জাতীয় সংসদের কার্যকারিতা, নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি এবং মন্ত্রণালয়গুলোর নিয়মিত তদারকির অন্যতম প্রধান কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হয় সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। সংসদীয় কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণেই এসব কমিটিকে বলা হয় ‘মিনি পার্লামেন্ট’। অথচ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠনের প্রায় তিন মাস অতিক্রান্ত হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে গঠন করা হয়নি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো।
সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত ৫০টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির মধ্যে এখন পর্যন্ত গঠিত হয়েছে মাত্র ৮টি স্থায়ী কমিটি ও ২টি বিশেষ কমিটি। বাকি কমিটি গঠন এখনো প্রক্রিয়াধীন। এ নিয়ে সংসদের কার্যকারিতা, প্রশাসনিক নজরদারি এবং সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ এবং জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, যেকোনো সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের মধ্যেই মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সব স্থায়ী কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক। তবে অতীতের যেকোনো সংসদের তুলনায় এবারের সংসদে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া অপেক্ষাকৃত ধীরগতিতে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ২০২৪ সালে গঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর মাত্র পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যেই ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের নজির স্থাপিত হয়েছিল। সেই তুলনায় বর্তমান সংসদের ধীরগতি আরও বেশি দৃশ্যমান।
Manual7 Ad Code
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় গত ১২ মার্চ। এরপর গত ১৪ জুন পর্যন্ত তিন মাসের বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে অধিকাংশ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন হয়নি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এখন পর্যন্ত গঠিত কমিটিগুলোর মধ্যে রয়েছে সংসদসংক্রান্ত ৫টি কমিটি–বিজনেস অ্যাডভাইজরি কমিটি, হাউস কমিটি, স্ট্যান্ডিং কমিটি অব প্রিভিলেজেস, প্রাইভেট মেম্বার্স বিলস অ্যান্ড রেজল্যুশনস কমিটি এবং লাইব্রেরি কমিটি। এগুলো গঠন করা হয় গত ১২ মার্চ অধিবেশনের প্রথম কার্যদিবসে। পরে গত ১০ জুন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি এবং ১৪ জুন অর্থ মন্ত্রণালয় ও আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়।
এ ছাড়া সংসদে উত্থাপিত বিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং দেশের জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় দুটি বিশেষ কমিটিও গঠন করা হয়েছে। গত ২৬ এপ্রিল জ্বালানিসংকট মোকাবিলা ও করণীয় নির্ধারণে গঠিত ১০ সদস্যের বিশেষ কমিটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় গেজেট প্রকাশের তারিখ থেকে ৩০ দিন। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সংসদে এ প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়।
Manual2 Ad Code
সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনে এবার ধীরগতির কারণ জানতে চাইলে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘কমিটি গঠনে কোনো অনীহা বা রাজনৈতিক জটিলতা নেই। এবারের সংসদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। আমরা চাই প্রতিটি কমিটিতে ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে। অনেক ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের পছন্দ, বিশেষজ্ঞতা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অভিজ্ঞতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য সময় কিছুটা বেশি লাগছে। তবে সরকার সংসদীয় কমিটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। বাকি স্থায়ী কমিটিগুলো দ্রুত গঠনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। সংসদীয় নজরদারি শক্তিশালী করাই আমাদের লক্ষ্য।’
এ বিষয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদীয় কমিটি গঠন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল প্রক্রিয়া। শুধু সংখ্যাগত প্রতিনিধিত্ব নয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, স্বতন্ত্র সদস্য, পেশাগত দক্ষতা ও সংসদ সদস্যদের আগ্রহ– সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই কমিটি গঠন করতে হচ্ছে।
Manual6 Ad Code
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই এমন কমিটি গঠন করতে, যা কার্যকরভাবে মন্ত্রণালয়গুলোর ওপর নজরদারি করতে পারে। এ কারণে কিছুটা সময় লাগছে। তবে বিষয়টি নিয়ে সংসদ সচিবালয় ও সংসদীয় নেতৃত্ব কাজ করছে। আশা করছি, বাকি কমিটিগুলোও পর্যায়ক্রমে গঠন করা হবে।’
Manual1 Ad Code
সংসদীয় কমিটির গুরুত্ব তুলে ধরে স্পিকার আরও বলেন, একটি সংসদকে কার্যকর এবং জবাবদিহিমূলক করতে স্থায়ী কমিটি গঠনের বিকল্প নেই। কারণ এসব কমিটি না থাকলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডের নিয়মিত তদারকি হয় না, বাজেট ব্যয়ের পর্যালোচনা দুর্বল হয়ে পড়ে, সরকারি প্রকল্পের জবাবদিহি কমে যায় এবং সংসদ সদস্যদের নীতিগত পর্যালোচনার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে সংসদের কার্যকারিতা অনেকাংশেই অধিবেশনকক্ষের বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
সুজন সম্পাদক এবং নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি জাতীয় সংসদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জবাবদিহিমূলক কাঠামোগুলোর একটি। এসব কমিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা, সরকারি ব্যয়ের হিসাব যাচাই এবং নির্বাহী বিভাগের ওপর সংসদের কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করে। তবে অতীতে অনেক সংসদীয় কমিটি প্রত্যাশা অনুযায়ী কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, দলীয় প্রভাব, সীমিত স্বাধীনতা এবং সুপারিশ বাস্তবায়নের দুর্বল সংস্কৃতির কারণে অনেক কমিটি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল। যদিও কিছু কমিটি গুরুত্বপূর্ণ অনিয়ম উন্মোচন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। এ জন্য কমিটিগুলোকে আরও স্বাধীন, সক্রিয় ও কার্যকর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সংসদীয় কমিটি ব্যবস্থার কার্যকর বিকাশ শুরু হয় সপ্তম জাতীয় সংসদ (১৯৯৬-২০০১) থেকে। এরপর থেকে সংসদীয় কমিটিগুলো ধীরে ধীরে সংসদীয় জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করে।