প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২রা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২২শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ: পরিবেশের ঝুঁকি কতটা

editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬, ১২:৫৮ অপরাহ্ণ
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ: পরিবেশের ঝুঁকি কতটা

Manual7 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

ঢাকার আমিন বাজারে ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে প্রতিদিন তিন হাজার টন বর্জ্য পোড়ানো হবে। বছরে কেন্দ্রটি চলবে ৩৩৩ দিন। অর্থাৎ বছরে প্রায় ১০ লাখ টন বর্জ্য পোড়ানো হবে—যা থেকে ফ্ল্যাই অ্যাশ বা ছাই তৈরি হবে দুই লাখ টন। বিপুল পরিমাণ এই ‘ছাই-ব্যবস্থাপনা’ বড় সংকট তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। একইসঙ্গে যত ভালো প্রযুক্তিই ব্যবহার করা হোক না কেন, কিছু না কিছু পরিবেশ দূষণ তৈরি হবেই। তবে একইসঙ্গে ময়লা-আবর্জনায় পরিবেশের যে দূষণ হতো, তা কমে আসবে বলেও মনে করা হচ্ছে। যদিও প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, পরিবেশদূষণ রোধ করার জন্যই এই প্রকল্প নির্মাণ করা হচ্ছে। কাজেই কেউ সস্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে যাতে উল্টো পরিবেশ দূষণ না করতে পারে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

 

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপরে চাপ কমানোর উদ্যোগ

ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট মোকাবিলায় বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে রাজধানীর আমিন বাজারে ৪২ মেগাওয়াটের কেন্দ্র নির্মাণের জন্য চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনকে (সিএমইসি) কাজ দেওয়া হয়।

এই প্রকল্প ঢাকার বিপুল পরিমাণ বর্জ্য-ব্যবস্থাপনার ওপরে যেমন চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনই বর্জ্য পোড়ানোর ফলে বায়ুদূষণ, বিষাক্ত ছাই, পানি ও মাটিদূষণ এবং জনস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সতর্ক থাকতে হবে বলে অভিমত দেন পরিবেশবিদরা।

Manual5 Ad Code

 

বর্জ্য পোড়ানোর সময় বায়ুদূষণের ঝুঁকি

Manual7 Ad Code

বর্জ্য পোড়ানোর সময় সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয় বায়ুতে ক্ষতিকর দূষক ছড়িয়ে পড়া নিয়ে। বর্জ্যের মধ্যে প্লাস্টিক, রাবার ও ক্লোরিনযুক্ত উপাদান থাকলে উচ্চ তাপমাত্রায় দহনের সময় ডাই-অক্সিন ও ফিউরান তৈরি হতে পারে। একইসঙ্গে নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার অক্সাইড, ক্ষুদ্র কণা ও বিভিন্ন ভারী ধাতুও নির্গত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ডাই-অক্সিন দীর্ঘ সময় পরিবেশে থেকে খাদ্যশৃঙ্খলে জমতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তবে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব দূষণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ জন্য বর্জ্য পোড়ানোর চুল্লির পাশাপাশি ফ্লু-গ্যাস ট্রিটমেন্ট, ফিল্টার, স্ক্রাবারসহ একাধিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর রাখতে হয়। শুধু যন্ত্র স্থাপন করাই যথেষ্ট নয়, পুরো সময় সেগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করাও জরুরি।

Manual2 Ad Code

পরিবেশবিদ শরীফ জামিল বলেন, ‘‘বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গেলে বর্জ্য পোড়াতে হবে। এতে বায়ুদূষণ একেবারেই হবে না, এটা বলা সম্ভব না। তবে উন্নত টেকনোলজি ব্যবহার করে হয়তো দূষণ কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘এই কেন্দ্র নির্মাণ বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিনা, তা খেয়াল রাখতে হবে। কেননা, আইনে যে মানের কথা বারবার বলা হয়, এবার সে আইন সংশোধন করা হচ্ছে। সেটিও আমাদের নজরে রাখতে হবে।’’

 

