প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৭শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১২ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৪ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

চীনা করিডোর: মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ ও ভারতের টেনশন প্রধান বাধা

editor
প্রকাশিত জুলাই ৮, ২০২৬, ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ
চীনা করিডোর: মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ ও ভারতের টেনশন প্রধান বাধা

Manual8 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে চীনকে যুক্ত করে একটি নতুন অর্থনৈতিক করিডোর গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে প্রকল্পটি যেমন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে, তেমনি নানা চ্যালেঞ্জও সামনে নিয়ে এসেছে।

কেন এই প্রস্তাব দিল চীন?

চীনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে তার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে ইউনান প্রদেশকে সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা।
বর্তমানে চীনের অধিকাংশ সমুদ্রবাণিজ্য মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। কোনো সংঘাত বা অবরোধের পরিস্থিতিতে এই পথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সেজন্য বেইজিং বহু বছর ধরেই বিকল্প করিডোর গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর, তেল-গ্যাস পাইপলাইন এবং চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর তারই অংশ।
এখন বাংলাদেশকে যুক্ত করা হলে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে চীন সরাসরি বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার পেতে পারে।

চীনের কয়েকটি উদ্দেশ্য হলো– বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্যিক উপস্থিতি জোরদার, ইউনান প্রদেশকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা, ভারত মহাসাগরে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করা।

করিডোরের সম্ভাব্য রুট কেমন হতে পারে?

বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের মধ্যে এই করিডোরের এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক রুট চূড়ান্ত হয়নি। তবে কূটনৈতিক ও অবকাঠামোগত বাস্তবতা বিবেচনায় সম্ভাব্য রুট হতে পারে: কুনমিং থেকে রুইলি-মুসে-মান্দালয়-কিয়াউকফিউ-রাখাইন অঞ্চল-মংডু-বাংলাদেশ সীমান্ত-টেকনাফ-কক্সবাজার-চট্টগ্রাম বন্দর।

আরেকটি বিকল্প রুট হতে পারে: কুনমিং থেকে রুইলি-মান্দালয়-রাখাইন-পালেতোয়া-মংডু-টেকনাফ-চট্টগ্রাম। এই রুটে সড়ক, রেল, সমুদ্র ও লজিস্টিকস অবকাঠামো সমন্বিত একটি ‘মাল্টিমোডাল করিডোর’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা থাকতে পারে।

কুনমিং থেকে চট্টগ্রাম কত কিলোমিটার?

সুনির্দিষ্ট রুট নির্ধারিত না হলেও সম্ভাব্য সড়কপথে কুনমিং থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার হতে পারে।

বর্তমানে সমুদ্রপথে চীনের পূর্ব উপকূল থেকে চট্টগ্রামে পণ্য আনতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। কিন্তু করিডোর চালু হলে ট্রাক বা রেলযোগে পণ্য পরিবহনের সময় কমে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীরাও এমন সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন।

আরাকান আর্মির ভূমিকা কী হবে?

বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের মধ্যে এই করিডোর বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে মিয়ানমারের আরাকান আর্মি। কেননা, বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল কার্যত জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মংডু, বুথিডংসহ বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বহু এলাকায় তাদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাখাইনের অধিকাংশ অঞ্চল এখন আরাকান আর্মির প্রভাবাধীন। ফলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন করিডোর বাস্তবায়নে আরাকান আর্মি একটি অপরিহার্য পক্ষ হয়ে উঠতে পারে।

করিডোরের একটি বড় অংশ রাখাইন অতিক্রম করলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরাকান আর্মির সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় জান্তা সরকারের পাশাপাশি বাস্তব নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হিসেবে আরাকান আর্মির সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া কোনো প্রকল্প কার্যকর করা কঠিন হবে। তবে আশার দিক হলো, চীন দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমারের জান্তা ও বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে। ফলে বেইজিং ভবিষ্যতে আরাকান আর্মির সঙ্গে সমঝোতা তৈরিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও নিতে পারে।

Manual5 Ad Code

ভারতের উদ্বেগ কোথায়?

