প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৭ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

শুনানির অপেক্ষায় হাজারের বেশি মৃত্যুদণ্ডের মামলা, নিষ্পত্তিতে ধীরগতি

editor
প্রকাশিত জুন ২২, ২০২৬, ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ
শুনানির অপেক্ষায় হাজারের বেশি মৃত্যুদণ্ডের মামলা, নিষ্পত্তিতে ধীরগতি

Manual5 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

১৪ বছর আগে ২০১২ সালের অক্টোবরের ঘটনা। ঢাকার পল্লবীতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন মহসিন নামের এক ব্যক্তি। স্বামীকে গলা কেটে এবং পরে পুরুষাঙ্গ ও অণ্ডকোষ বিচ্ছিন্ন করে হত্যার এ ঘটনার পাঁচ বছর পর ২০১৭ সালে স্ত্রী সালেহা খাতুন শিউলিকে মৃত্যুদণ্ড দেন ঢাকার একটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। সেই মামলার ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আপিল শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ আসামি শিউলিকে খালাস দেন।

প্রায় ৯ বছর আগে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে এক তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। ওই ঘটনায় করা মামলায় বিচারিক আদালতের রায় আসে মাত্র পাঁচ মাসে। কিন্তু উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স শুনানিতে সময় লাগে সাত বছর। ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামির মধ্যে তিন আসামির সাজা কমিয়ে রায় দেন হাইকোর্ট। পরে সেই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন। তবে আপিল বিভাগে সেই মামলার শুনানি ঝুলে আছে এখনো।

 

Manual3 Ad Code

২০১৯ সালের ২৭ মার্চ ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে এক ছাত্রীর শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় তার মা বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় মামলা করলে অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই বছরের ২৪ অক্টোবর হত্যা মামলার রায়ে অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড দেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।

রায়ের কয়েকদিন পরই মামলার নথিপত্র ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে পাঠানো হয়, যা বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পূর্বশর্ত। কিন্তু এরপর কেটে গেছে সাত বছর। এখনো আলোচিত এ মামলার নিষ্পত্তি তো দূরে থাক, উচ্চ আদালতে শুনানিই শুরু হয়নি। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ মামলাটি হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চে শুনানির জন্য সম্প্রতি তালিকাভুক্ত হয়েছে।

 

শুধু উল্লিখিত মামলাগুলোই নয়, উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে এমন বহু মামলা। যেখানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মামলা নিষ্পত্তি হতে সময় লেগে যাচ্ছে বছরের পর বছর। বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় এলেও সেসব রায়ের চূড়ান্ত পরিণতি অনিশ্চয়তা আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার বেড়াজালে আটকে থাকছে।

ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বিচার পেলেও তা অনেক সময় তার সামাজিক ও মানসিক তাৎপর্য হারিয়ে ফেলছে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

আদালত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স শুনানির বেঞ্চ সংকট তো রয়েছেই। তবে মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্বের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় কারণ সরকারি ছাপাখানায় ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য পেপারবুক তৈরি। আইনজীবীদের কেউ কেউ এই পেপারবুক তৈরির দায়িত্ব আসামিপক্ষকে দেওয়া উচিত বলে মনে করেন।

 

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ডেথ রেফারেন্স। কোনো মামলায় নিম্ন আদালতে আসামির মৃত্যুদণ্ড হলে সাজা কার্যকর করতে হাইকোর্টের অনুমোদন নিতে হয়। হাইকোর্টে এ ধরনের মামলা ডেথ রেফারেন্স হিসেবে নথিভুক্ত ও শুনানি হয়। দণ্ডিত ব্যক্তি রায়ের বিরুদ্ধে আপিল ও জেল আপিল করতে পারেন। সাধারণত ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের শুনানি একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়।

