্রায় এক বছরের আয়ের সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। এ পরিস্থিতি শ্রমিকদের ঋণগ্রস্ততা ও আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব যাওয়া ফরহাদ বলেন, ‘ছয় লাখ টাকা খরচ করে সৌদি আসি দালালের মাধ্যমে। এসে কাজ ছিল না, ছয় মাস বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারিনি। এখন বছর শেষে ইকামা খরচ তিন লাখ। বাড়িতে টাকা পাঠাবো নাকি ঋণ শোধ করবো, নাকি এখানে তিন লাখ টাকা দিয়ে ইকামা করবো? কোনো কূল না পেয়ে আজ আমি অবৈধ অবস্থায় আছি, গোপনে কাজ করে যাচ্ছি।’
‘সৌদিতে এমন অবৈধ কর্মী আছে লাখ লাখ। আমরা দেশে গেলে একেবারে চলে যেতে হবে। বৈধ হতে হলে সাত-আট লাখ টাকা লাগবে। সেই আয় তো নেই। কেউ পাঁচ বছর, কেউ ১০ বছর ধরে এখানে মাটি কামড়ে পড়ে আছে। আমি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছি, কিন্তু জীবন এখানে শেষ করে দিচ্ছি।’
আইএলওর গবেষণা বলছে, সব অভিবাসী সমানভাবে ব্যয়ের এই চাপ বহন করছেন না। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী কিশোর-তরুণ অভিবাসী এবং নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের বিদেশে যাওয়ার খরচ তুলতে ১১ থেকে ১২ মাস সময় লাগে, যা গড়ের চেয়ে বেশি। নারীদের মোট ব্যয় তুলনামূলক কম হলেও তাদের ক্ষেত্রে দালালনির্ভর ব্যয়ের হার বেশি। ফলে নারী, তরুণ ও দরিদ্র শ্রমিকরাই সবচেয়ে বেশি আর্থিক চাপের মুখে রয়েছেন।
গন্তব্যভেদেও অভিবাসন ব্যয়ে বড় পার্থক্য রয়েছে। গবেষণার তথ্যমতে, বাংলাদেশি অভিবাসীদের প্রায় ৪০ শতাংশ সৌদি আরব, ১৫ শতাংশ মালয়েশিয়া ও ১০ শতাংশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) যান। মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে অভিবাসন ব্যয় কিছুটা কমলেও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গন্তব্যে ব্যয় বাড়ছে। ফলে অভিবাসন ব্যয় অনেকাংশে নির্ভর করে গন্তব্য দেশের নিয়োগব্যবস্থা ও করিডোরভিত্তিক কাঠামোর ওপর।
আইএলও বলছে, ২০২৪ সালে ফিলিপাইনের পুরুষ শ্রমিকদের অভিবাসন ব্যয় মেটাতে সময় লাগতো ১ দশমিক ১ মাস এবং নারীদের ১ দশমিক ৪ মাস। এছাড়া ভিয়েতনামের পুরুষদের ৭ দশমিক ২ মাস ও নারীদের ৭ দশমিক ৬ মাস, কম্বোডিয়ার পুরুষদের ৭ দশমিক ২ মাস ও নারীদের ৭ দশমিক ৬ মাস, মালদ্বীপের পুরুষদের ৮ দশমিক ৩ মাস ও নারীদের ৩ দশমিক ৯ মাস, ঘানার পুরুষদের ২ মাস ও নারীদের ২ দশমিক ১ মাস এবং লাওসের পুরুষদের ৩ দশমিক ২ মাস ও নারীদের ৩ দশমিক ৩ মাস লাগতো। বিপরীতে বাংলাদেশের পুরুষদের অভিবাসন ব্যয় মেটাতে সময় লেগেছে ১০ দশমিক ২ মাস এবং নারীদের ৯ দশমিক ৪ মাস।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে কার্যকর নীতির মাধ্যমে অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। সরকার চাইলে বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য এ ব্যয় ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো যাবে। এজন্য দালাল বা ব্রোকার ফি, ভিসা-সংক্রান্ত অদক্ষতা ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ওপর জোর দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
Manual1 Ad Code
অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার, নিয়োগসংশ্লিষ্ট সংস্থা ও বিদেশি নিয়োগকর্তাদের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি করতে হবে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি আরোপ করতে হবে। একই সঙ্গে লাইসেন্স নবায়ন ও বাজার অনুসন্ধান ব্যবস্থা শক্তিশালী করলে ব্যয় কমানো সম্ভব। এজন্য নিয়োগকর্তা ও দেশের এজেন্সিগুলোর যৌথ দায়বদ্ধতা খুবই জরুরি।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের ম্যানেজার সালেহ রাব্বী জানান, বাংলাদেশে শ্রম অভিবাসনের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি। কিছু কিছু শ্রমিক তো যাওয়ার তিন মাসের মধ্যে প্রতারিত হয়ে ফেরত আসেন। তারা কয়েক মাসের ব্যবধানে পাঁচ-ছয় লাখ টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হন, যার সিংহভাগ তারা ঋণ করেন। এরপর ঋণে জর্জরিত হয়ে দেশেও অমানবিক জীবন কাটান।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যস্বত্বনির্ভর (দালাল) নিয়োগব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মাঠপর্যায়ে যারা লোক এনে এজেন্সিকে দেন তাদের ডাটাবেজের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। ভিসা বাণিজ্য বন্ধ ও সরকার যথাযথ আইন প্রয়োগ করলে অভিবাসন ব্যয় কমানো সম্ভব।’