চীনা উদ্যোগে এই করিডোর নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। ভারত আশঙ্কা করছে, চট্টগ্রাম বা মংলা বন্দরে চীনের গভীর সম্পৃক্ততা ভবিষ্যতে ভারত মহাসাগরে চীনের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করবে। এছাড়া ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই সংবেদনশীল এলাকা। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে চীনের একটি স্থল করিডোর গড়ে উঠলে দিল্লি এটিকে তার কৌশলগত পরিসরে বেইজিংয়ের প্রবেশ হিসেবে দেখতে পারে।

এদিকে চীন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার-বিসিআইএম করিডোর বাস্তবায়নের চেষ্টা করলেও ভারত নানা কারণে তা এগিয়ে নেয়নি। এখন ভারতকে বাদ দিয়ে ত্রিপক্ষীয় করিডোর গড়ে উঠলে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব আরও বাড়তে পারে। ভারত ইতোমধ্যে আন্দামান ও নিকোবর অঞ্চলে সামরিক ও নৌ উপস্থিতি জোরদার করেছে। চট্টগ্রাম ও মোংলা কেন্দ্রিক নতুন করিডোর বঙ্গোপসাগরে চীন-ভারত প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করতে পারে।

Manual8 Ad Code

চীনের এই প্রস্তাবিত করিডোর নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, ‘আমরা আমাদের এলাকার এই ধরনের সব ঘটনা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করি।’

অবশ্য ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত করিডোরে অন্য যেকোনো দেশ যুক্ত হতে পারে। চাইলে ভারতও এখানে যুক্ত হতে পারে।

বাস্তবায়নের পথে যেসব চ্যালেঞ্জ

প্রস্তাবিত করিডোর বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধ। রাখাইন রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবর্তে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে করিডোর বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন হবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে– মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধ, রাখাইনে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা সংকট, বিপুল অর্থায়নের প্রয়োজন, ভারত-চীন ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বাংলাদেশের কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা ইত্যাদি।

Manual6 Ad Code

রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধান না করে অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়ন সম্ভব কি না– এমন প্রশ্নের উত্তরে ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, নিশ্চিতভাবেই একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এই করিডোরটি হয়ত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে আরও বেশি গতিশীলতা প্রদান করবে। তবে আমি এটি মনে করি না যে সমাধান হওয়ার আগে কোনো উপায় বের করা যাবে না। সামুদ্রিক সহযোগিতা ও বন্দরকেন্দ্রিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো দিয়ে আমরা এই অর্থনৈতিক করিডোরের প্রাথমিক সুবিধা নেওয়া শুরু করতে পারি।

কত খরচ হবে

বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়নে ঠিক কত খরচ হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) বা ব্যয় নির্ধারণ হয়নি। কারণ, প্রকল্পটি এখনো প্রস্তাব ও আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, চীন সম্ভবত ধাপে ধাপে প্রকল্প বাস্তবায়নের কৌশল নেবে। প্রথম ধাপে বিদ্যমান সড়ক ও বন্দর অবকাঠামো ব্যবহার করে সীমিত ট্রানজিট চালু করা হতে পারে। পরে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন রেল ও এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হবে। এতে প্রাথমিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, করিডোর বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় দিক অর্থ নয়, বরং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। মিয়ানমারের চলমান সংঘাত ও রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করতেও আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারীরা দ্বিধায় থাকবে।

এটা কি বিআরআইর সঙ্গে যুক্ত?

সরাসরি ঘোষণা না এলেও কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের বড় অংশ মনে করছেন, প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোরটি কার্যত চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) একটি নতুন উপাদান বা সম্প্রসারিত রূপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ, চীনের বিদ্যমান বিআরআই কাঠামোর সঙ্গে মিল।

চীন ইতোমধ্যে মিয়ানমারে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর (সিএমইসি) বাস্তবায়ন করছে, যা আনুষ্ঠানিকভাবে বিআরআইর অংশ। কুনমিং থেকে মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দর পর্যন্ত সড়ক, রেল, জ্বালানি পাইপলাইন ও বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প এই কাঠামোর অধীনে এগোচ্ছে। প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন করিডোর সেই নেটওয়ার্ককে বাংলাদেশ পর্যন্ত সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করবে।

এদিকে আগের বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর (বিসিআইএম)কে একসময় বিআরআইর ছয়টি প্রধান করিডোরের একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু ভারতের আপত্তি ও চীন-ভারত সম্পর্কের অবনতির কারণে বিসিআইএম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। এখন ভারতকে বাদ দিয়ে নতুন ত্রিপক্ষীয় করিডোরের প্রস্তাবকে অনেক বিশ্লেষক বিসিআইএমের সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে দেখছেন।