কিন্তু এ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপই দীর্ঘসূত্রতায় আক্রান্ত। সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক সূত্র অনুযায়ী, বর্তমানে হাইকোর্টে ১ হাজার ২৩০টি ডেথ রেফারেন্স মামলা শুনানির অপেক্ষায়। যেখানে এসব ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হচ্ছে হাইকোর্টের পাঁচটি বেঞ্চে।

আইনজীবী ও আদালত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্সর শুনানির এই জট শুধু মামলার সংখ্যার কারণে নয়; এর পেছনে রয়েছে একাধিক কাঠামোগত সমস্যা।

 

ডেথ রেফারেন্স শুনানির আগে প্রস্তুত করতে হয় ছাপা পেপারবুক; যেখানে মামলার এজাহার, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্য, বিচারিক আদালতের রায় এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংকলিত থাকে। এই পেপারবুক প্রস্তুত করে সরকারি ছাপাখানা। আদালত-সংশ্লিষ্টদের মতে, বিপুল কাজের চাপের কারণে এই ধাপটিতে দীর্ঘ সময় নষ্ট হয়।

ডেথ রেফারেন্স শাখার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর মামলাটি শুনানির জন্য প্রস্তুত হয়। প্রধান বিচারপতি শুনানির জন্য বেঞ্চ নির্ধারণ করেন। সাধারণত, মামলা যে বছর হাইকোর্টে আসে, সেই ক্রম অনুসারে শুনানি হয়। বর্তমানে হাইকোর্টে ২০১৮ সালে আসা ডেথ রেফারেন্স মামলাগুলোর শুনানি চলছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বা আলোচিত মামলাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতেও শুনানির নজির রয়েছে।

আইনজীবীদের মতে, পেপারবুক প্রস্তুতের দায়িত্ব যদি সরকার নয়, বরং আসামিপক্ষকে দেওয়া হয়, তাহলে প্রক্রিয়াটি অনেক দ্রুত হতে পারে। তারা বলছেন, অনেক সময় কোনো মামলার শুনানি চলাকালে বেঞ্চের এখতিয়ার পরিবর্তন করা হয় অথবা বেঞ্চ পুনর্গঠন করা হয়। তখন নতুন বিচারকদের আবার শুরু থেকে শুনানি করতে হয়, যা আরও বিলম্ব সৃষ্টি করে।

ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ এস এম শাহজাহান বলেন, উচ্চ আদালতে ফাঁসির মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। পেপারবুক প্রস্তুতের দায়িত্ব সরকার না নিয়ে বরং আসামিপক্ষকে দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া বেঞ্চও বাড়াতে হবে।

Manual2 Ad Code

 

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সরওয়ার আহমেদ মনে করেন, ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি একটি বিশেষায়িত বিচারিক কাজ। তিনি বলেন, ডেথ রেফারেন্সের মামলা সবাই ভালোভাবে বোঝেন না। এর শুনানিতে যথেষ্ট ধৈর্যের প্রয়োজন। ডেথ রেফারেন্স মামলা ভালো বোঝেন, এরকম বিশেষজ্ঞ বিচারকের সমন্বয়ে ডেথ রেফারেন্স বিষয়ক মামলার বেঞ্চ গঠন করা যেতে পারে।

Manual4 Ad Code

‘এসব বেঞ্চকে দীর্ঘ সময় দিতে হবে, কিছুদিন পরপর যেন বেঞ্চ ভেঙে দেওয়া না হয় বা বেঞ্চের এখতিয়ার পরিবর্তন করা না হয়’—যোগ করেন তিনি।

বিচার বিভাগে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা ডেথ রেফারেন্স ও মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়ে বিকল্প ভাবনার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, আদালতের ছুটির সময়ও বিশেষভাবে একাধিক বেঞ্চকে ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানির দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে থাকাকালে (মেয়াদকাল ডিসেম্বর ২০২১ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৩) এক বছরে ১৬৭টি ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তি হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি সর্বোচ্চ সংখ্যা। এর আগে বা পরে এমন রেকর্ড আর দেখা যায়নি। এরপর থেকে ডেথ রেফারেন্স শুনানির তেমন কোনো উদ্যোগও দেখা যায়নি।

