বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এক অর্থবছরে ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে এই রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয় এসেছে দেশে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি।
প্রবাসী আয়ের এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
কোন মাসে কত এসেছে
সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জুলাইয়ে এসেছে ২ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার, আগস্টে ২ দশমিক ৪২ বিলিয়ন, সেপ্টেম্বরে ২দশমিক ৬৯ বিলিয়ন, অক্টোবরে ২ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন, নভেম্বরে ২ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন এবং ডিসেম্বরে ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।
Manual8 Ad Code
এছাড়া, চলতি বছরের জানুয়ারিতে আসে ৩ তশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার, ফেব্রুয়ারিতে ৩ দশমিক শূন্য ১ বিলিয়ন, মার্চে অর্থবছরের সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন, এপ্রিলে ৩ দশমিক ১২ বিলিয়ন, মে মাসে ৩ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন এবং জুনে ২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে।
সাত বছরে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স
Manual4 Ad Code
গত সাত অর্থবছরের রেমিট্যান্স প্রবাহে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার (নতুন রেকর্ড) রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৩ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২১ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার পাঠান প্রবাসীরা। এছাড়া ২০২১-২২ অর্থবছরে ২১ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন ডলার, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে আসে ১৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার।
সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে
জাতীয় সংসদে দেওয়া তথ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে দেশটি থেকে ৪ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার এসেছে, যা মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
রেমিট্যান্স আহরণে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সৌদি আরব, দেশটি থেকে এসেছে ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। তৃতীয় অবস্থানে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে ৪ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার এসেছে। এই তিন দেশ থেকেই মোট ১৩ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে, যা মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
এছাড়া, যুক্তরাজ্য থেকে এসেছে ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার এবং মালয়েশিয়া থেকে এসেছে ২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার।
রেমিট্যান্সে ভর করে বাড়ছে রিজার্ভ
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার (৩০ জুন) পর্যন্ত দেশের মোট (গ্রস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ ৩২ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, আমদানি ব্যয় নির্বাহ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার পাশাপাশি আমদানি ব্যয় নির্বাহ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে নতুন শ্রমবাজারের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ বলেন, রেমিট্যান্স প্রবাহের এই ইতিবাচক ধারা শুধু পরিসংখ্যানগত অর্জন নয়, এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির দৃঢ়তা ও কার্যকর নীতিরও প্রতিফলন।
তার মতে, ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রণোদনা, প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবা এবং হুন্ডিসহ অবৈধ লেনদেনের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারির ফলে প্রবাসীরা এখন বেশি হারে বৈধ পথে অর্থ পাঠাচ্ছেন।
Manual4 Ad Code
এম হেলাল আহমেদ আরও বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও এই রেমিট্যান্স প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করছে, ডলারের বাজারে চাপ কমাচ্ছে এবং আমদানি ব্যয় নির্বাহে সহায়তা করছে। তবে এই ইতিবাচক ধারা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, অভিবাসন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।