বেইজিং এখন পর্যন্ত নতুন করিডোরটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিআরআই প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করেনি। এর কারণ হতে পারে– ভারতের সংবেদনশীলতা, মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য। তাই কূটনৈতিকভাবে চীন এটিকে আপাতত আঞ্চলিক সংযোগ উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করছে।

নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়িত হলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ প্রকল্পগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশ একদিকে আঞ্চলিক ট্রানজিট হাব হওয়ার সুযোগ পাবে, অন্যদিকে চীন বঙ্গোপসাগরে একটি বিকল্প প্রবেশপথ নিশ্চিত করবে। তবে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আরাকান আর্মির অবস্থান এবং ভারত-চীন প্রতিযোগিতার গতিপ্রকৃতির ওপর। বর্তমান বাস্তবতায় এটি শুধু অর্থনৈতিক প্রকল্প নয়, বরং এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে যাচ্ছে।

চীনা রাষ্ট্রদূত কী বলছেন?

Manual1 Ad Code

ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছেন, বাংলাদেশকে দেওয়া প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোরের পেছনে কোনো ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। এটা একটি মূলত অর্থনৈতিক সংযোগ। যেকোনো দেশ চাইলে এতে যুক্ত হতে পারে। তিনি বলেছেন, বাস্তব অর্থে যেকোনো ধরনের অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্যই কানেক্টিভিটি (যোগাযোগ) হচ্ছে মূল ভিত্তি। তাই আমরা স্থল যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি সামুদ্রিক… সহযোগিতার বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা করতে চাই। তবে এটি যেহেতু একদম প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তাই আমরা এখনো এর খুঁটিনাটি বিষয়গুলো চূড়ান্ত করিনি। যেহেতু দুই শীর্ষ নেতা এই অর্থনৈতিক করিডোর স্থাপনের বিষয়ে ইতোমধ্যে একমত হয়েছেন, তাই এখন এটিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া এবং এর জন্য একটি রূপরেখা তৈরি করা আমাদের দায়িত্ব। কীভাবে এই সহযোগিতাকে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টরাও আমাদের পরামর্শ দিতে পারেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য

অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরে চীন-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোরের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে কানেক্টিভিটি বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে কুনমিং থেকে মিয়ানমারের বন্দরগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা গেলে পণ্য পরিবহন খরচ ও সময় অনেক কমে আসবে, যা বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য

মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ-চীন প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, বিষয়টি এখনো বিশ্লেষণাধীন রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এটি বিশ্লেষণ করছি। যদি অর্থনৈতিক করিডোরের মাধ্যমে যোগাযোগ সহজ হয়, তাহলে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হবে। তবে এতে কোনো জটিলতা বা সমস্যা আছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি একটি প্রস্তাব। আমরা প্রস্তাবটিকে সাধুবাদ জানাই, কারণ এটি বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে। তবে বাস্তবে এটি কতটা কার্যকর হবে বা কোনো জটিলতা তৈরি করবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই করার পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা কী বলছেন

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর শুধু একটি বাণিজ্যিক বা অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়, এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। তবে এ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে যেমন আশাবাদ রয়েছে, তেমনি রয়েছে নানা শঙ্কাও।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, চীনের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে ইউনান প্রদেশকে সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এবং মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমানো। তাদের মতে, প্রকল্পটির পেছনে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থই বেশি কাজ করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. ওবায়দুল হক বলেন, মূলত বাণিজ্য পথ বহুমুখী করা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সহজতর করার লক্ষ্যেই চীন এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন করিডোর গড়ে তোলার সম্ভাবনা অত্যন্ত ব্যাপক। এই প্রস্তাবের পেছনে চীনের সুনির্দিষ্ট ভূ-অর্থনৈতিক বিবেচনা রয়েছে। তারা এখানে কোনো সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে চাইছে না, বরং তারা বাণিজ্য ও ব্যবসার প্রসার ঘটাতে চায়। এছাড়া এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমাতে চায় চীন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোরের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের একটি প্রত্যক্ষ যোগসূত্র রয়েছে। তার ভাষ্য, ‘রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে অর্থনৈতিক করিডোর একটি কার্যকর অনুঘটক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে এর অর্থনৈতিক, কৌশলগত, নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা অপরিহার্য। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতেই এর সম্ভাব্য সুবিধা, ঝুঁকি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।’

গত ২২-২৬ জুন চীন সফর করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সে সময় চীনের পক্ষ থেকে এই অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code