খোলা বর্জ্যে পরিবেশের ক্ষতি

পরিবেশবিদদের মতে, খোলা জায়গায় বর্জ্য পড়ে থাকলে তা থেকে শুধু দুর্গন্ধই ছড়ায় না, পরিবেশের ওপরও নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। বর্জ্য পচে বিভিন্ন দূষিত গ্যাস ও জীবাণু তৈরি হয় এবং মাছি, মশা ও ইঁদুরের মতো রোগবাহক প্রাণীর বিস্তার ঘটে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে বর্জ্য থেকে তৈরি লিচেট মাটিতে ঢুকে ভূগর্ভস্থ পানি ও আশপাশের খাল-নদী দূষিত করতে পারে। একইসঙ্গে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য মাটিতে মিশে দীর্ঘমেয়াদি দূষণ সৃষ্টি করে। শুকনো বর্জ্যে আগুন লাগলে বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে বায়ুদূষণ আরও বাড়তে পারে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে বিইআরসির সাবেক সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘পরিবেশদূষণের যে শঙ্কা করা হচ্ছে, তার চেয়ে বড় অর্জন হবে বিশাল ময়লার ভাগাড় পরিষ্কার হবে। পাশাপাশি পাওয়া যাবে বিদ্যুৎ। ফলে এর উপকারিতা অনেক বেশি। আর বিশ্বের বহু দেশে এখন এই ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। তারা আধুনিক টেকনোলজিই ব্যবহার করে থাকে।’’

 

প্রকল্পের অর্থায়নে চুক্তি

গত ৩ সেপ্টেম্বর চীনে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) সদর দফতরে উত্তর ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের অর্থায়ন চুক্তি সই হয়।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ‘‘উত্তর ঢাকার বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প হলো বাংলাদেশের প্রথম বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ তৈরির উদ্যোগ। গৃহস্থালির বর্জ্যকে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তর করার এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক তাৎপর্য বহন করে।’’

প্রসঙ্গত, প্রকল্পটি দৈনিক ৩০০০ টন গৃহস্থালির বর্জ্য পোড়ানোর জন্য এবং বার্ষিক ৩৭০ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশের প্রথম বর্জ্য পোড়ানো বিদ্যুৎ প্রকল্প। আগামী ১৮ মাসের মধ্যে এই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। ২৫ টাকা প্রতি ইউনিট দরে এই বিদ্যুৎ কিনবে সরকার।

এর আগে গত ২৭ আগস্ট সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান বলেন, খরচটা একটু বেশি হবে, কিন্তু আমাদের লাভটা অন্য জায়গায় আছে। আমরা তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনবো প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দরে। এটা এমনিতে মনে হচ্ছে অনেক বেশি। কিন্তু আমাদের ময়লা আবর্জনাগুলো তো তারা ধ্বংস করে দিচ্ছে এবং সেখানে যে ময়লা আবর্জনা ওয়েস্ট থাকছে, সেখান থেকে জৈব সার হচ্ছে। তারা ল্যান্ডফিল ব্যবহার করবে, এটার জন্য তারা সিটি করপোরেশনকে মাসিক একটা ভাড়া দেবে এবং এই জায়গায় বাংলাদেশ সরকারের বিন্দুমাত্র কোনও ইনভেস্ট করতে হচ্ছে না। ময়লা আবর্জনা এই জাতির জন্যে, ঢাকা শহরের জন্যে একটা বড় বোঝা।

 

চীনে দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি

চীনের গণমাধ্যম চায়না ডেইলির তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের প্ল্যান্টগুলোতে সাধারণ দূষণকারী হিসেবে সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, হাইড্রোজেন ক্লোরাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও কণার মাত্রা অনলাইনে পর্যবেক্ষণ করা হয়—আগুনের তাপমাত্রা সাধারণ অবস্থায় অন্তত ৮৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখার বিধান রয়েছে, যা ডাই-অক্সিন কমাতে গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সীমা ছাড়ালে জরিমানা, উৎপাদন সীমিত বা প্ল্যান্ট বন্ধের ব্যবস্থাও রয়েছে।

Manual4 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১
২৩৪৫৭৮
৯১০১১১১৩৪১৫
১৬১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৯
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code