আইসিইউতে থাকা ৮৯ শতাংশ জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করছে না ওষুধ
আইসিইউতে থাকা ৮৯ শতাংশ জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করছে না ওষুধ
editor
প্রকাশিত আগস্ট ২, ২০২৬, ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ
Manual7 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
সংকটাপন্ন রোগীদের জীবন রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)। কিন্তু এ ইউনিটই এখন অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর সবচেয়ে বড় বিস্তারকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
দেশে আইসিইউতে শনাক্ত হওয়া জীবাণুর ৮৯ শতাংশই বহু ওষুধ-প্রতিরোধী (মাল্টি-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট বা এমডিআর)। এর মধ্যে ৪১ শতাংশকে সন্দেহভাজন প্যান-ড্রাগ-প্রতিরোধী (পিডিআর) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প অত্যন্ত সীমিত।
Manual3 Ad Code
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) পরিচালিত ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সার্ভেইল্যান্স বাংলাদেশ ২০২৫’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
দেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে সংগৃহীত নমুনা ও তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধের জাতীয় চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয়ভাবে পরীক্ষিত নমুনার ৪৬ শতাংশে এমডিআর জীবাণু পাওয়া গেলেও আইসিইউতে এ হার বেড়ে ৮৯ শতাংশে পৌঁছেছে। একইভাবে সারা দেশে সন্দেহভাজন পিডিআর জীবাণুর হার ৬ শতাংশ হলেও আইসিইউতে তা ৪১ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইসিইউতে ভর্তি রোগীরা সাধারণত ভেন্টিলেটর, ইউরিনারি ক্যাথেটারসহ বিভিন্ন চিকিৎসাযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। পাশাপাশি শুরু থেকেই তাদের শক্তিশালী বিস্তৃত আওতার অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।
এসব কারণে সেখানে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণু টিকে থাকা ও ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
জাতীয় এএমআর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হাসপাতালজুড়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জীবাণুর মধ্যে এন্টারোকক্কাস ফেসিয়ামের ৭৪ শতাংশ, অ্যাসিনিটোব্যাক্টারের ৬৫ শতাংশ, ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়ার ৫৩ শতাংশ এবং ই. কোলাইয়ের ৫২ শতাংশ নমুনা বহু ওষুধ-প্রতিরোধী। এ ছাড়া সিউডোমোনাস অ্যারুজিনোসা, স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস ও এন্টারোকক্কাস ফেকালিসেও উল্লেখযোগ্য হারে প্রতিরোধ শনাক্ত হয়েছে।
১৫ হাজার ৮৪৪টি চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হাসপাতালে ব্যবহৃত মোট অ্যান্টিবায়োটিকের ৪৮ শতাংশই ব্যবহার হয়েছে আইসিইউতে। ওয়ার্ডে ব্যবহার হয়েছে ৪৪ শতাংশ এবং বহির্বিভাগে মাত্র ৮ শতাংশ।
অর্থাৎ হাসপাতালে ব্যবহৃত প্রতি দুটি অ্যান্টিবায়োটিকের প্রায় একটি ব্যবহার হয়েছে আইসিইউতে।
হাসপাতালভিত্তিক তথ্যেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শনাক্ত পজিটিভ নমুনার ৭২ শতাংশ এসেছে আইসিইউ থেকে। ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতেও বহু ওষুধ-প্রতিরোধী এবং কার্বাপেনেম-প্রতিরোধী জীবাণুর উচ্চ উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সার্ভেইল্যান্স প্রতিবেদনের প্রধান সম্পাদক ও আইইডিসিআরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভাইরোলজি) অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন হাবীব বলেন, নজরদারির তথ্য অনুযায়ী দেশে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে আইসিইউতে বহু ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর হার এবং বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, অ্যান্টিবায়োগ্রাম বিশ্লেষণে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের সংখ্যা কমে আসছে। তাই সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (আইপিসি) ব্যবস্থা শক্তিশালী করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ডা. আরিফুল বাশার বলেন, দেশে আইপিসির গাইডলাইন থাকলেও বাস্তবায়ন দুর্বল। আইসিইউতে অপ্রয়োজনীয় লোকজনের প্রবেশ, স্বাস্থ্যবিধি না মানা এবং যন্ত্রপাতি ও শয্যার যথাযথ নজরদারির অভাবে এক রোগী থেকে অন্য রোগীর শরীরে প্রতিরোধী জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
আইইডিসিআরের মতে, নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনের পাশাপাশি বিদ্যমান ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টিওয়ার্ডশিপ (এএসপি) কার্যক্রম জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করা, পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে ওষুধ নির্বাচন এবং নিয়মিত প্রেসক্রিপশন পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের ৯০ দশমিক ৯ শতাংশই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘ওয়াচ’ শ্রেণির, যা তুলনামূলক শক্তিশালী এবং সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা প্রয়োজন। বিপরীতে সাধারণ সংক্রমণের জন্য সুপারিশকৃত ‘অ্যাকসেস’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ছিল মাত্র ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। আর সবচেয়ে জটিল সংক্রমণের জন্য সংরক্ষিত ‘রিজার্ভ’ শ্রেণির ব্যবহার ছিল ১ শতাংশেরও কম।
Manual3 Ad Code
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন বলেন, অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক ব্যবহার, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন এবং নির্ধারিত কোর্স শেষ না করার কারণে দেশে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধ দ্রুত বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় হাসপাতালের সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে হবে।
Manual4 Ad Code
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে এএমআর নিয়ে নজরদারির বড় অংশই হাসপাতালভিত্তিক। কমিউনিটি পর্যায়ে বিস্তৃত নজরদারি ও তুলনামূলক গবেষণা বাড়ানো গেলে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্টভাবে জানা সম্ভব হবে।