তবে নারী-শিশু ধর্ষণ ও হত্যার আলোচিত মামলার ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য এখন একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। গত ১০ জুন সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন বেঞ্চ গঠনের বিষয়টি জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের এ বিশেষ বেঞ্চ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর শুনানি পরিচালনা করবে।

 

সংশ্লিষ্টদের মতে, হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী প্রধান বিচারপতি থাকাকালে কিছু প্রশাসনিক ও বিচারিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যা আবার গ্রহণ করা হলে ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব। তবে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ডেথ রেফারেন্স মামলার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ার সুযোগও সীমিত।

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের স্পেশাল অফিসার মো. মাজহারুল হক বলেন, ডেথ রেফারেন্সের মামলা বিস্তারিত শুনানি করতে হয়, যেহেতু এখানে মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন জড়িত। ফলে শুনানি ও নিষ্পত্তিতে অনেক সময় দরকার হয়।

ডেথ রেফারেন্স ও মৃত্যুদণ্ডের মামলার শুনানি নিয়ে মানবাধিকারকর্মী, ফাউন্ডেশন ফর ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এফএলএডি) চেয়ারপারসন এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, শুরুতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর একটি তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। এরকম ২০টি মামলার তালিকা করে সেগুলো ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। এভাবে যদি আমরা প্রস্তুতি নিতে পারি তবে মামলা নিষ্পত্তিতে গতি আসবে।

‘এছাড়া অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় থেকেও এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ ও পুরোনো মামলাগুলো যেন রাষ্ট্রপক্ষের টিম গঠন করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য প্রস্তুত রাখা যায়। তারাও আগে আসা মামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ মামলার তালিকা তৈরি করতে পারে।’

তিনি বলেন, ডেথ রেফারেন্স মামলার শ্রেণিবিন্যাস করেও মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা যেতে পারে। এখন শুধু মিরপুরের শিশু ধর্ষণ ও হত্যার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় কথা বলছে, কিন্তু আর কোনো মামলার বিষয়ে বলছে না। এর থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে।

‘রাজনৈতিক দলকে তোয়াজ করে রাষ্ট্রপক্ষ তথা প্রসিকিউশনে নিয়োগের বিষয়ে রাষ্ট্রকেই সতর্ক হতে হবে। অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় থেকে শুরু করে সর্বত্র যোগ্য, দক্ষ, মেধাবী ও অভিজ্ঞদের নিয়োগ দেওয়া উচিত। যেন ডেথ রেফারেন্স মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়’—যোগ করেন এ আইনজীবী।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফৌজদারি অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এসএম শাহজাহান বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের করা জেল আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য উচ্চ আদালত তথা হাইকোর্টে এ সংক্রান্ত বেঞ্চ বাড়ানো দরকার। যেন মামলাগুলোর নিষ্পত্তি দ্রুত করা যায়।

Manual1 Ad Code

সুপ্রিম কোর্টে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মো. মাহমুদুল আরেফীন স্বপন বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার তুলনায় আদালত ও বিচারকের সংখ্যা খুবই কম। যেখানে গোটা দেশের জন্য মাত্র একটি সর্বোচ্চ আদালত। হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য বেঞ্চও সীমিত। মাত্র দু-তিনটি বেঞ্চ রয়েছে।

ডেথ রেফারেন্স ও মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত ফৌজদারি বিশেষজ্ঞ বিচারক ও বেঞ্চ নির্ধারণ করলে দ্রুত সময়ের মধ্যে এই মামলাগুলোর শুনানি নিষ্পত্তি করা সম্ভব হতে পারে। আমি মনে করি, প্রধান বিচারপতি এ বিষয়ে দায়িত্ব নিতে পারেন। এছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই—যোগ করেন মাহমুদুল আরেফীন স্বপন।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code